দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে আরো বাড়বে বলে প্রত্যাশা করি। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো জোরদার হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ সহায়তা করবে, এটিই আমাদের প্রত্যাশা।

দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক এমনিতে স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুদিন আগ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে কোনো বাড়তি শুল্ক ছিল না। এ শুল্কের কারণে প্রথমে ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্ট, তারপর সেকশন ১২২। তারপর সেগুলো রিপ্লেস হয়ে এখন সেকশন ৩০১।

আমাদের অরিজিনাল যে শুল্ক ছিল, ১৫ বা সাড়ে ১৫ শতাংশ, যতই ছিল আগে, তার সঙ্গে এখন আরো ১০ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হয়েছে। শুল্ক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যায়। আর জিনিসের দাম বাড়লে ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। যদি দাম কম থাকে, তাহলে ভোক্তার পক্ষে ক্রয়ক্ষমতায় বেশি উপভোগ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক এমনিতে ভালো, সে রকম কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে আমরা আশা করব, আগামী দিনে একটা বিকাশমান অর্থনীতির দেশ হিসেবে আমরা বেশি বেশি মার্কিন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারব। দেশটি প্রযুক্তির দিক থেকেও পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রসর অর্থনীতি।

আগামী দিনে তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট উৎকর্ষ ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে একটা বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

আমাদের রফতানি পণ্য তো এখনো ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাক বা আরএমজির ওপর নির্ভরশীল। সেটা শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নয়। যে বাজারেই আমরা যাই, সেখানে প্রধানতম রফতানি পণ্য হচ্ছে আরএমজি।

এখন আরএমজির ওপর থেকে আমাদের নির্ভরতা, মানে রফতানির শেয়ার হিসেবে অন্য সেক্টরগুলো যদি আমরা বাড়াতে পারি, তাহলে আরএমজির শেয়ারটা কমে আসবে। আরএমজি এখন যে ৩৮-৩৯ মিলিয়ন, এটাতে আমরা খুশি না। এটা আরো অনেক বাড়া উচিত। এখানে ম্যানমেড ফাইবারের মূল্য সংযোজিত পণ্যগুলো বেশি বেশি রফতানিতে যাবে। আগামী দিনে সেটা আমাদের প্রত্যাশা।

এ রফতানিও বাড়বে, কিন্তু সঙ্গে চামড়া, পাট, হালকা প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ, এসব সেক্টর বেশি বেশি করে রফতানি করতে পারবে। যাতে অন্য সেক্টরগুলোর অনুপাত বাড়ে। এজন্য আমরা পরিকল্পনামাফিক বেশকিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি। যেমন চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, এগুলোর ওপর আমাদের পদক্ষেপগুলো খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা জনসম্মুখে ঘোষণা করব।

আগামী দিনে আমরা রফতানি বহুমুখীকরণ, যেটা এতদিনের একটা মুখের কথা ছিল, সেটা বাস্তবতায় রূপান্তর করার জন্য বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ নেব। সেটার ঘোষণা আমরা জনসম্মুখে করব।

বাংলাদেশ যেগুলো আমদানি করে, মূলত একটা হচ্ছে কাঁচামাল, আরেকটা হচ্ছে জ্বালানি। আগামী দিনে এ আমদানিনির্ভর জ্বালানি, যেমন এলএনজি, আমাদের যদি অর্থনীতির বিকাশ হয়, বেশি বেশি শিল্প বিনিয়োগ ঘটে, তাতে অন্যান্য উৎসে বহুমুখীকরণ করার পরও এখনকার তুলনায় অনেক বেশি এলএনজি আমাদের লাগবে।

সেই জ্বালানির চাহিদা মেটাতে পৃথিবীর বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা জ্বালানি আমদানি করব। তার মধ্যে আমেরিকা নিঃসন্দেহে একটা বড় উৎস। কারণ আমেরিকার পর্যাপ্ত এলএনজির মজুদ রয়েছে। বিশ্বে এ মুহূর্তে তারাই এলএনজির সবচেয়ে বড় উৎপাদক।

আগামী দিনে আমরা বাংলাদেশ-আমেরিকান বিনিয়োগ সম্পর্কটা এভাবে দেখতে চাই যে প্রতি বছর যে আমেরিকান বিনিয়োগ বা এফডিআই, যা এখনো জ্বালানিনির্ভর, সেটা বহু খাতে বিস্তৃত থাকবে।

বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, সেটা এখনকার ১০ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক গুণ বাড়বে। মূলত একদিকে তাদের বিনিয়োগ আমাদের এখানে বাড়বে, আর আমাদের এখান থেকে তাদের এখানে রফতানি অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং সেটা বহু খাতভিত্তিক হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক সহযোগিতা আরো অনেক বেশি বৃদ্ধি পাবে। তাদের উন্নত প্রযুক্তি আমাদের উন্নতিতে একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

প্রত্যেক অর্থনৈতিক ব্লক বা প্রত্যেক দেশের, অঞ্চলভেদে, ক্রেতাদের নিজস্ব রুচি ও পছন্দ আলাদা। বাংলাদেশ আমেরিকায় যেগুলো রফতানি করবে, সেগুলো আমেরিকান ক্রেতার রুচি ও পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করতে হবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র। তাদের জিডিপির আকার ৩৮ ট্রিলিয়ন। প্রযুক্তিতেও তারা পৃথিবীর সবচেয়ে অগ্রসর দেশ। সেই দেশের বিশাল ভোক্তা বাজারে আমরা যে পণ্যগুলো রফতানি করি, সেগুলো যদি কিছু পরিমাণেও বাড়াতে পারি, সেটাও আমাদের সামগ্রিক উন্নতি বা রফতানির কলেবর বৃদ্ধির জন্য একটা বিরাট পদক্ষেপ হবে।