এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যের আমদানি ছিল ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন পাউন্ড। তবে বাংলাদেশের রফতানি এখনো প্রধানত তৈরি পোশাককেন্দ্রিক। তাই পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত পণ্য ও সেবা রফতানি বহুমুখীকরণ, দেশে উৎপাদন ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যের সঙ্গে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরকে আরো কার্যকরভাবে যুক্ত করা।
আমার মতে, এ বাণিজ্য বহুমুখীকরণে এফএমসিজি খাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এ খাতের সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন, কাঁচামাল ও প্যাকেজিং সরবরাহকারী, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং বিস্তৃত বিতরণ ব্যবস্থা যুক্ত। ইউনিলিভারের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক মান, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের মাধ্যমে এফএমসিজি খাতের স্থানীয় সরবরাহকারী ও উৎপাদন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশে স্থানীয় উৎপাদন ও দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। ইউনিলিভার বাংলাদেশে আমরা বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন, সরবরাহকারী উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করছি। বর্তমানে আমাদের ৯৬ শতাংশের বেশি পণ্য বাংলাদেশেই উৎপাদন হয়।
এলডিসি উত্তরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করবে, যেখানে বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা করতে হবে উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, গুণগত মান, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের ভিত্তিতে।
যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এলডিসি থেকে উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের বাজার সুবিধা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে না। ২০২৬ সালে উত্তরণ হলে যুক্তরাজ্যের ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমে বাংলাদেশ ২০২৯ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সুবিধা পাবে। এরপর এনহ্যান্সড প্রেফারেন্সেসে ৯২ শতাংশ পণ্যশ্রেণীতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক কোম্পানির জন্য এ উত্তরণ একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাজার ও তরুণ জনগোষ্ঠী এক্ষেত্রে বড় শক্তি। একই সঙ্গে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা, আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ব্যয়, জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামো, কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, করনীতির পরিবর্তন এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে বিশ্বমানের উৎপাদন সম্ভব এবং ইউনিলিভারের কার্যক্রম তার উদাহরণ। তবে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হতে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। স্থানীয় কারখানা ও সরবরাহকারীদের গুণগত মান, প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়, সময়মতো সরবরাহ, ট্রেসেবিলিটি এবং পরিবেশগত ও সামাজিক মান নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে কাঁচামাল, প্যাকেজিং, প্রকৌশল, পরিবহন ও ডিজিটাল সেবা সরবরাহকারীদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কারিগরি সহায়তা ও যৌথ উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভূমিকা রাখতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করা, বন্দর ও কাস্টমসের দক্ষতা বাড়ানো এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ শুধু তৈরি পণ্য রফতানিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্যাকেজিং ডিজাইন, সফটওয়্যার, তথ্য বিশ্লেষণ, গবেষণা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মতো সেবাতেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। যেখানে গুণগত মান, ব্যয় ও নির্ভরযোগ্যতায় প্রতিযোগিতা করা সম্ভব, সেখানে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এজন্য সরকার, বহুজাতিক কোম্পানি, স্থানীয় উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আমি তিনটি ক্ষেত্রে বিশেষ সম্ভাবনা দেখি। প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও টেকসই প্যাকেজিংসহ সবুজ শিল্পায়ন। দ্বিতীয়ত, সফটওয়্যার, ফিনটেক, ডিজিটাল পেমেন্ট ও অন্যান্য জ্ঞানভিত্তিক সেবা। তৃতীয়ত, ওষুধ, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, উন্নত উৎপাদন, লজিস্টিকস, উচ্চ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন।
এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যবসায়িক পরিবেশে পূর্বানুমানযোগ্যতা জরুরি। তিন থেকে পাঁচ বছরের একটি সুস্পষ্ট কর ও শুল্ক রোডম্যাপ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সহায়তা করবে। একই সঙ্গে ব্যবসা নিবন্ধন, লাইসেন্স, কাস্টমস, কর নিরীক্ষা ও বৈধ অর্থ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া ডিজিটাল, স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করতে হবে। নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ বন্দর ও লজিস্টিকস এবং কাঁচামাল ও প্রযুক্তি আমদানির যৌক্তিক শুল্ক কাঠামোও প্রয়োজন। এজন্য সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে নিয়মিত ও তথ্যভিত্তিক সংলাপ জোরদার করতে হবে।









