চার দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পোশাক সংগ্রহ করছে সুইডেনভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠান। ১৯৮২ সালে প্রথম বাংলাদেশী সরবরাহকারীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনের পর ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এইচঅ্যান্ডএমের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন বাজারে পরিণত হয়েছে। কোম্পানির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের সরাসরি সরবরাহকারী ১২৮টি কারখানায় কাজ করছেন ৪ লাখ ৬১ হাজার ২২৭ শ্রমিক।
বাংলাদেশের সঙ্গে এইচঅ্যান্ডএমের সম্পর্ক এখন শুধু পোশাক কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, উচ্চ মূল্যের পোশাক ও ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পণ্য, কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎপাদন ব্যবস্থার মতো বিষয়ও ধীরে ধীরে এ সম্পর্কের অংশ হয়ে উঠছে। ফলে চার দশকের সরবরাহ সম্পর্ক এখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পরবর্তী রূপান্তরের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।
চার দশকের সরবরাহ সম্পর্ক: এইচঅ্যান্ডএমের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে বাংলাদেশী সরবরাহকারীর কাছ থেকে প্রথম পণ্য সংগ্রহের পর দেশটি তাদের সবচেয়ে বড় উৎপাদন বাজারগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন ও বাংলাদেশ তাদের পোশাক উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বাজার। কোম্পানিটি নিজস্ব কোনো কারখানার মালিক নয়; স্বাধীন উৎপাদনকারীদের মাধ্যমে পোশাক তৈরি করে। বৈশ্বিকভাবে ৫৫৪টির বেশি বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহকারী ৯৬৯টির বেশি প্রথম স্তরের কারখানায় এইচঅ্যান্ডএমের ব্র্যান্ডগুলোর পণ্য তৈরি করে।
সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এইচঅ্যান্ডএমের হিসাবে, তাদের সরবরাহকারীদের সঙ্গে গড় ব্যবসায়িক সম্পর্কের মেয়াদ প্রায় নয় বছর। আবার কিছু সরবরাহকারীর সঙ্গে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে সরবরাহকারী তালিকা প্রকাশ করছে কোম্পানিটি এবং বর্তমানে বিক্রি হওয়া পণ্যের প্রায় ৯৯ শতাংশের উৎপাদনকারী কারখানার তথ্য প্রকাশ করা হয়। তালিকাটি প্রতি তিন মাসে হালনাগাদ করা হয়।
বাংলাদেশে এ দীর্ঘ সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও গড়ে উঠেছে বহু আগেই। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেলেনা হেলমারসন জানান, ঢাকার উৎপাদন কার্যালয়ে স্থানীয় দলের সদস্য ছিলেন প্রায় ৫০০ জন। স্থানীয় সরবরাহকারী ও অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে ওই কার্যালয় কাজ করে বলেও জানায় কোম্পানিটি।
সুইডেন দূতাবাসের ২০২৪-২৫ সালের বাংলাদেশ ব্যবসা নির্দেশিকাতেও এইচঅ্যান্ডএমকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ক্রেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কোম্পানিটি ২০০টির বেশি কারখানা থেকে পোশাক সংগ্রহ করে। গাইডে ঢাকায় এইচঅ্যান্ডএমের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম এবং বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ কর্মীর তথ্য দেয়া হয়েছে।
সংখ্যার পার্থক্যটি সংজ্ঞাগত। সুইডেন দূতাবাসের গাইডে ২০০টির বেশি কারখানার কথা বলা হলেও এইচঅ্যান্ডএমের মার্চ ২০২৬-এর সর্বশেষ শ্রমিক ও মজুরি তথ্য সরাসরি সরবরাহকারী প্রথম স্তরের কারখানার ভিত্তিতে তৈরি। সেই হিসাবে বাংলাদেশে সরাসরি সরবরাহকারী কারখানা ১২৮টি।
৪ লাখ ৬১ হাজার শ্রমিকের উৎপাদন ভিত্তি: এইচঅ্যান্ডএমের সর্বশেষ তথ্য বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ব্যাপ্তির একটি নতুন চিত্র দিচ্ছে। মার্চ ২০২৬-এ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তাদের সরাসরি সরবরাহকারী কারখানায় কর্মরত ৪ লাখ ৬১ হাজার ২২৭ জন শ্রমিকের ৫১ শতাংশ নারী। এসব কারখানার ৮১ শতাংশ শ্রমিক স্থায়ী এবং ৯০ শতাংশ পূর্ণকালীন। ৭১ শতাংশ কারখানায় শ্রমিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রয়েছে এবং ২০ শতাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে।
এ পরিসংখ্যান শুধু বাংলাদেশে এইচঅ্যান্ডএমের সরবরাহ ব্যবস্থার আকারই তুলে ধরে না, ব্র্যান্ডটির বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের শ্রমশক্তির গুরুত্বও বোঝায়।
শুধু পরিমাণ নয়, পণ্যের ধরনেও পরিবর্তন: দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির বড় অংশ তুলাভিত্তিক মৌলিক পণ্যে কেন্দ্রীভূত। কিন্তু বৈশ্বিক ফ্যাশন বাজারে ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাক, খেলাধুলার পোশাক, বাইরের পোশাকসহ উচ্চ মূল্যের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পও তাই পণ্য বৈচিত্র্যের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
এ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে এইচঅ্যান্ডএমের সঙ্গে শিল্পের আলোচনাতেও। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বিজিএমইএ ও এইচঅ্যান্ডএমের বৈঠকে বাংলাদেশের উচ্চমূল্যের পোশাক ও ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পণ্য থেকে আরো বেশি সরবরাহ নেয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বাংলাদেশী সরবরাহকারীদের সঙ্গে অংশীদারত্ব শক্তিশালী করে উচ্চ মূল্যের পোশাক ও ম্যান-মেড ফাইবারের পণ্য উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়।
অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য এ সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ শুধু আরো বেশি পোশাক সরবরাহ করা নয়; বরং কী ধরনের পোশাক সরবরাহ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ জায়গায় ম্যান-মেড ফাইবার ও উচ্চমূল্যের পণ্য বাংলাদেশের রফতানি সক্ষমতা বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র।
সরবরাহ থেকে জলবায়ু অংশীদারত্ব:
