এ দুই পক্ষই বর্তমান অংশীদারত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি (পার্টনারশিপ অ্যান্ড কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট-পিসিএ) করার জন্য জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি গড়ে তোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বহুমুখী। বর্তমানে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে আমাদের মনোযোগ বেশি হওয়া জরুরি।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে রফতানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক। সমস্যা হলো সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপে আমাদের দেশের তৈরি পোশাকের বাজার ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। বিগত দুই বছরে আগের বছরগুলোর তুলনায় এ খাতে রফতানি আয় অনেকটাই কমেছে। বিশেষ করে ১৫টি দেশ, যারা এতদিন ধরে বড় ক্রেতা ছিল, তাদের দিক থেকে চাহিদা আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ৬০৯ কোটি ইউরোর তৈরি পোশাক রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭৫৫ কোটি ইউরো। কিছু দেশে অবশ্য রফতানি বাড়লেও সেগুলোর বাজার বেশ ছোট, যা মোট রফতানি ঘাটতিকে পূরণ করে না। একক দেশ হিসেবে জার্মানি ছিল এই তৈরি পোশাকের বড় ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্রের পরই জার্মানি থেকে এ খাতে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ হতো। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জার্মানি থেকে রফতানি আয় ৪৯৫ কোটি ডলার থেকে কমে ৪৩৮ কোটি ডলারে নেমেছে। এটা দুশ্চিন্তার বিষয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পোশাক রফতানি কমার জন্য যে কারণগুলোকে দায়ী করা হচ্ছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অপরাপর উদীয়মান দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। তৈরি পোশাক রফতানির দিক থেকে চীন বরাবরই শীর্ষ অবস্থানে ছিল। তারা বাজারে নিজ অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি রফতানি আয় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। যদিও সার্বিক বিবেচনায় ইউরোপে আগের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা কমেছে, চীনসহ কয়েকটি দেশ প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ইউরোপের বাজার সংকুচিত হওয়ার কারণে ভারত কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা বাংলাদেশের তুলনায় কম। এদিকে ভিয়েতনামও আগের অবস্থান ধরে রাখতে সফল।

২০২১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে পাঁচ বছরের একটি ট্রানজিশন (রূপান্তর) সময়কাল, অর্থাৎ ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই সময়কে প্রস্তুতিমূলক সময় হিসেবে অনুমোদন করা হয়েছে। এ বছর এ সময় উত্তীর্ণ হবে। ফলে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বের যেসব দেশে অগ্রাধিকারমূলক শুল্কমুক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা পেত, তা আর পাবে না। ইউরোপ অনেকটা মানবিক কারণে এ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আরো অতিরিক্ত তিন বছর সময় মঞ্জুর করেছে। এ সময়ের মধ্যে তাদের এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) কর্মসূচির আওতায় ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুবিধা পেতে থাকবে বাংলাদেশ। কিন্তু আধুনিক বিশ্ব বাণিজ্যের হিসেবে এটা শুধু প্রস্তুতিকাল।

নিঃসন্দেহে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ যেকোনো দেশের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক প্রাপ্তি। এর মধ্য দিয়ে একটি দেশের আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ সুবিধা ছাড়া নিজেদের পণ্যের মানোন্নয়নের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে স্বীকৃতি দেয়া ছাড়াও বাণিজ্য ও বিনিয়োগে অপরাপর দেশগুলোর একধরনের আস্থার প্রতিফলন ঘটে। এ বিবেচনায় কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও বাংলাদেশের আগামীর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনীতিকে একই সূত্রে গাথার এটি একটি বড় সুযোগ বটে। দেশের ভেতর আরো বড় অর্থনৈতিক বিনিয়োগে এবং বেশি অংকের বিনিয়োগ প্রাপ্তির একধরনের নিশ্চয়তাও এর মধ্যে। তবে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের এ প্রাপ্তি যেন আমাদের জন্য কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি করে ফেলেছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে গত দুই বছরে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে অনেক অর্থ অবৈধ পথে দেশের বাইরে চলে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে তারল্য সংকট, সেই সঙ্গে বিদ্যমান অনেক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক আকারে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ কমে গেছে। এসব কিছু ইউরোপসহ বহির্বিশ্বে আমাদের বাণিজ্যে প্রভাব সৃষ্টি করে থাকতে পারে।

একই সঙ্গে এও বলা সংগত হবে যে বিশ্ব অর্থনীতি আগের অবস্থায় নেই। কয়েক বছর ধরে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ঘনীভূত সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। ফলে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিই এক বড় ধরনের ধাক্কার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চীন ও ভারতের মতো দেশের রয়েছে বিশাল বাজার, যার মধ্য দিয়ে তারা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে যতটা দরকষাকষির সামর্থ্য রাখে, সেই সুযোগটা আমাদের

