নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরিবেশ খাতে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা কী দেখেছেন—দুর্বল নীতি, দুর্বল প্রয়োগ, নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা?
পরিবেশ অধিদপ্তরের ভিশন ও মিশন বাস্তবায়নকল্পে অর্থাৎ দূষণমুক্ত বসবাসযোগ্য একটি সুস্থ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সময়োপযোগী আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনগুলো হলো: (১) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত, ২০১০) (২) পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ (৩) ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত, ২০১৯) (৪) বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন-২০১৭ এবং বিধিমালাগুলো হলো: (১) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ (পূর্বের পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭) (২) বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২ (৩) কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ (৪) ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ (৪) প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৬ (৫) বাংলাদেশ জীবনিরাপত্তা বিধিমালা, ২০১২ (৬) বিপজ্জনক বর্জ্য ও জাহাজভাঙার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১ (৭) চিকিৎসা বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাত) বিধিমালা, ২০০৮ (৯) শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬ (১০) ওজোনস্তর ক্ষয়কারী দ্রব্য (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৪ ইত্যাদি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরিবেশ খাতে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা আইনের দুর্বল প্রয়োগ। তবে বর্তমান পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন ও বিধিমালাগুলো প্রয়োগে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এসব আইন ও বিধিমালা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা বা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনবল স্বল্পতা। স্বল্প জনবল নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশের পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। আইন ও বিধিমালাগুলো যথাযথভাবে কার্যকর করতে মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ কারিগরি সহায়তারও প্রয়োজন। এছাড়া সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাব। জনগণ যদি সচেতন হয়, তবে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিযন্ত্রণে সরকারের জন্য সহায়ক হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধনী, ২০১০)-এর ৭ ধারা অনুযায়ী শুনানিঅন্তে ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ মে ২০২৬ পর্যন্ত দূষণকারী মোট ১ হাজার ২৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে ১১ কোটি ২৭ লাখ ১৭ হাজার ২২৬ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৭ কোটি ১৫ লাখ ৪ হাজার ২৫৫ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর ৪ক (২) ধারা অনুযায়ী ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ মে ২০২৬ পর্যন্ত দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট/এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে মোট ৬৩টি কারখানার সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
বায়ুদূষণ, নদীদূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে অতীতে বহু পরিকল্পনা হয়েছে। মানুষ কেন বিশ্বাস করবে এবার বাস্তব পরিবর্তন হবে?
মানুষ এবার বাস্তব পরিবর্তনে বিশ্বাস করতে পারবে, কারণ সরকার শুধু পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়ন, মনিটরিং ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৯)’ এবং ‘বাংলাদেশ বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২’ অনুযায়ী ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, উন্মুক্ত নির্মাণসামগ্রী, সিসাদূষণ ও অন্যান্য দূষণ উৎসের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (এনএকিউএমপি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উন্মুক্ত বর্জ্য পোড়ানো বন্ধে অভিযান ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তবমুখী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বিধি সংশোধনসহ উক্ত প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে সরকার দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে, যা অতি দ্রুত দৃশ্যমান হবে। এর ফলে বর্জ্য হতে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকাংশ হ্রাস পাবে। এছাড়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎসাহিত করার জন্য সরকার বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে।
যানবাহনজনিত দূষণ কমাতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিআরটিএ যৌথভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে এবং এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক বৈদ্যুতিক বাস/ট্রাক আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক (যদি থাকে), আগাম কর এবং অগ্রিম আয় কর থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
দেশের বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ (পায়রা, মাতারবাড়ী, রামপাল, বাঁশখালী ইত্যাদি) বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বায়ুদূষণ নিঃসরণমাত্রা পরিমাপের লক্ষ্যে কন্টিনিউয়াস এমিশন মনিটরিং সিস্টেম (সিইএমএস) স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণের নিঃসরণ মাত্রা রিয়াল টাইম ভিত্তিতে পরিমাপ করা হচ্ছে।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩১টি সার্বক্ষণিক বায়ুমান মনিটরিং স্টেশনের মাধ্যমে বায়ুমান পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং একিউ। তথ্য রিয়েল টাইমে প্রকাশ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন মনিটরিং স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে পরিবেশ ও নদী রক্ষায় শুধু পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর নজরদারি, আধুনিক আইনগত কাঠামো এবং জবাবদিহি নিশ্চিতকরণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেয়া হচ্ছে। ফলে এবারের উদ্যোগগুলো দৃশ্যমান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে।
মানুষ এবার পরিবর্তন বিশ্বাস করবে। কারণ বর্তমানে শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনা নয়, বরং সরকার নদ-নদী ও জলাভূমির দূষণরোধ ও পরিবেশগত মানোন্নয়নে বাস্তবসম্মত কাজ করছে।
পরিবেশ বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বড় ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রায়ই কঠিন বলে অভিযোগ আছে। রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে আইন প্রয়োগ করা কতটা সম্ভব হবে?
