দেশে আমদানিনির্ভর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা প্রায় সাত হাজার মেগাওয়াট। যার বেশির ভাগ আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির। বিপুল এ সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সিংহভাগ জ্বালানির জোগান আসছে ইন্দোনেশিয়া থেকে। দেশে স্থাপিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করে বাংলাদেশ। দূরত্ব ও সাশ্রয়ী বিবেচনায় ইন্দোনেশিয়া এখনো বাংলাদেশের প্রধান কয়লা সরবরাহকারী দেশ। জ্বালানির আন্তজার্তিক বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, সমুদ্রপথে আমদানিনির্ভর তাপীয় কয়লার (থার্মাল কোল) জন্য বাংলাদেশ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে উঠে এসেছে। দেশটির কয়লা আমদানির প্রবৃদ্ধি চীন ও ভারতের মতো শীর্ষ আমদানিকারক দেশগুলোর তুলনায় দ্রুত বেড়েছে।
এশিয়া মার্কেট এনার্জি (এএমই) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ৬৪ লাখ টন তাপীয় কয়লা আমদানি করেছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ৮ শতাংশ। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক প্রান্তিকে কয়লা আমদানির সর্বোচ্চ পরিমাণ। ২০২৫ সালে দেশটির কয়লা আমদানি দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪ লাখ টনে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৩১ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশের কয়লা আমদানির প্রধান উৎস হিসেবে ইন্দোনেশিয়া তার অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে দেশটি থেকে বাংলাদেশ ১ কোটি ৮৩ লাখ টন কয়লা আমদানি করেছে। তবে এ উৎস থেকে আমদানি বৃদ্ধির হার ছিল তুলনামূলক কম, মাত্র ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। কারণ ক্রেতারা ধীরে ধীরে আমদানির উৎসে বৈচিত্র্য আনছেন। ২০২৬ সালেও বাংলাদেশের কয়লা আমদানি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। জানুয়ারিতে আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ টন, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির ১৪ লাখ টনের তুলনায় বেশি। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি ছিল ১৫ লাখ টন, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় অপরিবর্তিত।
ইন্দোনেশিয়া এখনো বাংলাদেশের প্রধান কয়লা সরবরাহকারী হলেও বিকল্প উৎস থেকেও আমদানি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা অন্যতম। ২০২৫ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশের তাপীয় কয়লা আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৬ শতাংশ বেড়ে পাঁচ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি বেড়েছে ১১ শতাংশ, মোট ১২ লাখ টনে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৭ হাজার ১৭৯ মেগাওয়াট। এটি দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াটের প্রায় ২৫ শতাংশ। শুধু ২০২৫ সালেই দেশে প্রায় ৫৩৯ মেগাওয়াট নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে।
দেশে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক সাতটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা ৭ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বাদে বাকি ছয়টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বছরে অন্তত ২০ মিলিয়ন টন কয়লা আমদানি করতে হয় বিপিডিবিকে। এ কয়লার স্থানীয় বাজারমূল্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে কয়লা আমদানির ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয় ১১৯ কোটি ১১ লাখ ডলারের। প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরলে বাংলাদেশী মুদ্রায় এ কয়লা আমদানি মূল্য ১৪ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর হিস্যা (আমদানিসহ) ২৮ শতাংশ। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় কয়লা উত্তোলন করে পূর্ণ সক্ষমতায় এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো গেলে আমদানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা কমবে।










