দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিজস্ব উৎসের অংশীদারত্ব বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা বারবার বলছে সরকার। সেই প্রসঙ্গ নিয়ে আরো একবার সরকারের পরিকল্পনার কথা জানালেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ১১ অক্টোবর সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির ব্যবহার-সংক্রান্ত বেসরকারি একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে সোলারের মাধ্যমে বড় অংকের বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এর মাধ্যমে কম খরচে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জনগণের চাহিদা মেটানো যাবে।’ জ্বালানি রূপান্তর, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য উৎসের অংশ বাড়ানোর গতি এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমানোর কার্যকর রোডম্যাপ নিয়ে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারের লক্ষ্য ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদ, সরকারি ভবনের ক্ষেত্রে সচিবালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু সরকার এগিয়ে এলেই চলবে না, বেসরকারি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, সরকারের করহার, নীতি—এসব ইস্যুতে আরো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৮১৬ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের হিস্যা ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৫২৩ মেগাওয়াট। এর বাইরে বায়ুবিদ্যুতের ওই অর্থে কোনো অংশগ্রহণ নেই। আর জলবিদ্যুৎ বলতে ২৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতা। সেটিও অনেক আগের ও পুরনো। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকার ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় উপকরণের ওপর শুল্ক ১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে সরকার। সেই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন হারে কর রেয়াত প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থনীতিতে পরিবেশবান্ধব রূপান্তর করা গেলে আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট বিনিয়োগ ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং রফতানি ২ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে দেশে প্রকৃত মজুরি, ব্যক্তিগত ভোগ এবং কর্মসংস্থানও বাড়ারও ইঙ্গিত রয়েছে। এসব লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অর্থনীতিকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়নের পথ থেকে সরিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে হবে। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত এক তথ্যে এসব সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। প্রবন্ধের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ ব্যাপক জ্বালানি রূপান্তর করা গেলে বিনিয়োগ সাড়ে ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত মজুরি ১ দশমিক ৫ শতাংশ, ব্যক্তিগত ভোগ ১ দশমিক ৩ শতাংশ ও মোট কর্মসংস্থান ১ দশমিক ১ শতাংশ বাড়বে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও নির্মাণ খাতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লাসংশ্লিষ্ট খাতের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে।
পরিবেশদূষণের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত ও জনকল্যাণমূলক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও সিসাদূষণের কারণে ২০১৯ সালে ক্ষতির পরিমাণ ছিল জিডিপির ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাবের বাইরে পরিবেশদূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য, শ্রমের উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক কল্যাণে প্রভাব পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০৫০ সাল নাগাদ আনুমানিক ২৩০ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে বলে সানেম আয়োজিত ও ওই প্রবন্ধে উঠে এসেছে। এ অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বাণিজ্যিক ব্যাংক, গ্রিন বন্ড এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে আসায় ক্রমেই বাড়ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), কয়লা ও তেল আমদানির প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, ভর্তুকি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং শিল্পের উৎপাদন খরচে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এ ঝুঁকিকে আরো স্পষ্ট করেছে। এ পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ শুধু জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।