পরিবেশ অধিদপ্তর চারটি আইন ও ১০টি বিধিমালার আলোকে সমগ্র দেশে পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ দূষণকারী কোনো ব্যক্তি/শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের ছাড় দেয়া হচ্ছে না। দূষণকারী ব্যক্তি/শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নোটিস প্রেরণ, শুনানি গ্রহণ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট/এনফোর্সমেন্ট অভিযানের মাধ্যমে জরিমানা/ক্ষতিপূরণ আদায়, উচ্ছেদ, সিলগালা এবং থানায় ও পরিবেশ আদালতে মামলা দায়েরসহ অন্যান্য আইনানুগ কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবেশ সমুন্নত রাখার প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত, ২০১০); ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (সংশোধিত, ২০১৯), বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২ ইত্যাদিসহ অন্যান্য আইন ও বিধিমালা মাধ্যমে সমগ্র দেশে নিম্নোক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
১১৭টি ভাটার চিমনি ভেঙে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে; ৫৬টি অবৈধ ইটভাটার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে; ছয়টি সিসা ব্যাটারি কারখানা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে; তিনটি সিসা ব্যাটারি কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে; তিনটি পাইরোলাইসিস কারখানা ভেঙে ফেলা হয়েছে; চারটি ওয়াশিং কারখানা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে; ২০টি কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির চুল্লি ধ্বংস হয়েছে; ২৫টি অবৈধ রিসোর্ট ভেঙে দেয়া হয়েছে।
পরিবেশ-সংক্রান্ত আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বড় ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রায়ই কঠিন বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা যথাযথ নয়। বাংলাদেশের পরিবেশ খাতে সবচেয়ে বড় সংকট এখন আইন না থাকা নয়, বরং আইন প্রয়োগের সাহস, স্বাধীনতা ও ধারাবাহিকতার ঘাটতি। বছরের পর বছর ধরে প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী, অবৈধ ইটভাটা, দখলদার ও দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা এসেছে, কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবে সেই প্রয়োগ থেমে গেছে। বাস্তবতা হলো শুধু মোবাইল কোর্ট বা জরিমানা বা পরিবেশগত ক্ষতিপূরণ আদায় দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না; প্রয়োজন এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন বা প্রভাবশালী মহলের চাপের ওপর নির্ভর করবে না। সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার অভিযান ও কোটি টাকার জরিমানা/ক্ষতিপূরণ আদায়ের তথ্য আইন প্রয়োগে কঠোরতার ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনে বড় ভুক্তভোগী। কিন্তু দেশের পরিবেশ ধ্বংসের জন্য আমরা নিজেরা কতটা দায়ী বলে মনে করেন?
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ, যা মানব সভ্যতার অস্তিত্ব ও টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করেছে। আন্তঃসরকার জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের (আইপিসিসি) ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে (এআর৬) জলবায়ু সংকটকে মানবজাতির জন্য একটি ‘রেড অ্যালার্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ছে। এর ফলে বাংলাদেশসহ নিম্নভূমি ও উপকূলীয় দেশগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ, অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে আমাদের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আমাদের দায় সীমিত হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশগত অবক্ষয়ের জন্য আমরা নিজেরাও কম বেশি দায়ী। পাহাড় কাটা, নদীদূষণ, বনভূমি দখল, অবৈধভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে বন ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় সীমিত হলেও পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিজেদের। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আমরা এককভাবে রোধ করতে না পারলেও নদী দখল, বায়ুদূষণ, জলাভূমি ভরাট, পাহাড় কাটা এবং প্লাস্টিক দূষণের মতো সমস্যাগুলো মোকাবেলা করা আমাদেরই দায়িত্ব। সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক—সবার সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াতে চায়। এ লক্ষ্য ও পরিবেশগত কঠোরতার মধ্যে সংঘাত তৈরি হলে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেবেন?
দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই আমার মতে, সরকারকে এমন অবস্থান নিতে হবে যেখানে পরিবেশগত ন্যূনতম মান ও জনস্বাস্থ্যকে অ-আলোচনাযোগ্য (নন-নেগোশিয়েবল) হিসেবে ধরে, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রায়ই যুক্তি দেয়া হয় যে কঠোর পরিবেশগত শর্ত বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে অনিয়ন্ত্রিত দূষণ, নদী দখল, বায়ুদূষণ, জলবায়ু ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয় অর্থনীতির ওপর বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি করে। দূষণের কারণে স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা হ্রাস, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, পানির সংকট এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় বিপুল সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং এসবই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অর্থাৎ পরিবেশ সুরক্ষাকে ব্যয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
তবে পরিবেশগত কঠোরতা মানে বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়া নয়, বরং সরকারকে এমন একটি ‘স্মার্ট রেগুলেশন’ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে পরিবেশবান্ধব ও দায়িত্বশীল বিনিয়োগ দ্রুত অনুমোদন পাবে, কিন্তু পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প কঠোর যাচাইয়ের মুখোমুখি হবে। উদাহরণস্বরূপ, গ্রিন প্রযুক্তি ব্যবহারকারী শিল্প, বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি/এসটিপি) স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এবং সম্পদসাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যবস্থাকে কর সুবিধা ও নীতিগত সহায়তা দেয়া যেতে পারে। অন্যদিকে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনা না করে যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে। যদি ছোট শিল্প-কারখানা বা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু বড় ও প্রভাবশালী দূষণকারীরা দায়মুক্তি পায়, তাহলে পরিবেশ সুরক্ষা যেমন ব্যর্থ হবে, তেমনি বিনিয়োগকারীদের কাছেও ভুল বার্তা যাবে। একটি পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশই সৃষ্টি করে।
প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সুরক্ষা—তিনটি লক্ষ্যকে একই উন্নয়ন কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হবে। একে অন্যের বিকল্প হিসেবে নয়, পরিবেশ সুরক্ষা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ও নগরমুখী চাপ বাড়ছে। সরকার কি এটিকে ভবিষ্যতের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট হিসেবে দেখছে?
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ, যা মানব সভ্যতার অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) এর ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে (এআর৬) বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্টভাবে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে। মানুষের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে বাংলাদেশসহ নিম্নভূমি উপকূলীয় দেশগুলো মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ৮ মিলিমিটার। ওই গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এ শতকের শেষে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় ১২ দশমিক ৩৪ থেকে ১৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ অংশ সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে দেশে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি দ্রুত বাড়ছে। জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি) ২০২৩-২০৫০ অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ১৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০‑এ উল্লেখ করা হয়েছে যে জলবায়ুজনিত অভিবাসন ভবিষ্যতে নগর অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশ সরকার এ প্রবণতাকে একটি উদীয়মান সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকার পরিকল্পিত পুনর্বাসন, জলবায়ু সহনশীল নগরায়ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বিকল্প জীবিকা সংস্থানের মতো কৌশল গ্রহণ করেছে, যাতে অনিয়ন্ত্রিত নগরমুখী অভিবাসন হ্রাস পায়। পাশাপাশি উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো, সাইক্লোন শেল্টার, খাল পুনঃখনন, সুপয়ে পানির নিশ্চয়তা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে টিকে থাকার সক্ষমতা জোরদার করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশ সরকার জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, উন্নয়ন ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং সম্ভাব্য সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রতিরোধে এটিকে অগ্রাধিকারমূলক নীতি-ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলবায়ুসহিষ্ণু উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হচ্ছে।
আগামী পাঁচ বছরে এমন কোনো একটি পরিবেশগত পরিবর্তন দেখতে চান, যার ভিত্তিতে মানুষ বিএনপি সরকারের পরিবেশনীতি বিচার করবে?
বর্তমান সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার নদ-নদী ও খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার সার্কুলার ইকোনমি বাস্তবায়নপূর্বক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সরকার এগুলো বাস্তবায়ন করবে; যার দৃশ্যমান উন্নয়ন জনগণ দেখতে পাবে এবং পরিবেশগত সুফল জনগণ পাবে বলে আশা করছি।
২০৩৫ সালের বাংলাদেশ কল্পনা করলে সবচেয়ে বড় পরিবেশগত ঝুঁকি কোনটি বলে মনে করেন, যা এখনই মোকাবেলা না করলে অর্থনীতি ও সমাজ দুটোকেই আঘাত করবে?
২০৩৫ সালের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে আমি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বহুমাত্রিক ঝুঁকিকে—বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বিস্তার, চরম আবহাওয়া, নদীভাঙন এবং পানি সংকটের সম্মিলিত প্রভাবকে দেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবেশগত ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করব। এটি শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; বরং কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, নগরায়ণ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর একযোগে প্রভাব ফেলতে সক্ষম একটি জাতীয় উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ।










