দেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বৈশ্বিক করপোরেট উদ্যোগ আরই১০০-তে যোগ দিয়েছে আকিজ বশির গ্রুপ। আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ক্লাইমেট গ্রুপ পরিচালিত এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, শক্তি সাশ্রয় ও সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারসংক্রান্ত কার্যক্রম আরো জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে শিল্প গ্রুপটি। বর্তমানে বিশ্বের চার শতাধিক প্রতিষ্ঠান আরই১০০-এর সদস্য। এসব প্রতিষ্ঠান ২০৫০ সালের মধ্যে নিজেদের কার্যক্রমে শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি বছর এক্ষেত্রে অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করতে হয়। পাশাপাশি আরই১০০-এর কারিগরি মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যও যাচাই করা হয়।
আকিজ বশির গ্রুপ জানিয়েছে, তারা আরই১০০-তে যোগদান নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহারকে আরো পরিকল্পিত, পরিমাপযোগ্য ও স্বচ্ছভাবে এগিয়ে নেয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি করবে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের অগ্রগতি আরো কার্যকরভাবে পরিমাপ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে নিজেদের কার্যক্রমের সামঞ্জস্য বাড়াতে এবং গ্রাহক ও অংশীদারদের আস্থা জোরদার করতে পারবে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার সম্প্রসারণে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আকিজ বশির গ্রুপের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হবে।
আকিজ বশির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ বশির উদ্দিন বলেন, ‘আকিজ বশির গ্রুপের জন্য আরই১০০-তে যোগদান শুধু নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের একটি প্রতিশ্রুতি নয়। আমাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য বিদ্যুতের ব্যবহার এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার যে পদ্ধতি, তা রূপান্তরের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ বৈশ্বিক উদ্যোগে যোগ দিতে পেরে আমরা গর্বিত। শতভাগ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারের লক্ষ্যে এটি আমাদের একটি অগ্রণী পদক্ষেপ। আমরা বিশ্বাস করি, ব্যবসার ভবিষ্যৎ গড়ে উঠতে হবে প্রবৃদ্ধি ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়ে।’

শেখ বশির উদ্দিন বলেন, ‘এ প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে আরো পরিবেশবান্ধব ও মজবুত শক্তি ব্যবস্থার রূপান্তরে অবদান রাখতে চাই। একই সঙ্গে আমরা অন্যান্য ব্যবসা ও শিল্প খাতকে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করতে চাই। সম্মিলিতভাবে আমরা ব্যবসা, জনসাধারণ এবং বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে পারি।’
আকিজ বশির গ্রুপ জানিয়েছে, এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে বিনিয়োগ চলছে প্রতিষ্ঠানটিতে। গ্রুপটির পার্টিকেল বোর্ড, সিরামিক, গ্লাসসহ বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রে বর্তমানে প্রায় ৯০ মেগাওয়াট পিকো পেস (এমডব্লিউপি) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। গ্রুপ পর্যায়ে প্রতিদিন সৌরশক্তি থেকে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি। আরই১০০-তে যোগ দেয়ার মাধ্যমে এ কার্যক্রম আরো এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত আকিজ সিরামিকসে স্থাপন করা হয়েছে ২৪ দশমিক ৩৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প। এ প্রকল্প থেকে বছরে প্রায় ২৮ হাজার ৫০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এতে বছরে প্রায় ২২ হাজার ৪৪০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। প্রকল্পটি ১০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছে। ফলে কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডেও বিদ্যুৎ দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে অবস্থিত আকিজ বশির গ্লাসে স্থাপন করা হয়েছে ১৮ দশমিক ২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সুবিধা। ফলে দিনের আলো না থাকলেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। আর এতে লোডশেডিংয়ের প্রভাবও কমানো সম্ভব হচ্ছে। কারখানাটিতে সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি ওয়েস্ট হিট রিকভারি প্রযুক্তিনির্ভর স্টিম টারবাইন ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট শক্তি ব্যবহারের ৭১ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসে।
গোশিঙ্গাতে আকিজ সিরামিকস কাঁচামাল গুদাম প্রকল্পে ২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার এবং ৪ মেগাওয়াট আওয়ার ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) রয়েছে, যা ১০০ ভাগ সৌরশক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়।
গ্লাস উৎপাদনের সময় সৃষ্ট বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার করে তা থেকে বাষ্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এ প্রযুক্তি শক্তিনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার দক্ষতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
আকিজ বশির গ্রুপের বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রে কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। জনতা জুট মিলসে স্থাপিত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা মিলটির সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করছে। ব্যাটারি স্টোরেজের মাধ্যমে দিনের আলো শেষ হওয়ার পরও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বোয়ালমারীর জনতা জুট মিলে ১৮ দশমিক ৩ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার রুফটপ, গ্রাউন্ড মাউন্টেড ও ভাসমান সোলার এবং ৮ দশমিক ৪ মেগাওয়াট আওয়ার ক্ষমতার ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে ১০০ ভাগ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ছবি: আকিজ বশির গ্রুপ
আকিজ পার্টিকেল বোর্ড মিলসে স্থাপন করা হয়েছে ৮ দশমিক ১ মেগাওয়াট পিকে ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। এটি থেকে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কিলোওয়াট-ঘণ্টা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ৭ হাজার ৪৫২ টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে।
শক্তি দক্ষতা বৃদ্ধি ও সম্পদের সাশ্রয়ী ব্যবহারে বৃহত্তর পরিসরে বিনিয়োগের ফলে গ্রুপটির এসব উদ্যোগ এগিয়ে যাচ্ছে। আকিজ বশির গ্রুপ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তি ও শক্তি দক্ষতাবিষয়ক একাধিক প্রকল্পে কাজ করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্রে বর্জ্য তাপ পুনরুদ্ধার, পানির পুনর্ব্যবহার, নেট মিটারিং এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আকিজ বশির গ্রুপ জানিয়েছে, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিকে আরো টেকসই ও নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর করে তুলতে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। ‘বিয়ন্ড টুমরো’ নীতির আলোকে দায়িত্বশীল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শক্তির ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে কাজ করবে গ্রুপটি।
উল্লেখ্য, আকিজ বশির গ্রুপ বাংলাদেশের একটি বহুমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সিরামিকস, গ্লাস, পাট, টেবিলওয়্যার, বাথওয়্যার, কেবলস, বায়োঅ্যাক্স ফিল্মস, স্টিল বিল্ডিংস, দরজা, বোর্ডসহ বিভিন্ন শিল্প খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। মান, উদ্ভাবন ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়ে গ্রুপটি আধুনিক প্রযুক্তি, দায়িত্বশীল উৎপাদন ব্যবস্থা ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করছে।










