বাংলাদেশের সঙ্গে থাইল্যান্ডের একটি ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে, যা আমরা অনেক সময় উপেক্ষা করি। ৫০০ বছর আগে থেকে এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে থাইল্যান্ডের সংযোগ ও সম্পৃক্ততা ছিল। যেমন এখনো থাইল্যান্ডের চিয়াংমাইতে গেলে একটি বাংলা কমিউনিটি বা জনগোষ্ঠী পাওয়া যায়, যাদের পূর্বপুরুষেরা প্রায় ২০০ বছর আগে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম থেকে গিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেছিলেন। এভাবে আমাদের মধ্যে বহু বছরের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এ সাংস্কৃতিক বন্ধনের পাশাপাশি মিয়ানমার ও চট্টগ্রাম হয়ে স্থল ও সমুদ্রপথে বাণিজ্যিকভাবেও আমরা যুক্ত ছিলাম। বর্তমানে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
এ ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্যের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমরা থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করি এবং বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে রফতানি হয় প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড থেকে প্রধানত সিমেন্ট শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল, যেমন ক্লিংকার আমদানি করা হয়। এছাড়া বস্ত্র খাতের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বা কেমিক্যাল, প্রকৌশল খাতের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, ফলমূল এবং প্রক্রিয়াজাত করা মাছ আসে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে মূলত মিঠা পানির মাছ, জীবন্ত মাছ (যেমন কুঁচে বা বাইন), কিছু কাপড়, চশমা বা অপটিকস (যা টেলিস্কোপে বা গ্লাসে ব্যবহার হয়), তাঁবু ও ক্যাম্পিংয়ের সরঞ্জাম থাইল্যান্ডে রফতানি করা হয়।
ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে বাণিজ্যটি থাইল্যান্ডের পক্ষে ভারী, কিন্তু এখানে একটি বিষয় আমরা উপেক্ষা করি। থাইল্যান্ড থেকে যে ১ বিলিয়ন ডলার আমদানি করা হয়, তার ৮০ শতাংশই হলো শিল্পকারখানার কাঁচামাল। এ কাঁচামাল দিয়ে বাংলাদেশে মান সংযোজন করা হয়, যা স্থানীয় বাজারে ব্যবহার অথবা পুনরায় রফতানি করা হয়। আর থাইল্যান্ড আমাদের থেকে অপটিকস ও জীবন্ত মাছের মতো অপ্রচলিত পণ্য আমদানি করে। তাই প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য, কারণ আমরা মূলত উৎপাদনমুখী কাঁচামালই সেখান থেকে আনছি।
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষরের বিষয়ে এরই আগে সম্মতি বা প্রতিশ্রুতিপত্রে স্বাক্ষর করা হয়েছে। এফটিএ হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার, তবে দুর্ভাগ্যবশত এর অগ্রগতি কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। কেবল আমদানির পরিসংখ্যান দেখলে অনেকে মনে করেন এটি থাইল্যান্ডের অনুকূলে, কিন্তু এ আমদানীকৃত পণ্য স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে এবং দেশীয় শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নতুন রাজনৈতিক সরকার আসার পর আমাদের অনুরোধ থাকবে যেন সময়মতো এই এফটিএ বাস্তবায়ন করা হয়। এটি বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ অনেক সুবিধা পাবে। বিশেষ করে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের রফতানি বাজার উন্মুক্ত হবে, কারণ তখন আর বিদ্যমান শুল্ক বাধা থাকবে না।
এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, এফটিএ হলে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। কারণ থাইল্যান্ডে বিশেষ করে মোটরযান বা অটোমোবাইল খাতে জাপানের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। অন্যদিকে জাপানিরা বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্ক তৈরি করছে। আবার বাংলাদেশ সরকারও গাড়ি সংযোজনের জন্য জাতীয় অটোমোবাইল নীতি গ্রহণ করেছে। এফটিএ থাকলে থাইল্যান্ডের সঙ্গে বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খল তৈরি করা সম্ভব হবে। যেমন বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি বা টায়ার তৈরি হবে থাইল্যান্ডে, আর বাংলাদেশে গাড়ি অ্যাসেম্বলিং বা সংযোজন প্লান্ট স্থাপন করা যাবে। বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো যখন বাংলাদেশে কাজ শুরু করবে, তখন তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশী কোম্পানিগুলোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। পরবর্তী সময়ে জাপানিরাসহ অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও আসবে। থাইল্যান্ডে কর্মরত বিদ্যমান কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বাজার, ভারত, সেভেন সিস্টার্স এবং নেপাল মিলিয়ে এক বিশাল বাজার ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা উন্মোচন হবে।
বর্তমানে টেক্সটাইল কোম্পানিগুলো রাসায়নিক ও সিমেন্ট শিল্পগুলো ক্লিনকার আমদানি করে। আবুল খায়ের গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ছোট কোম্পানিগুলোও থাইল্যান্ড থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আনে। এফটিএ বাস্তবায়ন হলে বন্দর বা হারবার নির্মাণের জন্য যে পাথর লাগে (যা সাধারণত আমরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করি), তার জন্য থাইল্যান্ড একটি বড় ও নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে।
এটির ফলে আমাদের জ্বালানি খাত উন্মুক্ত হবে। এছাড়া সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির ক্ষেত্রে গভীর সমুদ্রে মৎস্য শিকারের জন্য থাইল্যান্ডে যে আধুনিক ও উন্নত শিল্প রয়েছে, তা বাংলাদেশেও নিয়ে আসা সম্ভব হবে। কিছু থাই প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বাংলাদেশে কাজ করছে। যেমন সিয়াম সিটি সিমেন্ট একটি স্থানীয় কোম্পানি কিনে ব্যবসা করছে, সিপি গ্রুপ পোলট্রি শিল্পে মাংসের প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মূল্য শৃঙ্খল তৈরি করেছে এবং ইটালিয়ান থাই ডেভেলপমেন্ট আমাদের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখছে। এফটিএ স্বাক্ষরিত হলে এ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে।
দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে এ মুহূর্তে প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এফটিএ চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষর করা। কারণ আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও প্রক্রিয়া ছাড়া বাকি সব বিষয়ই প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি থাইল্যান্ডে বর্তমানে শ্রমশক্তির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ড থেকে একটি প্রতিনিধি দল কর্মী নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশে এসেছিল, যা আমাদের শ্রমবাজারের জন্য একটি নতুন সম্ভাবনা। আর আসিয়ান জোনে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থাইল্যান্ড চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিটিসিসিআই) মূল দৃষ্টিভঙ্গি হলো, বাংলাদেশ হবে থাইল্যান্ডের জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশের প্রধান পথ, আর থাইল্যান্ড হবে বাংলাদেশের জন্য আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোয় প্রবেশের প্রধান পথ। এতে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছবে এবং আসিয়ানে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে বা প্লাস ওয়ান মর্যাদা পাওয়ার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ড প্রয়োজনীয় লবিং ও সহায়তা করতে পারবে।