বাংলাদেশে এইচঅ্যান্ডএমের ভূমিকার আরেকটি পরিবর্তন ঘটছে পরিবেশগত ক্ষেত্রে। ২০২৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সফরের সময় কোম্পানিটি বিজিএমইএর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে একটি পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও জলবায়ু নিরপেক্ষ পোশাক খাত গড়ে তুলতে যৌথভাবে কাজ করা।
এ উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক পোশাক শিল্পের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপ। এইচঅ্যান্ডএমের নিজস্ব হিসাবে তাদের পরিবেশগত প্রভাবের বড় অংশই পণ্য তৈরির পর্যায়ে সৃষ্টি হয়। তাই সরবরাহকারী কারখানাগুলোতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়াকে তারা নিজেদের জলবায়ু কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি এইচঅ্যান্ডএমের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন বাজার। ফলে বৈশ্বিক বাজারে পরিবেশগত মানদণ্ডের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে বাংলাদেশী সরবরাহকারীদের উৎপাদন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
২০২১ সাল থেকে এইচঅ্যান্ডএমের বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশসহ সাতটি দেশে ২০০ সরবরাহকারী কারখানায় জ্বালানি দক্ষতা নিয়ে কাজ করেছে। এসব কারখানায় ২ হাজার ৫০০টির বেশি সম্ভাব্য জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা শনাক্ত করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে নতুন অধ্যায়: বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এইচঅ্যান্ডএম সক্রিয়। কোম্পানিটির বর্তমান জলবায়ু কৌশল অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে করপোরেট বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির আইনি কাঠামো অনুমোদিত হওয়ার পর এইচঅ্যান্ডএম, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসি এবং স্থানীয় কোম্পানি মিলে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালুর জন্য সমঝোতা করেছে।
এর আগে বাংলাদেশে এমন কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছিল কোম্পানিটি। ২০২৩ সালে এইচঅ্যান্ডএমের বাংলাদেশবিষয়ক কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউর রহমানও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির মতো ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।
এর পাশাপাশি এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপ এবং আরেক বৈশ্বিক পোশাক ব্র্যান্ড বেস্টসেলার বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াটের একটি সমুদ্রভিত্তিক বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির সম্ভাব্য কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিমাণ বছরে প্রায় ৭ লাখ ২৫ হাজার টন।
২০২৪ সালে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আরো একটি উদ্যোগে যুক্ত হয় এইচঅ্যান্ডএম। বেস্টসেলার, গ্যাপ, এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপ ও ম্যাঙ্গো মিলে ভবিষ্যৎ সরবরাহকারী উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের পোশাক ও বস্ত্র কারখানায় গভীর কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রকল্পে অর্থায়নের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল কারখানাগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কম-কার্বন উৎপাদন ব্যবস্থায় যেতে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা দেয়া।
উৎপাদন প্রযুক্তিতেও সহযোগিতা: বাংলাদেশে এইচঅ্যান্ডএমের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি নতুন দিক হলো উৎপাদন প্রযুক্তি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের চোরকা টেক্সটাইল লিমিটেডের সঙ্গে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করে এইচঅ্যান্ডএম। এতে পানি, জ্বালানি ও রাসায়নিকের ব্যবহার কমানোর নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা করা হয়।
প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ছিল ইউরোপীয় কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কারখানায় টেকসই উৎপাদন প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়।
এইচঅ্যান্ডএম বাংলাদেশ ও ভারতেও পানি ছাড়া রঙ করার প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য অর্থায়ন করেছে। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক ক্রেতাটির সম্পৃক্ততা বাড়ছে।
সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ: বাংলাদেশে এইচঅ্যান্ডএমের চার দশকের সরবরাহ সম্পর্ক এখন নতুন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে ১২৮টি সরাসরি সরবরাহকারী কারখানা এবং ৪ লাখ ৬১ হাজার শ্রমিকের বিশাল উৎপাদন ভিত্তি। অন্যদিকে উচ্চমূল্যের পণ্য, ম্যান-মেড ফাইবার, প্রযুক্তি, জ্বালানি দক্ষতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর মতো নতুন বিষয়।
বিশ্ববাজারে শুধু কম খরচে বড় পরিমাণ পোশাক উৎপাদন এখন আর যথেষ্ট নয়। ক্রেতাদের সরবরাহ সিদ্ধান্তে পণ্যের বৈচিত্র্য, উৎপাদন প্রযুক্তি, জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এইচঅ্যান্ডএমের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৪ বছরের সম্পর্ক সেই পরিবর্তনের একটি বড় উদাহরণ। ১৯৮২ সালে যে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল পোশাক সরবরাহ, চার দশক পর সেটিই বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমশক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে বৈশ্বিক ফ্যাশন বাজারের নতুন চাহিদাকে যুক্ত করছে। বাংলাদেশের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিনের এ সরবরাহ ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে আরো উচ্চমূল্যের পণ্য, ম্যান-মেড ফাইবার এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানো। আর এইচঅ্যান্ডএমের মতো দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাদের সঙ্গে সেই রূপান্তরের অংশীদারত্ব তৈরি করাই হতে পারে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পরবর্তী অগ্রযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।