জন্য সীমিত। তবে একই সঙ্গে আমাদের জন্য এটাও সত্য যে তৈরি পোশাক শিল্পে বর্তমানে যে সংকট চলছে এটিতে বিশেষ নজর দেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। ভিয়েতনামের মতো দেশ, যারা পোশাক রফতানির দিক দিয়ে আমাদের চেয়ে পিছিয়ে ছিল, এ খাতে নিজেদের সামর্থ্য ধরে রাখার পাশাপাশি তাদের সরকারও বিষয়টি নিয়ে বিশেষ যত্নশীল। সেই সঙ্গে কম্বোডিয়ার পোশাক খাতের কমপ্লায়েন্সের বিষয়টি বিবেচনা করলে, তারা এই দিক দিয়ে যথেষ্ট সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে। আমাদের কমপ্লায়েন্সের পাশাপাশি এক্ষেত্রে ত্রিপক্ষীয় (ক্রেতা-সরকার ও শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে) একটি শক্তিশালী যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। সরকারের দিক থেকে অর্থনীতির স্বার্থে ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে রাখাটাও বিবেচনায় নিতে হবে, কেননা দিনশেষে এর মধ্য দিয়ে কর্মহীন হচ্ছে শ্রমিক এবং দেশ হারাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ রফতানি আয়।

পরিস্থিতির উন্নয়ন না ঘটলে বর্তমানে ইউরোপ থেকে ক্রমাবনতিশীল রফতানি আয়ের সঙ্গে ২০২৯ সালের পর বাংলাদেশ ইউরোপের বাজার থেকে ইবিএ সুবিধা হারালে অর্থনীতি আরো জটিল আকার ধারণ করবে। এ ধারা চলতে থাকলে ধারণা করা যায়, প্রতি বছর বাংলাদেশ আরো ৮০০ কোটি ডলার রফতানি আয় হারাবে, যা ভয়ংকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। পরিস্থিতির উত্তরণে এবং বাড়তি সুবিধা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশের একমাত্র উপায় হচ্ছে ইউরোপে জিএসপি (জেনারাইলজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস) প্লাস সুবিধার জন্য আবেদন করা। এটি রফতানি আয়কে সুরক্ষা দিলেও এর প্রাপ্তি নির্ভর করছে দেশের ভেতর শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন ও মানবাধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ২৭টি মূল কনভেনশন অনুসমর্থন এবং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। সুতরাং এক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারের দিক থেকে আইনি বিধিবাধান এবং সুরক্ষাগুলো নিশ্চিতকল্পে প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখতে হবে।

আমাদের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো মাত্র একটি খাতের ওপর নির্ভর করে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়তে চাচ্ছি। এমনটা মোটেও ঠিক নয়। ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বাইরে এতদিন ধরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো হিমায়িত চিংড়ি। বর্তমানে তৈরি পোশাকের ক্রেতা কমে যাওয়ার ফলে আমাদের অন্যান্য রফতানি পণ্যের সক্ষমতাগুলো আরো বাড়িয়ে সেগুলোর গন্তব্যকে ইউরোপ ও এর বাইরের দেশগুলোতে পাঠানোর বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। ইইউভুক্ত যেসব দেশে আমাদের তৈরি পোশাকের চাহিদা আগে থেকেই কম ছিল, সেখানে কিন্তু আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালসগুলো কর্তৃক তৈরি ওষুধের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে বলা জানা যায়। এ সম্ভাবনাময় খাতটিকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিলে আমাদের জন্য ভালো ফল আসতে পারে। তাছাড়া চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশে যে পরিমাণ চামড়া প্রক্রিয়ার অভাবে প্রতি বছর নষ্ট হয়, তা বেশ উদ্বেগজনক। এ শিল্পের মানোন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অনেক উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য সীমিত পরিসরে হলেও রফতানির চেষ্টা করা যায়। সেই সঙ্গে আমাদের মৌসুমি ফল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে আম এবং কাঁঠাল, এগুলো রফতানিতে সরকারের বিশেষ মনোযোগী হওয়া দরকার। আমাদের বাজারে অনেক বিদেশী ফল বিক্রি হলেও গুণে-মানে আমাদের অনেক দেশীয় ফল বৈদেশিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা রাখে। এই খাতটি থেকে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

গত শতাব্দীর শেষদিকে তৈরি পোশাক খাতটি একপর্যায়ে আমাদের অর্থনীতির প্রধান প্রাণসঞ্চারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। আমাদের মনে রাখা দরকার যে সময় যেমন পরিবর্তনশীল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদা, রুচি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এসব বিবেচনায় কেবল দুএকটি খাতের ওপর নির্ভরতা থেকে বের হয়ে আমাদের সম্ভাবনাময় অপরাপর খাতকে পরিচর্যা করে সেগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্ষম করে আমাদের এলডিসি থেকে উত্তরণ পরবর্তী বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো দরকার। একবার আমরা যখন পুরোপুরি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সব আন্তর্জাতিক বাজার থেকে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাতে থাকব, আমাদের মনে রাখতে হবে যে পেছনে ফিরে যাওয়ার আর পথ অবশিষ্ট থাকবে না। বর্তমানে একক দেশ হিসেবে মার্কিন বাজারে এখনো আমাদের পণ্য রফতানি সবচেয়ে বেশি হচ্ছে কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক আরোপিত শুল্কের গ্যাঁড়াকলে আমরা কতদিন নিজেদের মানিয়ে নিতে পারব, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। সুতরাং অন্যত্র নতুন বাজার খুঁজে বের করা যেমন জরুরি, ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও আমাদের বাণিজ্যের আরো বিকল্প খাত অন্বেষণ করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ড. ফরিদুল আলম: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়