খামারে উৎপাদিত পণ্য থেকে ভোক্তার খাবারের টেবিল পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে থাইল্যান্ডের চারোয়েন পোকফান্ড বা সিপি গ্রুপ। বাংলাদেশেও দুই দশকের বেশি সময় ধরে সেই ব্যবসায়িক মডেলের বিস্তার ঘটিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফিড, পোলট্রি, মৎস্য, খামার ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, একে একে বিভিন্ন স্তরে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের বাজারে থাইল্যান্ডের একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক উপস্থিতি তৈরি করেছে সিপি।

সিপি বাংলাদেশের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডভিত্তিক সিপি গ্রুপ ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। পরের বছর সিপি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত হয়। শুরুতে সাভারে একটি ফিড মিল ও গাজীপুরের মৌচাকে একটি হ্যাচারি দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও পরে ব্যবসা ফিড থেকে খামার এবং সেখান থেকে খাদ্যপণ্যে বিস্তৃত হয়।

এ বিস্তারের বিশেষত্ব হলো সিপির বাংলাদেশ কার্যক্রম শুধু খাদ্যপণ্য বিক্রিতে সীমাবদ্ধ নয়। কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এর ব্যবসার তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো ফিড, ফার্ম ও ফুড। এর আওতায় রয়েছে ব্রিডার ফার্ম, হ্যাচারি, ব্রয়লার ও লেয়ার ফার্ম, চুক্তিভিত্তিক খামার, জলজ চাষ, পশু ও মাছের খাদ্য এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য। ফলে কৃষি উৎপাদনের উপকরণ থেকে শুরু করে ভোক্তার জন্য প্রস্তুত খাবার পর্যন্ত একটি সমন্বিত সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

খাদ্য ব্যবসায়ও বাংলাদেশে সিপির যাত্রা পুরনো। কোম্পানির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে দেশে সিপি ফুড ব্যবসা শুরু হয়। এর তিনটি প্রধান অংশ হলো সিপি ফাইভ স্টার, আধুনিক বিপণন চ্যানেলের জন্য হিমায়িত ও শীতল প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং তাজা মুরগি। ফাইভ স্টার ব্যবসার আওতায় বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শহর ও জেলায় প্রায় ৪৫০টি ব্র্যান্ডেড বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে।

অন্যদিকে সিপি বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদক ও খামারও যুক্ত। চুক্তিভিত্তিক খামার ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন ও সরবরাহের বিভিন্ন ধাপকে সমন্বয় করার এ মডেল সিপি গ্রুপের বৈশ্বিক ব্যবসারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিপি গ্রুপের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের কৃষি ও খাদ্য ব্যবসা পশুখাদ্য, পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত ও খাদ্য বিতরণকে একই মূল্য শৃঙ্খলের মধ্যে যুক্ত করে। বাংলাদেশকে এ আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের অন্যতম অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে গ্রুপটি।

বাংলাদেশে থাইল্যান্ডের এ উপস্থিতির সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কেরও যোগ রয়েছে। ঢাকায় থাই দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে থাই বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে খাদ্য ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত রয়েছে। বাংলাদেশকে আঞ্চলিক উৎপাদন ও বিতরণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও দূতাবাসের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে কৃষি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে থাইল্যান্ডের সক্ষমতার পেছনে খাদ্যনিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও অনুসরণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের সরকারি ট্রেড পোর্টালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, থাইল্যান্ড কৃষিপণ্য ও খাদ্যের মান নির্ধারণ, পরীক্ষা, প্রত্যয়ন এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।

সিপির বাংলাদেশ কার্যক্রম তাই শুধু থাইল্যান্ড থেকে খাদ্যপণ্য আনার গল্প নয়। ফিড ও কৃষি উপকরণ থেকে উৎপাদন, খামার থেকে প্রক্রিয়াজাত এবং সেখান থেকে বাজারে পৌঁছানো, একটি সমন্বিত ব্যবসায়িক কাঠামোর মধ্য দিয়ে দুই দেশের কৃষি ও খাদ্য অর্থনীতির সংযোগ তৈরি হয়েছে। ১৯৯৮ সালে যে বিনিয়োগের সূচনা, তা এখন বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে বিস্তৃত। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের এ ধারায় সিপি দেখাচ্ছে, থাইল্যান্ড-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু পণ্যের লেনদেন নয়, বরং উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহের মূল্য শৃঙ্খলেও গভীর হচ্ছে।