বৈশ্বিক জীবাশ্ম জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ব্যাপকভাবে আমদানীকৃত জ্বালানিনির্ভর কোনো দেশের জন্যই স্বস্তির নয়। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্রাথমিক জ্বালানি যেহেতু বাংলাদেশ আমদানি করে, আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে উচ্চমূল্য আমাদের জন্য অনেকটাই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ থাকায়, জাপান-কোরিয়া মার্কার ইনডেক্সে মূল্য গত জানুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। তবে পরিবহন খরচ ও বীমা প্রিমিয়াম অনেক বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে এলএনজি আমদানি করতে ইনডেক্সের চেয়েও বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের বাজারে অনেকটা একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত বেশির ভাগ দিনেই প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের চেয়ে বেশি ছিল। একই সময়ে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ১৬২-১৮৮ ডলারের মাঝে ঘোরাফেরা করেছে। ফলে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কয়েকবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হলেও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে।
সবুজ জ্বালানি অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির মূল্য পরিবর্তিত হলেও কোনো প্রভাব না পড়ে তা আমাদের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। কিন্তু গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এ জ্বালানির অবদান এখন ২ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে। জমির দুষ্প্রাপ্যতা থাকলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের অগ্রগতি অনেকটাই মন্থর ছিল গত এক দশকে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমান সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ২০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির নতুন সক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট বাড়াতে হবে। যেখানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বলে রাখা প্রয়োজন শিল্প-কারখানাগুলো দিনের বেলা প্রতি ইউনিট গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারে মূল্য সংযোজন কর বাদে প্রায় ১১ টাকা ৫০ পয়সা ব্যয় করে। নিজস্ব বিনিয়োগে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে তারা দিনের বেলা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ৫-৬ টাকা সাশ্রয় করতে পারে। আবার সন্ধ্যাকালীন ৪ ঘণ্টা যেহেতু তারা মূল্য সংযোজন কর বাদে গ্রিডের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে প্রায় ১৬ টাকা ব্যয় করে, তারা এখন সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে স্টোরেজের কথাও ভাবতে পারে।
রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ সম্প্রসারণে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত নতুন উদ্যোগে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে যুক্ত হতে হলে আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। সময় স্বল্প হওয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণ বাসাবাড়ি আগ্রহী হবে কিনা সেটি ভেবে দেখা যেতে পারে। আমাদের দেশের অনেক পরিবার অসচ্ছল এবং সৌরবিদ্যুতে ঋণ নিয়ে কিংবা নিজস্ব মূলধন বিনিয়োগ করতে পারবে না। এক্ষেত্রে সরকার কিছুটা ভর্তুকি দেয়ার বিষয় বিবেচনায় নিতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেহেতু প্রায় ২৫ বছর ধরে উচ্চ মূল্যের জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি হ্রাসে ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রে কিছুটা ভর্তুকি দেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা যেতে পারে।
পাশাপাশি গ্রিড-স্কেল নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনে এবং গ্রিডের আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করতে হবে।
তবে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি ও সাশ্রয়কে অবহেলা করা যাবে না। বাসাবাড়িতে যেহেতু গ্রিডের বিদ্যুতের ৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহার হয়, এ খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সচেতনতা বাড়ানো না হলে জ্বালানি অদক্ষ অ্যাপ্লায়েন্স যেমন অদক্ষ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র একবার কেনা হলে তা অনেক বছর ধরে বেশি জ্বালানি ব্যবহার করবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের সঙ্গে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো হলে আমদানিনির্ভরতা যেমন কমবে তেমনি সরকারের ওপর আর্থিক চাপও কমবে।









