বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ জনবলের প্রয়োজনও বাড়ছে। এ ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে এএইউবির দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কৌশল কী?
এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র। এখানে জ্ঞানের পাশাপাশি দক্ষতা, শৃঙ্খলা, পেশাগত সততা ও নিরাপত্তাবোধ—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। এএইউবির একাডেমিক কার্যক্রমকে সে লক্ষ্যেই ক্রমান্বয়ে হালনাগাদ করা হয়েছে। দেশী-বিদেশী এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতার আলোকে কারিকুলাম উন্নয়ন, ব্যবহারিক ও শিল্পমুখী শিক্ষা, আধুনিক ল্যাবরেটরি, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করার ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। একই সঙ্গে ক্যারিয়ার পরিকল্পনা, পেশাগত দক্ষতা এবং গবেষণার সক্ষমতা উন্নয়নেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের একটি অংশ এরই মধ্যে দেশের এয়ারলাইনস ও এভিয়েশন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে এবং অনেকে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষায় গমন করছে। দীর্ঘমেয়াদে আমাদের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের নিজস্ব এভিয়েশন, অ্যারোস্পেস ও স্পেস সক্ষমতা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মানবসম্পদের একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করা।
এভিয়েশন শিক্ষাকে শিল্প খাতের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা কতটা জরুরি? এয়ারলাইনস, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সংস্থার সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা সম্প্রসারণে এএইউবির পরিকল্পনা কী?
এভিয়েশন শিক্ষাকে শিল্প খাত থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে আন্তর্জাতিক মানের পেশাজীবী তৈরি করা সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থী ক্লাসরুমে যে তত্ত্ব শেখে, সেটির বাস্তব প্রয়োগ তাকে বিমানবন্দর, এয়ারলাইনস, রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গবেষণাগার কিংবা প্রকৌশল পরিবেশে দেখতে হবে। এজন্য ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন আমাদের কাছে অতিরিক্ত কোনো কার্যক্রম নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ।
এএইউবি এরই মধ্যে বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সঙ্গে সম্পাদিত সমঝোতার আওতায় প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং, অন দ্য জব ট্রেনিং, ইন্টার্নশিপ এবং যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ক্যাব (সিএএবি), বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশন (স্পার্সো) এবং বেসরকারি এভিয়েশন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের নিয়মিত সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে এয়ারবাস জার্মানির একজন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে সেমিনার, এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাত যৌথ গবেষণা বিষয়ে বিশেষ সেমিনার আয়োজন করা হয়েছে।
ভবিষ্যতে আমরা ইন্টার্নশিপ, ফ্যাকাল্টি-ইন্ডাস্ট্রি অ্যাটাচমেন্ট, জয়েন্ট রিসার্চ, ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাকাল্টি এক্সচেঞ্জ, ভিজিটিং লেকচারস এবং যৌথ ল্যাবরেটরি বা টেকনোলজি-ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম আরো সম্প্রসারণ করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান যেন সরাসরি দেশের এভিয়েশন অর্থনীতিতে মূল্য সৃষ্টি করে—এটাই আমাদের লক্ষ্য।
গবেষণা ও উদ্ভাবনকে জাতীয় সক্ষমতায় রূপ দিতে শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশ নয়; প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকীকরণও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে এএইউবির গবেষণা অবকাঠামো ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
