ভোক্তা ও ব্যবসায়িক অবস্থানে পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সঙ্গে দুই ব্র্যান্ডেরই সরবরাহ সংযোগ রয়েছে।
দুই ব্র্যান্ডের আর্থিক আকারও বড়। আমেরিকান ঈগল আউটফিটার্স ২০২৫ অর্থবছরে ৫৫০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে। একই সময়ে গ্যাপ ইনকরপোরেটেডের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড ওল্ড নেভির বিক্রি ছিল প্রায় ৮৭০ কোটি ডলার। অর্থাৎ শুধু ওল্ড নেভির বার্ষিক বিক্রিই আমেরিকান ঈগল আউটফিটার্সের মোট আয়ের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকান ঈগলের সরবরাহ সংযোগের সাম্প্রতিক প্রমাণও রয়েছে। বাণিজ্য তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকান ঈগল আউটফিটার্স এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ডেনিম স্টুডিও, কেনপার্ক বাংলাদেশ ও জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফ্যাব্রিকসের মতো প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়। এর আগে জে এম ফেব্রিকসের মতো বাংলাদেশী কারখানার নিরীক্ষা নথিতেও আমেরিকান ঈগল আউটফিটার্সকে প্রধান ক্রেতাদের একজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমেরিকান ঈগল নিজস্বভাবে পোশাকের নকশা করলেও উৎপাদনের জন্য তৃতীয় পক্ষের কারখানার ওপর নির্ভর করে। ২০২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেছে। কোনো একক কারখানা বা সরবরাহকারীর ওপর তাদের নির্ভরতা ১০ শতাংশের বেশি নয়। সরবরাহকারীদের বড় অংশই এশিয়ায় অবস্থিত। খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সরবরাহকারী বাংলাদেশ।
অন্যদিকে ওল্ড নেভি যুক্তরাষ্ট্রের বড় পোশাক খুচরা বিক্রেতা গ্যাপ ইনকরপোরেটেডের প্রধান ব্র্যান্ড। ২০২৫ অর্থবছরে ওল্ড নেভির বিক্রি প্রায় ৮৭০ কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি। ডেনিম, সক্রিয় পোশাক এবং বিভিন্ন আয়স্তরের ক্রেতাদের জন্য মূল্যভিত্তিক পণ্যের ওপর ব্র্যান্ডটির জোর রয়েছে।
ওল্ড নেভির সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে। গ্যাপ ইনকরপোরেটেডের বিভিন্ন প্রকাশিত সরবরাহ তথ্য ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত নথিতে বাংলাদেশী কারখানার সঙ্গে ব্র্যান্ডটির উৎপাদন সংযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে বর্তমানে ওল্ড নেভির জন্য বাংলাদেশে সক্রিয় কারখানার নির্দিষ্ট সংখ্যা গ্যাপ ইনকরপোরেটেড প্রকাশ করছে না। কোম্পানির সাম্প্রতিক নীতিতে সরবরাহকারী কারখানাগুলোর নিয়মিত মূল্যায়ন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের মান নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
দুটি ব্র্যান্ডের সরবরাহ সংযোগ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতার একটি পরিবর্তনও সামনে আনে। একসময় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের প্রধান শক্তি ছিল বড় পরিমাণে মৌলিক পোশাক দ্রুত ও প্রতিযোগিতামূলক দামে উৎপাদন। এখন সেই সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেনিম, ফ্যাশনেবল বটম, বিভিন্ন ধরনের নিট ও ওভেন পোশাক, ওয়াশিং, প্রিন্টিং, এমব্রয়ডারি, ডিজাইন ও নমুনা তৈরির মতো সেবা।
এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের প্রত্যাশাও বদলেছে। সরবরাহকারীদের কাছ থেকে শুধু কম দাম ও বড় উৎপাদন সক্ষমতা নয়, মান, সময়ানুবর্তিতা, পরিবেশগত মানদণ্ড, শ্রমিক নিরাপত্তা ও পণ্যের বৈচিত্র্যও প্রত্যাশা করছে ব্র্যান্ডগুলো। আমেরিকান ঈগলের সরবরাহকারী মূল্যায়ন কাঠামোতেও কর্মপরিবেশ, শ্রম অধিকার, স্থানীয় আইন, পরিবেশ ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির গল্প এখন শুধু কত পিস পোশাক তৈরি হচ্ছে, সেই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একই উৎপাদন ভিত্তি কত ধরনের ক্রেতার চাহিদা পূরণ করতে পারছে, কতটা জটিল পণ্য তৈরি করতে পারছে এবং পোশাকের সঙ্গে কত বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আমেরিকান ঈগল ও ওল্ড নেভির মতো ভিন্ন অবস্থানের দুটি মার্কিন ব্র্যান্ডের সরবরাহ শৃঙ্খলে বাংলাদেশের উপস্থিতি তাই সেই পরিবর্তনেরই একটি প্রতিচ্ছবি। উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি প্রযুক্তি, দক্ষতা, মান ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণের সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মৌলিক পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরো বেশি মূল্য সংযোজনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।










