তখন আমাদের গার্মেন্ট শিল্পের অন্যতম একজন উদ্যোক্তা দেশ গার্মেন্টসের নুরুল কাদের সাহেব, যিনি ’৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং স্বাধীনতার পর একজন সরকারের সচিব ছিলেন। ’৭৪ বা ’৭৫ সালে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। তিনি বিভিন্ন রকম কাজকর্ম করতেন। আমরা যতটুকু মনে পড়ে বা জানি যে, তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে একসঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সূত্রে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। তিনি বিমানবন্দর উন্নয়নে যুক্ত হন। বিমানবন্দর নির্মাণে তার মালিকানাধীন কনস্ট্রাকশন ফার্ম সম্পৃক্ত ছিল।
ওই সময় একটা পর্যায়ে কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানি বাংলাদেশে আসে। তখন কোরিয়ার রফতানিতে নানা রকমের ডিউটি ও কোটা ইম্পোজ হচ্ছিল। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল বাংলাদেশে গার্মেন্টস সেক্টরকে ডেভেলপ করে এখানকার মাধ্যমে তারা রফতানি করবে, তাহলে সেই ডিউটি এবং কোটা তাদের লাগবে না। এ সূত্র ধরেই বাংলাদেশে তারা আসে।
বাংলাদেশে যখন আসে, তখন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নুরুল কাদের সাহেবকে বললেন যে, এ রকম একটা সুযোগ আছে, আপনি জয়েন্ট ভেঞ্চারে এখানে গার্মেন্টস তৈরি করেন। তখন যেই কথা সেই কাজ। জিয়াউর রহমানই দাইয়ুর সঙ্গে নুরুল কাদের সাহেবের পরিচয় করিয়ে দেন। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে দাইয়ু চট্টগ্রামের কালুরঘাটে দেশ গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠা করে।
সেই কারখানার ১৩০ জনকে কোরিয়াতে দাইয়ু কোম্পানি তাদের কারখানায় প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠায়। এটা ১৯৮০ সালের দিকের ঘটনা। ১৩০ জনকে দাইয়ু কোম্পানি কোরিয়াতে তাদের ফ্যাক্টরিতে প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠায় এবং সেখানে যৌথ উদ্যোগে কারখানা চালু হয় এবং এখানে গার্মেন্টস উৎপাদন শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে এই ১৩০ জনের প্রত্যেকে বাংলাদেশে গার্মেন্টসের পুরোধা হয়েছেন, ভিন্ন গার্মেন্টস শিল্প গড়ে তুলেছেন। তাদের মধ্যে থেকেই অবনী নিটওয়্যার থেকে শুরু করে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে আমাদের মরহুম মেয়র আনিসুল হকসহ আরো অনেকে আছেন, যারা সেই দেশ গার্মেন্টস থেকে কর্মজীবন শুরু করেন। এই হলো গার্মেন্টসের প্রাথমিক যাত্রার শুরু।
যখন যাত্রা শুরু হলো তখন আমাদের তো কিছুই নেই, সবই তো বিদেশ থেকে আনতে হতো। বিদেশ থেকে আনবে কীভাবে? তখন এটা নিয়ে নুরুল কাদের সাহেব বসলেন কাস্টমসের সঙ্গে। যেহেতু উনি একজন সরকারের আমলা ছিলেন, তিনি কাস্টমসের সঙ্গে কথা বলে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে বিদেশ থেকে আমাদেরকে এভাবে এই জিনিস ডিউটি ফ্রি এনে দিতে হবে। আনলে আমরা আবার এটাকে গার্মেন্টস বানিয়ে বিদেশে রফতানি করব। তাতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে।
