জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকা রক্ষায় পিকেএসএফ মাঠ পর্যায়ে কী ধরনের অভিযোজন কার্যক্রম পরিচালনা করছে?

আমাদের সব কর্মসূচিকে তিনটা পিলারের ওপর আমরা সুসংগঠিত করেছি। তার মধ্যে একটি পিলার হচ্ছে রিস্ক মিটিগেশন। এ ব্রডার রিস্ক মিটিগেশনের ভেতরে আমাদের পড়ে এনভায়রনমেন্টাল রিস্ক এবং ক্লাইমেটিক রিস্ক। অভিযোজনকে সর্বব্যাপী এবং ক্রস কাটিং ইস্যু হিসেবে নিয়েছি। আমাদের সব কর্মসূচির মধ্যে পরিব্যাপ্ত করে দিয়েছি বিষয়টিকে। যেকোনো কর্মসূচি আমরা নিই এটাকে ক্লাইমেট অ্যাডাপ্টেশনের সঙ্গে কমপ্লায়েন্ট কিনা, এনভায়রনমেন্টাল গাইড লাইনের সঙ্গে কমপ্লায়েন্ট কিনা, সেটা আমরা বিবেচনা করি। এটার একটা কারণ হচ্ছে, আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটা সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে দেখতে চাই। সমৃদ্ধ জাতি হতে হলে আমাদের প্রডাক্টিভিটি বাড়াতে হবে, ইনকাম বাড়াতে হবে, ইনক্লুসিভ গ্রোথ করতে হবে।

01

কার্বন নিঃসরণ কমানোয় গুরুত্ব দিচ্ছেন নাকি সহনশীলতার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছেন?

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। এ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, আমরা মিটিগেশন বা কার্বন নির্গমন হ্রাসের চেয়ে অভিযোজন বা জলবায়ু সহনশীলতা গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে দেশের তিনটি প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে আমাদের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার কাজ চলছে। প্রথমটি হলো দক্ষিণবঙ্গের লবণাক্ততা প্রবণ এলাকা—যেখানে প্রতিনিয়ত লবণাক্ততা বাড়ছে; দ্বিতীয়টি হলো প্লাবনভূমি, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘন ঘন বন্যা হচ্ছে; এবং তৃতীয়টি হলো বরেন্দ্র অঞ্চল যা মূলত খরাপ্রবণ এলাকা। এছাড়া যমুনা অববাহিকা এবং হাওরাঞ্চলেও আমাদের বিশেষ পরিবেশবান্ধব কার্যক্রম রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিশ্বে যে বড় তিনটি ফান্ড আছে—গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড, অ্যাডাপ্টেশন ফান্ড এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড—এ তিনটিরই স্বীকৃত সংস্থা হিসেবে আমাদের সরাসরি প্রবেশাধিকার রয়েছে।

উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা সমাধানে আপনাদের কর্মপদ্ধতি কী?

উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলে ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার হাত থেকে মাটির গুণাগুণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমাদের প্রধান হস্তক্ষেপ হলো জলবায়ু সহিষ্ণু ও লবণাক্ততা প্রতিরোধী বিভিন্ন ফসলের প্রসার ঘটানো। এর মধ্যে রয়েছে মুগডাল, সূর্যমুখী এবং বিশেষ জাতের ধান চাষ। পাশাপাশি পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে কাঁকড়া চাষ ও হ্যাচারি স্থাপন আমাদের একটি বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্র। তীব্র সুপেয় পানির সংকট দূর করতে আমরা উপকূলীয় এলাকায় প্রায় ৮৩টি ডিস্যালিনেশন প্লান্ট দিয়েছি। তবে কমিউনিটি ওনারশিপ বা ব্যবস্থাপনায় কিছু চ্যালেঞ্জ থাকায় বর্তমানে ৫৪টি প্লান্ট খুব ভালো চলছে। আমরা এখন পানির সমস্যা সমাধানে নতুন ব্যবসায়িক মডেল বা সলিউশন খুঁজছি। এমনকি দুর্গম অঞ্চলে যেখানে পানি অত্যন্ত দূষিত এবং মানুষের কেনার সামর্থ্য নেই, সেখানে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও আমরা চালাচ্ছি।

02

খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সুরক্ষায় কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সুরক্ষায় এবং বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে আমরা ৭০০ কিলোমিটার খাল খনন এবং প্রায় ১০০০টি সরকারি পুকুর পুনঃখনন করছি। এছাড়া মাটির আর্দ্রতা ও পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কার্বন সিকুয়েস্টেশনের (কার্বন শোষণ) জন্য আমরা ‘বায়োচার’ নামক এক ধরনের বিশেষ চারকোল জমিতে ব্যবহারের পরীক্ষা করছি, যা জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত কার্যকর।

বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি কীভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে?