গত কয়েক বছরে এএইউবির শিক্ষক ও গবেষকদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মৌলিক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউএভি ডিজাইন অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং, এয়ারক্রাফট ডিজাইন, প্রেডিক্টিভ মেইনটেন্যান্স, কম্পোসাইট ম্যাটেরিয়ালস, অ্যাভিওনিকস, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন, অটোনমাস রোভার ও স্যাটেলাইট বেজড অ্যাপ্লিকেশনসের মতো বিষয় নিয়ে গবেষণার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রজেক্টের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গবেষণা অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। কোলাবোরেটিভ রিসার্চ ডিজাইন ল্যাবরেটরির মতো সুবিধার মাধ্যমে অ্যারোডাইনামিকস, স্ট্রাকচারস, প্রোপালশন, কম্পোজিটস, ফ্লাইট কন্ট্রোল, অ্যাভিওনিকস, সোয়ার্ম টেকনোলজিসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বিত গবেষণার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এএইউবির সাম্প্রতিক কার্যক্রমেও হিট প্রজেক্ট, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাতের কোলাবোরেটিভ রিসার্চ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
ভবিষ্যতে গবেষণা থেকে উদ্ভূত প্রযুক্তির ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি প্রটেকশন, ভ্যালিডেশন, ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ এবং প্রয়োজনে কমার্শিয়ালাইজেশনের জন্য একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা দেশের অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় সরাসরি অবদান রাখতে পারবে।
আমাদের একটি বড় শক্তি হলো যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও আধুনিক ল্যাবরেটরি অবকাঠামো। এএইউবিতে বর্তমানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পিএইচডিধারী শিক্ষক ও গবেষক রয়েছেন, যাদের অনেকেরই দেশী-বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব প্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করতে আমরা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, সিমুলেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর ল্যাব সুবিধা গড়ে তুলেছি। এসব ল্যাবরেটরি শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের হ্যান্ডস অন লার্নিং, এক্সপেরিমেন্টেশন এবং রিসার্চ করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
আগামী এক দশকে বাংলাদেশের এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস খাতকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে এএইউবি কী ভূমিকা রাখতে পারে? একটি আঞ্চলিক শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলার আপনার ভিশন কী?
আগামী পাঁচ-দশ বছর আমাদের জন্য ভিত্তি শক্ত করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চাই, যা শুধু এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস খাতের প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করবে না; বরং শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও নলেজ ক্রিয়েশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস সক্ষমতা নির্মাণে সরাসরি ভূমিকা রাখবে।
বোয়িং পাইলট অ্যান্ড টেকনিশিয়ান আউটলুক ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৪৪ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ২৩ লাখ ৭০ হাজার নতুন এভিয়েশন প্রফেশনাল প্রয়োজন হবে, যার মধ্যে ৭ লাখ ১০ হাজার মেইনটেন্যান্স টেকনিশিয়ান। শুধু সাউথ এশিয়ায়ই একই সময়ে প্রায় ৪৫ হাজার নতুন টেকনিশিয়ানের প্রয়োজন হবে। এর পাশাপাশি আমাদের সামনে একটি অত্যন্ত বাস্তব মার্কেট ডিমান্ড রয়েছে। বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্প এখন এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস দীর্ঘমেয়াদি বহর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। প্রতিটি এয়ারক্রাফটের সঙ্গে প্রয়োজন হবে ট্রেইন্ড ম্যানপাওয়ার, মেইনটেন্যান্স ক্যাপাবিলিটি, সেফটি ওভারসাইট ও টেকনিক্যাল সাপোর্ট।