২০২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ ফ্যাশন কোম্পানির নিট মুনাফা প্রথমবারের মতো ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে ৮১১ কোটি ৪৫ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকা থেকেই এসেছে ৩৩৩ কোটি ডলার। একই অর্থবছরে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা ছিল প্রায় ১২০ কোটি ডলার।

নিউইয়র্কে এ ব্র্যান্ডের ব্যবসা শুধু পোশাকে সীমাবদ্ধ নয়। পোশাকের পাশাপাশি গৃহসামগ্রী, আনুষঙ্গিক পণ্য ও সুগন্ধিও রয়েছে তাদের পণ্যভাণ্ডারে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত এ ব্যবসার সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ভিত্তি। আর রালফ লরেনের মতো উচ্চ মূল্যের মার্কিন ব্র্যান্ডের সঙ্গে এ সম্পর্ক বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রধান শক্তি ছিল বড় পরিমাণে তুলনামূলক কম মূল্যের মৌলিক পোশাক উৎপাদন। এখন সেই সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে উন্নত কাপড়, বিশেষ ফিনিশিং ও উচ্চ মূল্যের পোশাক তৈরির অভিজ্ঞতা। রালফ লরেনের বাংলাদেশে সোর্সিং কার্যক্রম এ পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

গল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ২০১৩ সালে। রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ বন্ধ করে দেয় রালফ লরেন। প্রায় ছয় বছর পর ২০১৯ সালের নভেম্বরে ঢাকায় সোর্সিং কার্যক্রম পুনরায় চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশে তাদের সোর্সিং অফিস পুনরায় খোলার বিষয়টি বিজিএমইএও তখন আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল।

ফিরে আসার সময় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পও আগের অবস্থায় ছিল না। রানা প্লাজার পর কারখানা নিরাপত্তা, শ্রমিকের কর্মপরিবেশ, অগ্নিনিরাপত্তা ও ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত মান পূরণের সক্ষমতাও বাড়ে।

রালফ লরেনের নিজস্ব করপোরেট নথিতেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের প্রমাণ রয়েছে। কোম্পানির নথিতে রালফ লরেন সোর্সিং বাংলাদেশ লিমিটেডের ঢাকার ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশে শুধু স্থানীয় পোশাক প্রস্তুতকারকের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদন নয়, ব্র্যান্ডটির নিজস্ব সোর্সিং কাঠামোও রয়েছে।

কোম্পানিটির বৈশ্বিক নাগরিকত্ব ও স্থায়িত্ব প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরবরাহকারী কারখানার সঙ্গেও তাদের কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া যায়। সরবরাহকারীদের পরিবেশগত ও সামাজিক মান যাচাই এবং উন্নয়নের অংশ হিসেবে রালফ লরেন বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে। ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে কোম্পানিটি তাদের প্রথম স্তরের সরবরাহকারী ও শীর্ষ বস্ত্রকলগুলোর পরিবেশগত মান যাচাইয়ের কথাও জানিয়েছে।

তবে পোশাকের পাশাপাশি এ গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে কাপড়ের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রালফ লরেনের মনোনীত পোশাক কারখানার জন্য এখন দেশেই বিভিন্ন ধরনের কাপড় তৈরি হচ্ছে। এনভয় টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান কুতুবউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠান রালফ লরেনের সরবরাহকারী তিনটি বাংলাদেশী পোশাক কারখানার জন্য ডেনিম কাপড় তৈরি করছে। শাশা ডেনিমও রালফ লরেন মনোনীত পোশাক কারখানায় কাপড় সরবরাহের কথা জানিয়েছে। আগে এসব কাপড়ের কিছু তুরস্ক থেকে আমদানি করা হতো।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের জন্য বাংলাদেশের সক্ষমতা এখন শুধু পোশাক সেলাইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। পোশাক তৈরির আগের ধাপ, অর্থাৎ কাপড় তৈরির ক্ষেত্রেও স্থানীয় শিল্প যুক্ত হচ্ছে। এতে একই সরবরাহ শৃঙ্খলের মধ্যে বাংলাদেশে থাকা মূল্য সংযোজনের পরিমাণ বাড়ছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে কাপড় আমদানির প্রয়োজন কমায় সরবরাহের সময়ও কমানো সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পের সামগ্রিক সক্ষমতারও এখানে ভূমিকা রয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের হিসাবে দেশে এখন ৪২টি আধুনিক ডেনিম মিল রয়েছে, যেগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৯০ কোটি মিটারের বেশি। স্থানীয় মিলগুলো থেকে রালফ লরেন, হুগো বস, জি-স্টার র, এজি ও পুমার মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য ডেনিম সরবরাহের তথ্যও পাওয়া যায়।

রালফ লরেনের মতো ব্র্যান্ডের জন্য কাজ করতে অবশ্য শুধু বড় কারখানা থাকলেই হয় না। উন্নত কাপড়, নির্ভুল মান নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ ফিনিশিং, নকশা অনুযায়ী উৎপাদন এবং অপেক্ষাকৃত ছোট পরিমাণের বৈচিত্র্যময় অর্ডার দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখন এ ধরনের পণ্য তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছে। খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, রালফ লরেনের মতো ব্র্যান্ডের জন্য তৈরি কিছু পোশাকের খুচরা মূল্য সাধারণ পণ্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের গুরুত্বও আলাদা করে দেখার মতো। রালফ লরেনের ২০২৬ অর্থবছরের মোট রাজস্বের প্রায় ৪১ শতাংশ এসেছে উত্তর আমেরিকা থেকে, যার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। একই সময়ে কোম্পানিটির উত্তর আমেরিকার রাজস্ব বেড়েছে ৯ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের একটি কারখানার তৈরি উচ্চ মূল্যের পোশাক যখন রালফ লরেনের সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, তার সম্ভাব্য গন্তব্য শুধু একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের পণ্যভাণ্ডার নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বড় ভোক্তা বাজারও।

এখানেই বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পরবর্তী সম্ভাবনা। দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি, অর্থাৎ বড় পরিমাণে পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতাকে যদি উন্নত কাপড়, নকশা, ফিনিশিং ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে একই পরিমাণ পোশাক রফতানি করেও বেশি মূল্য সংযোজন সম্ভব। স্থানীয় বস্ত্র মিলের সক্ষমতা বাড়লে সেই মূল্য সংযোজনের আরো বড় অংশ দেশের ভেতরে রাখা যাবে।

রানা প্লাজার পর যে মার্কিন ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে সরে গিয়েছিল, তার ফিরে আসা তাই শুধু একটি ক্রেতার প্রত্যাবর্তনের ঘটনা নয়। রালফ লরেনের বর্তমান সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের পোশাক ও কাপড় প্রস্তুতকারকদের অংশগ্রহণ দেখাচ্ছে, দেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতার জায়গাটিও বদলাচ্ছে। বেসিক পোশাকের বড় সরবরাহকারী থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমূল্যের পোশাক বাজারের অংশীদার হয়ে ওঠার এ উত্তরণে এখন মূল প্রশ্ন কত বেশি পোশাক তৈরি করা যায়, পাশাপাশি কত বেশি মূল্য দেশে রাখা যায়। সঠিক নীতিসহায়তা, প্রযুক্তি ও দক্ষতায় বিনিয়োগ এবং মার্কিন ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে রালফ লরেনের মতো ব্র্যান্ডের সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরো গভীর হওয়ার সুযোগ রয়েছে।