বন্যার পানি থেকে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় আমরা এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার ভিটে বিপৎসীমার ওপরে উঁচু করে দিয়েছি। এগুলো আমরা এমনভাবে তৈরি করেছি যাতে বন্যা চলাকালীন কমপক্ষে তিনটি পরিবার তাদের গবাদিপশুসহ নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এবং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আমরা টেকসই আবাসন কাঠামো তৈরিতে কাজ করছি। উপকূলীয় দুর্গম এলাকায় আমরা প্রায় চার হাজার ঘূর্ণিঝড়সহিষ্ণু গ্রামীণ ঘর তৈরি করে দিয়েছি। এ ঘরগুলোর নকশা আমরা এমনভাবে করেছি যাতে ঝড়ের প্রাথমিক ধাক্কা আশপাশের গাছপালা সামলাতে পারে এবং গবাদিপশু নিরাপদে রাখা যায়। এছাড়া লবণাক্ত এলাকায় সিমেন্টের ক্ষয় রোধে আমরা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছি।

গ্রামীণ জনপদের অন্যতম সমস্যা স্বাস্থ্যসস্মত টয়লেট, যা পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে আপনাদের কার্যক্রম কী জানতে চাই।

স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমাতে এবং হাইজিন নিশ্চিত করতে আমরা ঋণের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ হাইজেনিক বা স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট তৈরি করেছি। এগুলো দ্বিতীয় প্রজন্মের টয়লেট এবং জিআইএস ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে যে কেউ এগুলোর অবস্থান পরীক্ষা করতে পারবেন। এ টয়লেটগুলো জেন্ডার ফ্রেন্ডলি এবং আমরা বাড়ির পাশে স্থাপন করছি, যেন ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মাঝে এটি ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ অর্থনীতি গড়তে পিকেএসএফের মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আপনি কোথায় দেখতে চান?

আমরা শুধু গ্রিন ফাইন্যান্সিং বা সবুজ অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না, বরং পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। এ লক্ষ্যে আমরা জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি কমাতে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছি। লবণাক্ত এলাকায় উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াকরণ বা ভ্যালু এডিশনের কাজ করছি। সূর্যমুখী থেকে তেল নিষ্কাশন এবং সেটির ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য আমরা মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ লেভেলে ফ্যাক্টরিগুলোতে অর্থায়ন করছি। মুগডালের প্যাকেজিং, গ্রেডিং এবং স্প্রাউট (অঙ্কুরিত শস্য) হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা করছি। এছাড়া লবণাক্ত এলাকায় ভেড়া পালন এবং বিদেশে ‹ল্যাম্ব মিট› রফতানির জন্য প্রসেসিং সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। আমাদের অন্যতম প্রধান একটি স্তম্ভ হলো দক্ষতা উন্নয়ন। আমাদের উদ্ভাবিত ‘ওস্তাদ-সাগরেদ’ মডেলটি এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকে পুরস্কৃত হয়েছে। আমরা বর্তমানে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। যেমন সাতক্ষীরার টেরাকোটা বা মৃৎশিল্পের বিশ্ববাজারে আমরা ব্যাপক চাহিদা তৈরি করতে পেরেছি। এছাড়া উপকূলীয় এলাকার নারীদের তৈরি কচুরিপানা বা আনারসের আঁশের হস্তশিল্প উন্নত দেশের ‹নিশ মার্কেটে› অর্গানিক পণ্য হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে, যা আমাদের বিশ্বাস—ভবিষ্যতে একটি বিলিয়ন ডলারের পরিবেশবান্ধব রফতানি খাতে পরিণত হতে পারে।