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস খাতের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হলে নতুন প্রজন্মকে শুরু থেকেই এভিয়েশন, অ্যারোস্পেস, রোবোটিকস ও স্পেস টেকনোলজির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। সে লক্ষ্যেই এএইউবি প্রথমবারের মতো লালমনিরহাট ক্যাম্পাসে ন্যাশনাল অ্যারো-জিনিয়াস কম্পিটিশন (এনএজিসি) আয়োজন করছে। ফিক্সড-উইং ইউএভি, ড্রোন ইউএভি, সকার বট ও স্পেস রোবোটিকসের মতো বিভিন্ন ক্যাটাগরির মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ তরুণ উদ্ভাবক ও আগ্রহী হবিস্টদের একটি জাতীয় প্লাটফর্মে একত্র করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা চাই, একজন তরুণ শুধু উড়োজাহাজ বা রোবোট দেখে উৎসাহিত হবে না; সে নিজে সেটি ডিজাইন, বিল্ড, টেস্ট ও ইনোভেট করার স্বপ্ন দেখবে। ভবিষ্যতের গবেষক, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি উদ্ভাবক তৈরির প্রক্রিয়াটি এভাবেই শুরু করতে হবে।
এ প্রেক্ষাপটে এএইউবির দায়িত্ব আরো গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ারিং (এএমই) প্রোগ্রামের প্রথম ব্যাচ আগামী বছর গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করতে যাচ্ছে। তবে আমরা এটাও উপলব্ধি করি, ধারাবাহিকভাবে আরো বেশিসংখ্যক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার, অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাভিওনিকস ইঞ্জিনিয়ার, সেফটি প্রফেশনাল ও অন্যান্য বিশেষায়িত জনবল তৈরি করতে হবে। দেশের একমাত্র বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এ মানবসম্পদ তৈরিতে এএইউবির একটি বিশেষ জাতীয় দায়িত্ব রয়েছে। ভবিষ্যতে এএইউবি দক্ষিণ এশিয়ায় এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র বা হাব হিসেবে কাজ করবে। তরুণদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি থেকে শুরু করে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট এডুকেশন, প্রফেশনাল ট্রেনিং, পোস্টগ্র্যাজুয়েট রিসার্চ, ইনোভেশন ও ইন্ডাস্ট্রি ডেপ্লয়মেন্ট। এএইউবি সেই মানবসম্পদ, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরির একটি প্রধান জাতীয় ও আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে সক্ষমতা অর্জনে কাজ করেছে।
বাংলাদেশের এভিয়েশন, অ্যারোস্পেস ও স্যাটেলাইট খাতের টেকসই বিকাশের জন্য অবকাঠামো ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কোন নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলোকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
প্রথমত, আমার দৃষ্টিতে, প্রথম প্রয়োজন হলো একটি সমন্বিত জাতীয় ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। বর্তমানে এভিয়েশন, অ্যারোস্পেস ও স্পেসসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, এয়ারলাইনস, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করছে। কিন্তু ভবিষ্যতের সক্ষমতা তৈরি করতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানের জ্ঞান, প্রয়োজন, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে একটি কার্যকর কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো রিসার্চ বেজড এবং স্কিল বেজড করতে হবে। এভিয়েশন, অ্যারোস্পেস বা স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মতো জ্ঞাননির্ভর খাতে শুধু ক্লাসরুম বেজড এডুকেশন যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থীদের ডিজাইন, সিমুলেশন, এক্সপেরিমেন্টেশন, টেস্টিং, ডেটা অ্যানালাইসিস, প্রবলেম সলভিং ও হ্যান্ডস অন কাজের মধ্য দিয়ে শিখতে হবে।
