জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কয়েক দশকের নিষ্ক্রিয়তার ফলে ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়েছে। জলবায়ুবিজ্ঞানীরা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে এমন একটি সীমা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যার বেশি তাপমাত্রা বাড়লে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব আরো মারাত্মক হয়ে উঠবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো নিচু উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য এ ঝুঁকি বেশি, কারণ এসব দেশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়—উভয় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বিশ্বের হাতে খুব বেশি সময় নেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং এর জন্য দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে সরকারগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ডিজেল এবং প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতে বিপুল ভর্তুকি দেয়ার বর্তমান নীতি একদিকে যেমন সরকারি অর্থ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে তেমনি বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগকেও নিরুৎসাহিত করছে।
আমাদের শিল্প ও অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হলো জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ। বাংলাদেশে ডিজেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিতে সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়। এর ফলে এসব জ্বালানির দাম কৃত্রিমভাবে কম থাকে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনে রূপান্তরের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজেলে ভর্তুকি দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থার ওপর একটি অসহনীয় বোঝা। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রিতে সরকারের প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে জানা যায়। এর যৌক্তিক সমাধান হলো প্রতি বছর ডিজেলের দাম ২৩-৩০ টাকা করে বাড়িয়ে তিন-চার বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে ভর্তুকি প্রত্যাহার করা। ডিজেলের দাম নির্ধারিত হওয়া উচিত এর আমদানি, পরিশোধন ও বিতরণ খরচের ভিত্তিতে। সরকারি অর্থ ব্যয় করে ডিজেলের দাম কৃত্রিমভাবে কম রাখা উচিত নয়।

ছবি: ফ্রিপিক
জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আয় ও ব্যয়ের ঘাটতি ছিল প্রায় ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। জিডিপির তুলনায় কর রাজস্বের অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর মধ্যে থাকা বাংলাদেশের পক্ষে এত বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি অব্যাহত রাখা একেবারেই অসম্ভব। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য আনতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো প্রয়োজন। অবশ্যই জনগণকে নতুন দামের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার সুযোগ দিতে বিদ্যুতের দাম ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। তবে ডিজেলের ভর্তুকির মতোই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত তিন-চার বছরের মধ্যে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ভর্তুকি প্রত্যাহার করা। ফলে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে, যা দেশের কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।
সব মিলিয়ে ডিজেল ও বিদ্যুতের ভর্তুকির পরিমাণ বছরে অবিশ্বাস্য প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাচ্ছে। সরকারের সীমিত অর্থ ডিজেল ও বিদ্যুতের ভর্তুকিতে ব্যয় না করে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে দুর্বল সেবা প্রদানকারী সরকারি স্কুল ও হাসপাতালের মতো খাতে ব্যয় করা অধিকতর যুক্তিসংগত হবে। জীবাশ্ম জ্বালানি এবং প্রধানত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে ভর্তুকি কমানো বাংলাদেশের জন্য একটি সুস্পষ্ট প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার এবং সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে, যা দেশকে আরো টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।










