এ সময়ে বনভূমি কমেছে এক হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। তবে ৩৬৭ বর্গকিলোমিটার কৃত্রিমভাবে তৈরি সামাজিক বনায়ন বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত একটি জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ পরিসংখ্যান শক্তিশালীকরণ (ইসিডিএস) প্রকল্পের আওতায় এ জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে কৃষিজমির ব্যবহার কমেছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৫ সালে কৃষিজমির ব্যবহার ছিল ৫০ দশমিক ৪১ শতাংশ, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪৯ দশমিক ৪১ শতাংশে। এ সময়ে বনভূমি কমেছে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। ২০১৫ সালে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ বনভূমি ছিল, যার আয়তন প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশে। এছাড়া ১ দশমিক ১ শতাংশ জমির ব্যবহার নেই। ৬৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ অভ্যন্তরীণ জলরাশির ব্যবহার হচ্ছে না। তবে এ সময়ে বেড়েছে নির্মাণ ও এ-সংশ্লিষ্ট ভূমি এবং জলের অন্যান্য ব্যবহার।

অবৈধভাবে বালি উত্তোলন, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন কারণে উজাড় হচ্ছে বরিশাল অঞ্চলের উপকূলীয় বন। এতে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে উপকূলবর্তী মানুষের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বন বিভাগ ও পরিবেশকর্মীদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্ফীত জোয়ারের সঙ্গে সৈকতে বালি জমা হয়। সেগুলোয় গাছের শেকড় আটকে যাওয়ায় বনের গাছ মারা যাচ্ছে। বরগুনা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বন টেংরাগিরি, যার মূল আকর্ষণ ঝাউবন। অবৈধভাবে বালি উত্তোলন, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে যদিও তা উজাড় হচ্ছে। সৈকতের পাশেই বেসরকারিভাবে ৩৬০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। এজন্য সৈকতের তীর থেকে বালি উত্তোলন করায় ঝাউগাছ ভেঙে সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। ২০১৪-১৫ সালে সৈকতে ১০ হেক্টর ও ২০২০-২১ সালে সাত হেক্টর জমিতে ঝাউগাছের চারা রোপণ করে বন বিভাগ। কিন্তু ২০১৮-১৯ সাল থেকে সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝাপটায় শুরু হয় বালিক্ষয়। অব্যাহত বালিক্ষয়ে ভাঙতে শুরু করে ঝাউবন।

টেংরাগিরি বা ফাতরার বন বরগুনার তালতলী থেকে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সৈকত পর্যন্ত বিস্তৃত। এ বনের আয়তন ১৩ হাজার ৬৪৪ একর। এর বাইরেও ভোলা উপকূলে ১ লাখ ১০ হাজার একর সংরক্ষিত বন রয়েছে। এছাড়া বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলায় রয়েছে সামাজিক বনায়ন। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা টেংরাগিরি অতীতে সুন্দরবনের অংশ ছিল। পরে নির্দিষ্ট অংশকে আলাদা করে ১৯৬৭ সালে টেংরাগিরি বনাঞ্চল নামকরণ করা হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ জলাভূমি সুন্দরবনের ৩ শতাংশ হারিয়ে গেছে ৫১ বছরে। এ নিয়ে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ অ্যাকটিভ গবেষণা করে। গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালে সুন্দরবনের ৯৪ দশমিক ২ শতাংশ এলাকা ঘন বনাঞ্চলে আবৃত ছিল, যা ২০২৪ সালে কমে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ ৫১ বছরে প্রায় ৩ শতাংশ বনাঞ্চল হারিয়েছে সুন্দরবন। ১৯৭৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের ভূমি আবরণে পরিবর্তন ঘটেছে। ঘন বনের পরিমাণ কমে গেছে, আর জলাভূমির আয়তন বেড়েছে। এটি আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়া এবং বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়। কার্বন আত্তীকরণ থেকে উপকূল রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সেবা প্রদানকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতান্ত্রিক এলাকার আয়তন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

গবেষকরা অনুমান করছেন, গত ৩০ বছরে সুন্দরবনের বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের ক্ষতি হয়েছে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার, যার ৮০ শতাংশেরও বেশির জন্য দায়ী ম্যানগ্রোভ অবক্ষয়। সুন্দরবন বর্তমানে যেসব হুমকির সম্মুখীন সেগুলোও সত্বর বিবেচনা করতে হবে, যেমন বাঘের জনসংখ্যা হ্রাস, সুন্দরী গাছ অদৃশ্য হয়ে যাওয়া, সুন্দরবনের মধুর জন্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি এবং রামপালে কয়লাচালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ।

দেশের সমুদ্র উপকূলে জেগে ওঠা জমি স্বাধীনতা-পরবর্তী সত্তর থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি আইনের মারপ্যাঁচে দখল হয়ে গেছে উপকূলীয় বন বিভাগের বিস্তীর্ণ জমি। দখল হয়ে যাওয়া এ জমি উদ্ধারে আদালতে মামলা ও উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হলেও সেভাবে সফলতার মুখ দেখেনি। উপকূলীয় বন বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন বলছে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপকূলের জমি বেদখল হয়ে গেছে প্রায় ২১ হাজার একর। এসব জমির জবরদখলকারীর সংখ্যা প্রায় ১২ হাজার।

চট্টগ্রাম বন বিভাগের তথ্যমতে, উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ১১টি রেঞ্জের সমন্বয়ে গঠিত। এ ১১ রেঞ্জের মোট বনভূমির পরিমাণ ১৯৮৫ সালের বন বিভাগের গেজেট অনুযায়ী ১ লাখ ৬৫ হাজার একরের কিছু বেশি। উপকূলীয় বন বিভাগের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার ১১টি রেঞ্জের মধ্যে নয়টি রেঞ্জেই জবরদখলের পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার হেক্টর।