আমাদের চিন্তা ও কাজের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে—তাৎক্ষণিক ফলের প্রত্যাশার পরিবর্তে গবেষণামুখী মানসিকতা গড়ে তুলে গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অনেক সময় আমরা শুনি, ‘ফিনিশড প্রডাক্ট কোথায়?’ কিন্তু একটি ফিনিশড প্রডাক্ট গবেষণার শুরু নয়; বরং দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ। নতুন উড়োজাহাজ, ইউএভি, অ্যাভিওনিকস সিস্টেম, স্যাটেলাইট সাবসিস্টেম কিংবা অ্যাডভান্সড মেইনটেন্যান্স টেকনোলজি—কোনোটিই একদিনে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, অ্যাপ্লাইড রিসার্চ, ডিজাইন, রিপিটেড এক্সপেরিমেন্টেশন, প্রটোটাইপ ডেভেলপমেন্ট, ভ্যালিডেশন, সার্টিফিকেশন এবং তারপর কমার্শিয়ালাইজেশন। তাই গবেষণায় বিনিয়োগ ছাড়া ফিনিশড প্রডাক্ট প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের আগে গবেষণার সংস্কৃতি ও সক্ষমতা শক্তিশালী করতে হবে; সেখান থেকেই টেকসই প্রযুক্তি ও দেশীয় সক্ষমতা তৈরি হবে। এএইউবি এরই মধ্যে রিসার্চ বেজড লার্নিং এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশনকে একাডেমিক অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
তৃতীয়ত, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশনকে আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। আমি মনে করি, ইন্ডাস্ট্রিকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে—আগামী পাঁচ বা দশ বছরে তাদের কী ধরনের ইঞ্জিনিয়ার, এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স প্রফেশনাল, অ্যাভিওনিকস এক্সপার্ট, সেফটি স্পেশালিস্ট, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার, রিসার্চার বা ম্যানেজার প্রয়োজন। একাডেমিয়া সেই রিকয়ারমেন্ট বুঝে কারিকুলাম, ল্যাবরেটরি ট্রেনিং, ইন্টার্নশিপ, রিসার্চ ও হায়ার এডুকেশন প্রোগ্রাম তৈরি করবে। আবার ইন্ডাস্ট্রিকে ইউনিভার্সিটি রিসার্চের প্রবলেম স্টেটমেন্ট, ডেটা, টেকনিক্যাল মেন্টরশিপ এবং প্রয়োজনে ফান্ডিং দিতে হবে। আ টু-ওয়ে রিলেশনশিপ তৈরি হলেই আমরা এমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে পারব, যারা গ্র্যাজুয়েশনের পর শুধু ডিগ্রি হোল্ডার নয়; বরং ইন্ডাস্ট্রি রেডি প্রফেশনাল হিসেবে কাজে যোগ দিতে পারবে।
একই নীতি অ্যারোস্পেস ও স্যাটেলাইট খাতেও প্রযোজ্য। ভবিষ্যতের জন্য ইউএভি, অটোনোমাস সিস্টেমস, এয়ারক্রাফট ডিজাইন, প্রোপালশন, অ্যাভিওনিকস, স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন, স্পেস সিস্টেমস, রিমোট সেন্সিং ও স্যাটেলাইট অ্যাপ্লিকেশনের মতো ক্ষেত্রেও নিজস্ব জ্ঞান ও দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। এজন্য আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পর্যায়ের পাশাপাশি মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ের হায়ার এডুকেশন ও রিসার্চ ক্যাপাসিটি আরো সম্প্রসারণ করা জরুরি। আমরা চাই এএইউবি এমন একটি জায়গা হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু বিদ্যমান টেকনোলজি শিখবে না; বরং ভবিষ্যতের এভিয়েশন, অ্যারোস্পেস ও স্পেস টেকনোলজি নিয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে।
বর্তমান সরকারের ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতাহারে দেশের এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং দেশীয় এভিয়েশন খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কথা বিশেষভাবে বলা হয়েছে। একই অংশে বেসরকারি এয়ারলাইনসকে নীতিগত সহায়তা, এভিয়েশন প্রযুক্তি ও কার্গো খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং নিরাপত্তা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এসব লক্ষ্য অর্জনের মূল ভিত্তিই হচ্ছে কোয়ালিটি এডুকেশন, রিসার্চ, স্কিলড হিউম্যান রিসোর্সেস এবং ইফেক্টিভ ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ।
সুতরাং আমাদের ভবিষ্যৎ নীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ইকোসিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, রিসার্চ বেজড হায়ার এডুকেশন, একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন, স্কিল বেজড লার্নিং ও ইন্ডাস্ট্রি রেডি প্রফেশনালস তৈরি। দীর্ঘমেয়াদে একটি দেশের এভিয়েশন ও অ্যারোস্পেস সক্ষমতা নির্ধারিত হবে তার মানুষ, জ্ঞান, গবেষণা ও নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দিয়ে। এএইউবি এ সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।














