পণ্য আমদানি-রফতানির হিসাবের বাইরে একটি দেশের সঙ্গে আরেক দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো অর্থায়ন। ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংযোগ তৈরি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও এমন একটি সংযোগ তৈরি করছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডিবিএস ব্যাংক।

ডিবিএসের বাংলাদেশে কার্যক্রম নতুন নয়। ব্যাংকটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিনিধি কার্যালয় চালুর আগেই বাংলাদেশে বাণিজ্য অর্থায়ন, পরামর্শ এবং প্রকল্প বিনিয়োগের ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ করছিল প্রতিষ্ঠানটি। ২০২২ সালের নভেম্বরে ঢাকায় প্রতিনিধি কার্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দেয় ডিবিএস। পরের বছরের ২ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যালয়টির উদ্বোধন হয়। এর মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে ডিবিএসের কার্যক্রমের আওতায় থাকা বাজারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯টিতে।

ডিবিএস ঢাকা প্রতিনিধি অফিসের চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ তাহসিনা বানুর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নবীন রাষ্ট্র থেকে বৈশ্বিক ব্যবসা ও আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে সিঙ্গাপুরের বিকাশ দেশটির দৃঢ়তা, উন্মুক্ততা ও দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতার প্রতিফলন। একই মূল্যবোধ ১৯৬৮ সালে ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব সিঙ্গাপুর প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডিবিএসের পথচলাকেও পরিচালিত করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়তা করতে গিয়ে বাজার ও সম্ভাবনার মধ্যে সংযোগ তৈরির ঐতিহ্যকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

তাহসিনা বানু বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে ডিবিএস কাজ করে আসছে। ২০২৩ সালে ঢাকায় প্রতিনিধি কার্যালয় চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার এবং দেশের গ্রাহক ও অংশীজনদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি আরো সুদৃঢ় হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে, তখন ডিবিএস তার বিস্তৃত এশীয় নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং গভীর শিল্প খাতভিত্তিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের এ অগ্রযাত্রায় সহায়তা করছে।

ঢাকায় প্রতিনিধি কার্যালয় স্থাপনের সময় ডিবিএস জানিয়েছিল, বাংলাদেশে জ্বালানি, অবকাঠামো, পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। এসব খাতে বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও দেখছিল ব্যাংকটি। ফলে ডিবিএসের বাংলাদেশ উপস্থিতির লক্ষ্য কেবল প্রচলিত ব্যাংকিং সেবা নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিনিয়োগের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত।

সিঙ্গাপুর সরকারের দৃষ্টিতেও বাংলাদেশ বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশের অবকাঠামো, আতিথেয়তা, লজিস্টিকস ও খাদ্যসেবা খাতে দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে। ২০১৯ সালেই বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের মজুদ ১৯০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলারে পৌঁছেছিল।

দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর করার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও রয়েছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, লজিস্টিকস, বাণিজ্য সহজীকরণ ও মানদণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়ার কথা বলা হয়। ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুর সরকার বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও জনপরামর্শ শুরু করে, যেখানে পণ্য, সেবা, বিনিয়োগ ও সরকারি ক্রয়কে আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে রাখা হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে ডিবিএসের ঢাকায় উপস্থিতি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের একটি ভিন্ন মাত্রা তুলে ধরে। সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে শুধু পণ্য বা পুঁজি আসছে না, সেই পুঁজি ও ব্যবসাকে পরিচালনা, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার আর্থিক অবকাঠামোও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে। বাণিজ্য থেকে বিনিয়োগ, আর বিনিয়োগ থেকে আঞ্চলিক ব্যবসায়িক সংযোগ, বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়ে ডিবিএস সেই সেতুর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।