১৯৯৫ সালে যখন সিঙ্গাপুরে যাই, তখন দেশটির অর্থনীতি দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল। ৩১ বছরে সিঙ্গাপুরের আমূল পরিবর্তন যেমন চোখের সামনে দেখেছি, তেমনি বাংলাদেশকেও অনেক দূর এগোতে দেখেছি। সিঙ্গাপুরের বড় বড় ভবন, ব্যবসায়িক কেন্দ্র, বিশ্বের বিভিন্ন ব্যাংকের এশীয় প্রধান কার্যালয় এবং বহুজাতিক ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে পরিকল্পিতভাবে। কোথায় কী হবে, সেটি তারা পাঁচ-সাত বছর আগেই ঠিক করে ফেলে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন তাদের উন্নয়নের অন্যতম বড় শক্তি।

বাংলাদেশেরও পরিবর্তন কম হয়নি। রাস্তাঘাট, বিমানবন্দর, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে গত তিন দশকে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক সম্পর্কও বদলেছে। একসময় সিঙ্গাপুরের বাজারে বাংলাদেশী পণ্য খুব একটা দেখা যেত না। এখন প্রতিদিন তাজা সবজি যাচ্ছে। মুড়ি, চানাচুর, ডাল, চালসহ বিভিন্ন শুকনো খাবার যাচ্ছে। প্রাণ, স্কয়ারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের খাদ্যপণ্য এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্যও সিঙ্গাপুরের বাজারের উপযোগী করে পাঠানো হচ্ছে।

তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের জায়গায় আমাদের সম্ভাবনার তুলনায় অর্জন এখনো অনেক কম। বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর থেকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে, তার তুলনায় রফতানি অনেক কম। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে হলে আমাদের নির্দিষ্ট বাজার ও পণ্যের সম্ভাবনা চিহ্নিত করতে হবে। শুধু প্রচলিত পণ্য নিয়ে এগিয়ে গেলে হবে না। কোন পণ্যের চাহিদা কোথায়, সেটি চিহ্নিত করে দ্রুত বাজারে পৌঁছতে হবে।

সিঙ্গাপুরের একটি বড় উদাহরণ এখানে দেয়া যায়। দেশটি ভূমি পুনরুদ্ধারের কাজে বিপুল পরিমাণ বালি ব্যবহার করে এবং ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা ও মিয়ানমার থেকে বালি আমদানি করে। এখানেও বাংলাদেশের সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের নির্দিষ্ট বাজারের চাহিদা চিহ্নিত করে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। এফটিএ ও সরকার-টু-সরকার চুক্তির প্রয়োজন আছে। তবে শুধু সরকারি উদ্যোগ দিয়ে বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতকেই নতুন বাজার খুঁজে নিতে হবে।

দক্ষ জনশক্তিও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সিঙ্গাপুরে ওয়েল্ডার, পাইপ ফিটার, নির্মাণকর্মী ও বিভিন্ন ধরনের কারিগরি কর্মীর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশী কর্মীরা বিশ্বস্ত ও পরিশ্রমী। কিন্তু ভারত, থাইল্যান্ড ও চীনের কর্মীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে শুধু পরিশ্রমী হলেই হবে না, দক্ষও হতে হবে। একজন কর্মীকে সাধারণ ইংরেজি বুঝতে হবে, আচরণ ও যোগাযোগে দক্ষ হতে হবে এবং যে কাজের জন্য যাচ্ছেন, তার মৌলিক প্রশিক্ষণ বাংলাদেশ থেকেই নিতে হবে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার প্রতিষ্ঠার পর আমরা সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিদের বাংলাদেশে নিয়ে এসেছি। ২০১৪-১৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৪০-৪৫ জন বিনিয়োগকারী ও কোম্পানি মালিককে বাংলাদেশে নিয়ে এসে বিডা এবং বেজার সঙ্গে বৈঠক করেছি। ফলে সিঙ্গাপুরের অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নির্মাণ, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছে।

বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হলে ব্যবসার পরিবেশকে সহজ করতে হবে। আমরা সরকারকে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কথা বলেছি। বিদেশী বিনিয়োগকারীর সময় খুব মূল্যবান। কোনো কাজের জন্য যদি তাকে বারবার বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ কমে যায়। প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করা গেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি জায়গা হয়ে উঠতে পারে। আমাদের বড় বাজারও একটি শক্তি। এখানে বিপুলসংখ্যক ভোক্তা রয়েছে, যা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বড় সুযোগ।

আমরা যারা বেসরকারি খাতে কাজ করি, তাদের সবসময় সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশী উদ্যোক্তার সংখ্যাও বেড়েছে। ১৯৯৫ সালে মাত্র তিন-চারটি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, রেস্তোরাঁ ও ক্যাটারিংসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা কাজ করছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের খাবার সরবরাহ করছে। অর্থাৎ আমাদের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এখন সেটিকে আরো বড় পরিসরে কাজে লাগাতে হবে।