এরপর দেশ গার্মেন্টসের ফ্যাক্টরির পাশেই বন্ডেড ওয়্যারহাউজ হিসেবে একটি গোডাউন ভাড়া নিল। ভাড়া নিয়ে ওটার মধ্যে বিদেশ থেকে আমদানি করা কাপড়-চোপড় ও অ্যাকসেসরিজ রাখা হতো। বন্দর থেকে খালাস করে কাস্টমসের কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ওই গোডাউনে রাখা হতো। প্রতিদিন সকালে কাস্টমসের কর্মকর্তা সেখানে এসে ওই দিনের উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য গোডাউন খুলে কাপড় ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক অ্যাকসেসরিজ বের করে দিত। দিনশেষে আবার ওটা তালা দিয়ে কাস্টমস কর্মকর্তা চলে যেতেন। এভাবে শুরু হয় এবং চলতে থাকল।
পরবর্তী সময়ে ওই ফ্যাক্টরির ভেতরেই বন্ডেড ওয়্যারহাউজের প্রচলন ঘটে, যা পরিবর্তন হতে হতে বর্তমানে বিশেষ বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সিস্টেমে পরিণত হয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশে গার্মেন্টস সেক্টর বিশাল প্রসার লাভ করে।
কাঁচামাল গুদামজাতের ব্যবস্থা হলো। কিন্তু আনার অর্থাৎ আমদানির টাকা বা ডলার তো নেই। তখন তিনি আবারো সরকারের কাছে গেলেন। প্রথম যখন বিদেশে এলসি করবে এলসির ডলার পাবে কোথায়? তখন টিসিবির সঙ্গে আলোচনা করে টিসিবি থেকে কিছু ডলার নিয়ে উনি এলসি করলেন। কিন্তু এভাবে আর কত টিসিবির ডলার দেবে?
তখন তিনি একটা পন্থা উদ্ভাবন করলেন। তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নুরুল ইসলামের সঙ্গে তিনি বসলেন। ইসলাম সাহেবও নুরুল কাদের সাহেবের সহকর্মী ছিলেন। নুরুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে বসে এ পদ্ধতি চালু করেন যে ব্যাংকের কাছে এলসিটা (মাস্টার এলসি) মর্টগেজ রেখে ওইটার ৭৫ শতাংশ ব্যাক টু ব্যাক করা হবে। কোনো ধরনের টাকা-পয়সা ছাড়া ব্যাক টু ব্যাক করে বিদেশ থেকে কাঁচামাল ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক দ্রব্যাদি আনবেন।
এনে রফতানি করলে পরে ওই ১০০ ডলারের রফতানি থেকে ৭৫ ডলার ব্যাংক পুরোটাই রাখবে এবং বিদেশে যেখান থেকে মাল আনা হয়েছে সেখানে ব্যাংক পেমেন্ট করে দেবে। আর বাকি ২৫ ডলার ব্যাংকের কাছে শতকরা ২৫ ডলার হিসেবে রিজার্ভে ঢুকে যাবে এবং সেটার বিপরীতে তাকে স্থানীয় খরচ মেটানোর জন্য টাকা দিয়ে দেয়া হবে। এভাবেই ব্যাক টু ব্যাক এলসির প্রচলন ঘটল এবং কোনো ধরনের টাকা-পয়সা ছাড়াই এই ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিশাল সুযোগ পেয়ে গার্মেন্টস সেক্টরের প্রসার খুব দ্রুত লাভ করল।
এই দাইয়ু কোম্পানি তখন ইউরোপের মার্কেটে তৈরি পোশাক রফতানি শুরু করল। ইউরোপ মার্কেট, তারপর আমেরিকার মার্কেটে রফতানি শুরু হলো ওই দাইয়ু কোম্পানির মাধ্যমে। এভাবে দেশ গার্মেন্টসের পর পরই আরো কিছু প্রতিষ্ঠান তখন গার্মেন্টস শুরু করল। রিয়াজ গার্মেন্টস আগেই ছিল, তারা ভারতে এবং অন্যান্য জায়গায় কিছু রফতানি করত মাঝে মাঝে। কিন্তু ইউরোপে মূলত শুরু হয় তখন।
