ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২৭টি দেশে সাইকেল রফতানিতে বাংলাদেশ এখন তৃতীয় এবং বৈশ্বিক তালিকায় অষ্টম অবস্থানে রয়েছে। এ সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে প্রবাসফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা, দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের সাহস এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগ।

বাংলাদেশের বাইসাইকেল শিল্পের যাত্রা বেশ বর্ণিল। নব্বইয়ের দশকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক সংকটের কারণে আকোকো নামের একটি সাইকেল কারখানার মালিক তার কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করেন। পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়াফেরত কয়েকজন দক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে ১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম রফতানিমুখী কারখানা ‘আলিটা বাংলাদেশ লিমিটেড’। প্রাথমিক অবস্থায় গুণমান প্রমাণ ও ইউরোপে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি চ্যালেঞ্জিং হলেও ১৯৯৭ সাল থেকে চিত্র দ্রুত বদলাতে থাকে।

আলিটার সাফল্যের পর স্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এ সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ শুরু করে। ২০০৩ সালে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ প্রথম বাইসাইকেল রফতানি শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালে দুরন্ত ব্র্যান্ড নিয়ে মাঠে নামে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। বর্তমানে জার্মান-বাংলা, করভো, নর্থ বেঙ্গলের মতো প্রায় ছয়টি বড় প্রতিষ্ঠান দেশে আন্তর্জাতিক মানের বাইসাইকেল উৎপাদন করছে।

ইউরোস্ট্যাট ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে বাংলাদেশ প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাইসাইকেল রফতানি করেছিল। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬ লাখে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রফতানি হয় প্রায় ১০ লাখ সাইকেল। ওই অর্থবছরে রফতানি আয় ছিল ১৩ কোটি ৮ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৮ শতাংশের বেশি।

২০২১-২২ অর্থবছরে রফতানি আরো বেড়ে প্রায় ১৭ কোটি ডলারে পৌঁছায়। এরপর অবশ্য দুই বছর রফতানি কমে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে প্রায় ৮ কোটি ২৫ লাখ ডলারে। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পুণরায় ঘুরে দাঁড়ায় এ খাত। রফতানি বেড়ে হয় ১১ কোটি ৬৪ লাখ ডলার। প্রবৃদ্ধি ছিল ৪১ শতাংশ।

এ ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে মেঘনা গ্রুপ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির সাইকেল রফতানি ছিল ৭ কোটি ৮১ লাখ ডলার। অর্থাৎ ওই অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট সাইকেল রফতানির প্রায় ৬৭ শতাংশ এসেছে মেঘনা গ্রুপ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের কারখানায় বছরে প্রায় ৮০ লাখ সাইকেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম ও ডেনমার্কের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের জন্যও সাইকেল তৈরি করে তারা।

বাংলাদেশের তৈরি সাইকেলের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ। লাইটক্যাসল পার্টনার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের মোট বাইসাইকেল রফতানির ৬৭ দশমিক ৪ শতাংশের গন্তব্য ছিল ইইউ। ওই বছর ইইউভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে ১০ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের সাইকেল আমদানি করে। সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল জার্মানি। দেশটি বাংলাদেশের মোট সাইকেল রফতানির ৪৬ শতাংশ হিস্যা দখল করেছে। এছাড়া অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, সুইডেন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনেও বাংলাদেশী সাইকেল যায়।

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অন্যতম সুবিধা হলো শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা। পাশাপাশি চীনা সাইকেলের ওপর ইইউর অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কও বাংলাদেশের রফতানিকারকদের কিছুটা সুবিধা দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের চাহিদা বাড়ায় সাইকেলের বাজারেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সেই সুযোগে নতুন সম্ভাবনার জায়গা তৈরি করছে বৈদ্যুতিক সাইকেল। লাইটক্যাসলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রাণ-আরএফএল জার্মানিতে বৈদ্যুতিক সাইকেল রফতানি শুরু করে। ইউরোপে এ পণ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সাধারণ সাইকেলের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বৈদ্যুতিক সাইকেলও ভবিষ্যতে রফতানি আয়ের বড় উৎস হতে পারে।

এই কাজে চ্যালেঞ্জও কম নয়। এখনো সাইকেলের কিছু যন্ত্রাংশ আমদানি করতে হয়। অচিরে উৎপাদন খরচ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নত যন্ত্রাংশ তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্ত হবে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সাইকেল তখন শুধু একটি রফতানি পণ্য নয়, দেশের শিল্প সক্ষমতারও পরিচয় হয়ে উঠতে পারে।