আফ্রিকা মানেই শুধু দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অনুন্নত অর্থনীতি নয়। ৫৪ দেশের মহাদেশটি প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ, কৃষি, জ্বালানি ও বিপুল ভোক্তা বাজারের এক বিশাল ভাণ্ডার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে আফ্রিকার এ সম্ভাবনা এখন আর অদেখা নয়। চীনসহ এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ দীর্ঘদিন ধরেই আফ্রিকার বাজার, সম্পদ ও অবকাঠামো খাতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করছে। সে সম্ভাবনার বাজারে বাংলাদেশও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরির চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্য বাড়লেও মোট বাণিজ্যের আকার এখনো সম্ভাবনার তুলনায় ছোট। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ আফ্রিকার দেশগুলোয় প্রায় ৪১০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় উন্নয়ন সম্প্রদায়ভুক্ত দেশগুলোয়ই গেছে প্রায় ১৫৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। এ অঞ্চলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজার দক্ষিণ আফ্রিকা। আফ্রিকায় বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, ওষুধ, চামড়া ও খাদ্যপণ্য।
তবে আফ্রিকাকে বাংলাদেশের জন্য কেবল তৈরি পোশাকের আরেকটি বাজার হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, হালকা প্রকৌশল, সিরামিক, আসবাবসহ বিভিন্ন খাতে নতুন সম্ভাবনা খোঁজা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোও আফ্রিকার বাজারকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, ‘আফ্রিকা হলো অপার সম্ভাবনা ও সম্পদে ভরা একটি মহাদেশ, যার সম্ভাবনাকে এখনো পুরো বিশ্ব সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। চীনসহ অন্যান্য দেশ আফ্রিকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে এবং বাংলাদেশও ধীরে ধীরে আফ্রিকায় প্রবেশ করা শুরু করেছে। আমাদের ওষুধ বা ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিগুলো আফ্রিকায় যাচ্ছে, কারখানা স্থাপন করছে এবং ইপিবি থেকেও ফার্মা মেলাগুলোয় অংশগ্রহণ করানো হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কোম্পানিগুলোও কিছু আফ্রিকান দেশে সেবা দিচ্ছে।’
বাংলাদেশের আফ্রিকা অভিমুখী বাণিজ্য উদ্যোগে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন গতি এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ-আফ্রিকা বিজনেস ফোরাম আলোচনা সভা আয়োজন করে ইপিবি। নতুন সীমান্তপারের ব্যবসার সুযোগ তৈরি, বাজার সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ ও আফ্রিকার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করাই ছিল এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
আফ্রিকার বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সম্ভাবনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অপেক্ষাকৃত কম দামে মানসম্পন্ন জেনেরিক ওষুধ উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা এরই মধ্যে বহু উন্নয়নশীল দেশের বাজারে জায়গা করে নিয়েছে। আফ্রিকার অনেক দেশ স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধের চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর জন্য এ বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। ইপিবির নিজস্ব প্রকাশনায়ও আফ্রিকার দেশগুলোয় বাংলাদেশী ওষুধ রফতানি সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরির উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে।
শুধু পণ্য নয়, সেবার বাজারেও আফ্রিকায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং ডিজিটাল সমাধান আফ্রিকার দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরিশাসের মতো তুলনামূলকভাবে উন্নত সেবাবাজারে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে। ইপিবির আফ্রিকা-বিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার সেবাকে সম্ভাবনাময় রফতানি খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য অবশ্য একমুখী নয়। বাংলাদেশ যেমন তৈরি পোশাক, পাটপণ্য, ওষুধ ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য রফতানি করছে, তেমনি আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসছে কৃষিপণ্য, খনিজ, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল রফতানির তুলনায় বহুগুণ বেশি। ফলে আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ শুধু রফতানি বাড়ানো নয়, বাণিজ্যের ভারসাম্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার নতুন সুযোগ তৈরি করাও।
এক্ষেত্রে মরক্কো বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটি ফসফেট ও সার উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলাদেশ কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় সার আমদানিতে মরক্কোর ওপর নির্ভর করছে। বিপরীতে মরক্কোর বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যসহ বাংলাদেশী পণ্যের বাজার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক শুধু বাংলাদেশী পণ্যের নতুন ক্রেতা খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দুই দেশের শিল্প ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে যুক্ত করার সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত বাজারগুলোর একটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের রফতানি ছিল প্রায় ১২৪ মিলিয়ন ডলার। পণ্য তালিকায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট, চামড়া, ওষুধ ও কৃষিপণ্য রয়েছে। তবে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখনো দক্ষিণ আফ্রিকা বা উত্তর আফ্রিকার কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার বড় বাজারগুলোও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নাইজেরিয়া, কেনিয়া, তানজানিয়া, ইথিওপিয়া, ঘানা, আলজেরিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশের বিপুল জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান ভোক্তা চাহিদা বাংলাদেশের পণ্য এবং সেবার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, খনিজ সম্পদ, তৈরি পোশাক ও ওষুধ খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।
আফ্রিকার বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে অবশ্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। দীর্ঘ ভৌগোলিক দূরত্ব, সরাসরি নৌযোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, বিভিন্ন দেশের আলাদা শুল্ক ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো, অর্থ পরিশোধের ঝুঁকি এবং বাজার সম্পর্কে বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের সীমিত ধারণা বড় বাধা। ফলে শুধু পণ্য পাঠালেই আফ্রিকার বাজারে স্থায়ী অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হবে না। স্থানীয় অংশীদার, সরবরাহ ব্যবস্থা, বিপণন নেটওয়ার্ক এবং প্রয়োজনে স্থানীয় উৎপাদনেও যেতে হবে।
সে পথেই ধীরে ধীরে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। ইপিবির সাম্প্রতিক উদ্যোগে আফ্রিকার বাজারকে একক কোনো দেশ হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন আঞ্চলিক বাজারের সমন্বিত সম্ভাবনা হিসেবে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্বাধীন দক্ষিণাঞ্চল, মিসর ও মরক্কোকেন্দ্রিক উত্তর আফ্রিকা এবং কেনিয়া-তানজানিয়া-ইথিওপিয়াকেন্দ্রিক পূর্ব আফ্রিকা প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা পণ্য ও বাজার কৌশলের প্রয়োজন রয়েছে।
আফ্রিকার ৫৪ দেশের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্য উপস্থিতি এখনো খুব ছোট। কিন্তু সেই ছোট উপস্থিতির মধ্যেই তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, পাট, খাদ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও অন্যান্য পণ্যের নতুন সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আর আফ্রিকা থেকে কৃষি, খনিজ ও শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ বাংলাদেশের শিল্পের জন্য তৈরি করছে আরেকটি সম্ভাবনার দরজা।
বাংলাদেশের সামনে তাই আফ্রিকা শুধু নতুন কোনো রফতানি গন্তব্য নয়। বরং এটি হতে পারে রফতানি বাজার বহুমুখীকরণ, শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রযুক্তি ও সেবা রফতানি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সম্প্রসারণের একটি নতুন ক্ষেত্র। সে বিশাল সম্ভাবনার বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আগ্রহ বাড়তে থাকায় আফ্রিকা বাংলাদেশের পরবর্তী বড় বাণিজ্যিক দিগন্ত হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।










