বিশেষ করে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা, সেখানকার বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবল গড়ে উঠেছে, যাদের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করছে। এতকিছুর পরও দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে। এ সংকটের বড় কারণ উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট, স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধের এখন তীব্র সংকট পূরণ করতে না পারা। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের আর্থিক বরাদ্দ ও ব্যয়ের সদিচ্ছার অভাবকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের স্বাস্থ্যসেবায় আর্থিক বরাদ্দের দৈন্যের চিত্র উঠে এসেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউএইচও) বেশ কয়েকটি সংস্থার প্রতিবেদনেও।
সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যসেবায় পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগে এশিয়ার স্বল্প ব্যয়ের দেশ এখনো বাংলাদেশ। সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের ৪ শতাংশের বেশি অর্থ এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ আরো কমে আসে। তাছাড়া অর্থবছর শেষে প্রকৃত ব্যয় হয় আরো কম। সেখানেও অদক্ষতা, কর্মহীনতা, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা। ফলে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ২৪ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা আলোচ্য অর্থবছরের পরিচালন ব্যয় খাতে মোট বরাদ্দের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ১৯ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। যদিও ব্যয় হয় ১৬ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তার আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ১৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। যদিও ১৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
এশিয়ার দেশগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের হার যে দেশগুলোয় কম তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ফলে জনবল সংকট, চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি ও সেবার মানহীনতা থেকেই যাচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত হেলথ ইকোনমিকস ইউনিট (এইচইউ) ২০২৩ সালের জুলাইয়ে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘রিভিউ অব বাংলাদেশ হেলথ কেয়ার ফাইন্যান্স স্ট্র্যাটেজি ২০১২-৩২’ শীর্ষক এ প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করে সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও ডব্লিউএইচও।
স্বাস্থ্য খাতের সুদীর্ঘ অর্থনৈতিক হালচিত্র নিয়ে প্রকাশিত ওই পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থায়নের পরিমাণ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় সর্বনিম্ন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবার মোট ব্যয়ে সরকারি অংশগ্রহণ বাংলাদেশে মাত্র ৩ শতাংশ। এ হার এতটাই কম যে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের চেয়েও নিচে। অন্যদিকে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্য খাতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মালদ্বীপ। দেশটির স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি হিস্যা ১৯ দশমিক ১৫ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ভুটান, যেখানে এ হার ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। আর তৃতীয় স্থানে শ্রীলংকা, যেখানে সরকারি অর্থায়নের হিস্যা ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৩ সাল শেষেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এ সময়ে সরকারের মোট ব্যয়ের স্বাস্থ্য খাতের অংশ ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ। এক্ষেত্রেও সবার উপরে ছিল মালদ্বীপ ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশটির স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ব্যয়ের হিস্যা ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে ভুটান, যেখানে এ হার ১০ দশমিক ২ শতাংশ। আর তৃতীয় স্থানে রয়েছে নেপাল। দেশটির স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থায়নের হিস্যা ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। শ্রীলংকার এ হিস্যা ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, পাকিস্তানের ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতিবেশী দেশ ভারতের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
স্বাস্থ্যসেবায় দুর্বল ব্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলগুলো ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ব্যয়ের কত শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করেছে তার একটি চিত্র তুলে ধরা হয় তাতে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পুরো বিশ্বের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, কেবল ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় গড়ে মোট ব্যয়ের ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশই (২০২২ সালে) স্বাস্থ্য খাতে খরচ করে। আর স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় তা গড়ে ছিল ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ (২০২০ সালে)। ঋণের দায়ে জর্জরিত গরিব দেশগুলোয় মোট সরকারি ব্যয়ের ৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখে স্বাস্থ্য খাতে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সরকারি হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় বহু মানুষ চিকিৎসা নিলেও সেবা সন্তোষজনক নয়। ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কয়েকটি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বাদে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রতিই ঝুঁকছে মানুষ। কিন্তু সেখানেও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নানা ভোগান্তি, সঠিক রোগ নির্ণয় করতে না পারা, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ভুল রিপোর্টের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। সেই সঙ্গে চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগীকে যথেষ্ট সময় দিয়ে না দেখা, দায়িত্বে অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু, স্বাস্থ্যসেবায় অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক মনোভাব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কম। সামর্থ্যবানরা তাই সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশে চিকিৎসা নিতে চলে যাচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেনিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি। পরিকল্পনার অভাবে বাজেট বরাদ্দ করা হয় না। বাজেটে যে পরিমাণ বরাদ্দ করা হয় তা কাজে লাগানোর মতো কাঠামোও আমাদের নেই। পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতার অভাবে এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। এ অর্থটিকে কাজে লাগানোর জন্য পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সামর্থ্য তৈরি করা। বাংলাদেশের সব মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য পরিপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি এবং সেটিকে ধাপে ধাপে বিন্যস্ত করা হোক।’
স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন, রোগীর পর্যাপ্ত সেবা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনাকাটাসহ নানা ধরনের সংকট থেকেই যাচ্ছে। যেখানে এ খাতের সংস্কার ও উন্নয়নে সামগ্রিকভাবে বাজেট বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দরকার, তার তিন ভাগের এক ভাগ দেয়া হয়। আবার যে পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করা হয়, সেটার পুরো অংশই ব্যয় হয় না। তবে শুধু বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই যে এ খাতের উন্নয়ন হবে, বিষয়টি কিন্তু এমনও নয়। সঠিক পরিকল্পনাটা খুব জরুরি এখানে। পরিকল্পনা না হলে বাজেটের সঠিক ব্যবহার সম্ভব হবে না।’










