চার দশক আগে অর্থাৎ ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানির পরিমাণ ছিল ২১৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশ থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ১৯৬ মিলিয়ন ডলার। দুই দেশের বাণিজ‍্য ভারসাম‍্যে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ২২ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৮৬ সাল থেকেই পরিস্থিতি পাল্টে গেল। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি খুব একটা না বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি ক্রমে বাড়তে শুরু করে। ফলে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আমাদের ঘাটতির পরিমাণ ৭০৮ কোটি ডলারে উন্নীত হলো।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রফতানীকৃত পণ্যসামগ্রীর তালিকায় রয়েছে তুলা, সয়াবিন, লোহার স্ক্র‍্যাপ, বিমান ও সামরিক সরঞ্জাম, বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত, জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, গম এবং অন‍্যান‍্য কৃষিপণ‍্য। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানীকৃত পণ‍্য তালিকায় রয়েছে তৈরি পোশাক ( নিট ও ওভেন), চামড়াজাত পণ‍্য, জুতা, কৃষি খাদ‍্যসামগ্রী, মাছ এবং প্লাস্টিক ও পাটজাত পণ‍্য। এর মধ্যে তৈরি পোশাক একাই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগের দাবিদার। বিশ্বের অন‍্যান‍্য পোশাক রফতানিকারক দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক শিল্পের বিশাল বাজারে বর্তমানে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশের পোশাক শিল্পের ক্রমবিকাশ ও দ্রুত অগ্রগতিই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ার প্রধান নির্ণায়ক।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি তুলনামূলক সুবিধা। বিশেষ বা বাড়তি কোনো সুবিধা ভোগ করা ছাড়াই তুলনামূলক সুবিধার ভিত্তিতে মার্কিন বাজারে রফতানি বাড়াতে বাংলাদেশ যতটা সফল হয়েছে, ততটা সফল হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতির এটাই কারণ। কারো কারো মনে হতে পারে, কিছু বিদেশী পণ‍্যের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্কহার, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি বাড়ানোয় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। প্রাসঙ্গিক বক্তব্য হলো, কোন বিশেষ দেশের পণ‍্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘটনা বাংলাদেশে কখনো ঘটেছে বলে শোনা যায়নি। শুল্কহার সব দেশের পণ‍্যের ওপরেই সমানভাবে প্রযোজ্য, যদি না কোন বিশেষ দেশের সঙ্গে বিশেষ কোনো বাণিজ্য চুক্তি হয়।

দুই দেশের মধ‍্যে সবসময় বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে এ ধারণা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের বিশাল ঘাটতি রয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে আমাদের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত। প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এটাই স্বাভাবিক। যে বিষয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন তা হলো, বিশ্ব বাণিজ্যে অর্থাৎ বিশ্বের সব দেশ থেকে পাওয়া রফতানি আয় এবং বিশ্বের সব দেশ থেকে আমদানীকৃত পণ্যের জন‍্য ব‍্যয়ে যেন মোটামুটি ভারসাম‍্য থাকে। মোটামুটি বলছি এ কারণে যেন ঘাটতিটা ঋণপ্রবাহ দ্বারা বা অন‍্য কোনো পন্থায় সহজে মেটানো যায়।

গোটা বিশ্বের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব‍্যবস্থায় হঠাৎ করে সুনামির সৃষ্টি হলো, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানীকৃত পণ‍্যের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক ধার্য‍ করলেন। যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে সেই সব দেশই হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লক্ষ‍্যবস্তু। বাংলাদেশ থেকে আমদানীকৃত পণ‍্যসামগ্রীর ওপর ধার্য‍ করা হলো ৩৭ শতাংশ হারে শুল্ক। তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল আলোচনায় বসল যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে। ফলে সম্পাদিত হলো একটি বাণিজ্য চুক্তি, সেটিও অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তিম সময়ে। শুল্কহার নেমে এল ১৯ শতাংশে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা ব‍্যবহার করে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করবে বিনা শুল্কে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশকে বাধ‍্যতামূলকভাবে নিতে হবে নানা পদক্ষেপ। আরো জুড়ে দেয়া হয়েছে কিছু শর্ত। এতেই শুরু হয়েছে নানা বিতর্ক।

একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, যেসব পণ‍্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে বলা হয়েছে, তার বেশ কয়েকটি আগে থেকেই আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করছি। তুলা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ‍্যাস, জ্বালানি তেল, যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ, বিমান ইত্যাদি পণ্য নিয়মিতই আমদানি করা হয়। এসব পণ‍্যের আমদানি বাড়ানো বড় সমস‍্যা হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া বর্তমান মধ‍্যপ্রাচ‍্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করলে জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। নির্দ্বিধায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানীকৃত পণ‍্যের ওপর শুল্কহার কমানো এমনকি শূন‍্যও করা যেতে পারে। তা করলেই যে যুক্তরাষ্ট্রের পণ‍্যে বাংলাদেশের বাজার ছেয়ে যাবে এবং স্থানীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। যেমন বিনা শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের পণ‍্য আমদানির সুযোগ পেলেও বাংলাদেশে জাপানি গাড়ির তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত গাড়ির চাহিদা বাড়বে কিনা সন্দেহ। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে যেসব পণ‍্য বিনা শুল্কে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেও যদি স্থানীয় উৎপাদন ব‍্যাহত না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিনা শুল্কে পণ‍্য আমদানিতে ভয় কিসের?

যেকোনো চুক্তিই পারস্পরিক সম্মতিতে পুনর্বিবেচনা অথবা পর্যালোচনা করা সম্ভব। জনমনে বিভ্রান্তি নিরসনে সংসদে চুক্তিটির চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তিটি সংশোধন করা যেতে পারে।

লেখক: অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ‍্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়