এরপর আশির দশকের মাঝামাঝির পরে ’৮৭-’৮৮ সালে নিট পোশাকের কিছু এক্সপোর্ট শুরু হলো। নিট পোশাক রফতানির শুরুটাও ইন্টারেস্টিং। এখানে যারা কাস্টমার, তারা আসত নারায়ণগঞ্জে। নারায়ণগঞ্জে হলো হোসিয়ারি শিল্প। ওখানে একজন ইন্ডিয়ান অরিজিন ব্রিটিশ এসেছিলেন বাংলাদেশে বেড়াতে। কথা প্রসঙ্গে হঠাৎ একদিন আমাদের এখানে এনআর গ্রুপের মুখলেসুর রহমান ভাই, তার সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক। তো সে বলতেছিল যে তোমরা তো এ রকম টি-শার্ট বানাতে সক্ষম। তোমরা হোসিয়ারি টি-শার্ট বানিয়ে এখান থেকে রফতানি করতে পারো।
তখন ওরা একটা স্যাম্পল বা নমুনা দিয়ে বলল এ রকম স্যাম্পল বানিয়ে আমাদের পাঠাও। তখন মুখলেসুর ভাই স্যাম্পল বানিয়ে পাঠাল। পাঠানোর পর এটা অ্যাকসেপ্ট হলো। অ্যাকসেপ্ট হওয়ার পর হঠাৎ নারায়ণগঞ্জে এক এজিএম সাহেব একটা কাগজ নিয়ে এল। আপনার নামে তো একটা এলসি এসেছে, ইউকে থেকে। তখন তার মনে পড়ল স্যাম্পল দেয়া হয়েছিল। এভাবে তখন একটা অর্ডার এল।
তখন চারটা মেশিন, একটা রুমের মধ্যে চারটা ওভারলক মেশিন, একটা চেইন মেশিন, একটা লক মেশিন, এই চার-পাঁচটা মেশিন দিয়া এ অর্ডারটা। নয়ামাটি থেকে সুতা কিনে কাপড় নিটিং করল। নিটিং করে ডায়িং করল বেঙ্গল ডায়িংয়ে। এর পর গার্মেন্টস বা গেঞ্জি বানিয়ে রফতানি শুরু করল। এ রকমভাবে তখন রফতানি শুরু হয় নারায়ণগঞ্জ থেকে।
নিট পোশাকের বাজার বরাবরই ইউরোপেরটা বেটার ছিল। আমাদের মোট নিট পোশাক রফতানি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই যায় ইউরোপে। বাজারটি এরই মধ্যে অনেক বিকশিত হয়েছে। রফতানি আরো বাড়াতে হলে আমাদের দুটো কাজ করতে হবে। প্রথম কাজ হলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের এফটিএ করা, যেটা ইন্ডিয়া ও ভিয়েতনাম করে ফেলেছে। এটা আমাদের খুব দ্রুত এগোনো দরকার।
নাম্বার দুই হলো আমাদেরকে পণ্যে বৈচিত্র্যকরণ। ম্যান মেইড ফাইবারের, মানে হাই ভ্যালুড আইটেমে যাওয়া প্রয়োজন। কারণ ইউরোপে এখন এগুলোর ডিমান্ড অনেক বেশি। নরমাল বেসিক টি-শার্টের চেয়ে এ হাই ভ্যালুর আইটেমের চাহিদা বাড়ছে। ভ্যালু অ্যাডেড প্রডাক্ট আমাদের দিতে হবে। না দিতে পারলে আমাদের পণ্য পিছিয়ে যাবে।
ইউরোপের মার্কেটটাকে শক্তিশালী করার জন্য আমাদের দুটোই মেইন। একটা হচ্ছে এফটিএ করা, আরেকটা হচ্ছে যে ম্যান মেইড ফাইবার এবং ডাইভার্সিফায়েড প্রডাক্ট, ফ্যাশনেবল প্রডাক্ট এগুলোতে আমাদের যাওয়া এবং বাংলাদেশে যত দ্রুত সম্ভব ডিজাইন হাউজ তৈরি করা।
আগে কোনো কমপ্লায়েন্সের ইস্যু ছিল না, আস্তে আস্তে এগুলো কমপ্লায়েন্সের বিষয় এল। বর্তমানে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্টস সেক্টর কমপ্লায়েন্স এবং গ্রিন ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে অন্যতম শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে।
বাংলাদেশের এ আধুনিক গার্মেন্টস ব্যবস্থা প্রচলনে এবং এর বিকাশে মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং নুরুল কাদের সাহেবের অবদান রয়েছে অনেক বিশাল।









