মুন্সিগঞ্জ বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এখানে শিল্প-কারখানা, নৌপথ, দেশের একমাত্র এক্সপ্রেসওয়ে, রাজধানী ঢাকার সঙ্গে ৩২ জেলার প্রবেশপথ, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ জনপদ বিদ্যমান। ফলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা পুলিশকে প্রতিনিয়ত ব্যাপক ও বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হয়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত বছরের ৩১ আগস্ট প্রায় ভঙ্গুর অবস্থায় মুন্সিগঞ্জ জেলা পুলিশের দায়িত্ব নিই। সে সময় পুলিশ সদস্যদের মনোবল ছিল প্রায় শূন্যে এবং জনগণেরও আস্থা ছিল তলানিতে। অল্প সময়ের মধ্যেই মনোবল ফিরিয়ে এনে পুলিশকে কার্যকর ও গতিশীল করে তোলা হয়। জনবান্ধব পুলিশিং কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।

বর্তমানে জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। হত্যাকাণ্ড, ডাকাতি ও ছিনতাইসহ গুরুতর অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা কার্যক্রম, অভিযান এবং জনগণের সহযোগিতার কারণেই এসেছে এ সাফল্য।

আমি দায়িত্ব নেয়ার শুরুতেই মূল চ্যালেঞ্জ ছিল শারদীয় দুর্গা পূজাকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজন করা। জেলা পুলিশের তৎপরতায় ও পরিশ্রমের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জ জেলায় কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই সুন্দরভাবে শারদীয় এ উৎসব উদযাপন হয়। এবারো আমরা গতবারের মতো সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।

সাম্প্রতিক সময়গুলোয় মব ভায়োলেন্স, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় বিভিন্ন গুজব ও অপপ্রচারকে ঘিরে বিভিন্ন রকম সহিসংতা পরিলক্ষিত করা যাচ্ছে। জেলা পুলিশ এ ব্যাপারে সর্বদা সতর্ক থাকায় মুন্সিগঞ্জে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

মুন্সিগঞ্জের অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিল বালুমহলকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি। এ বালুমহলে শান্তিময় পরিস্থিতি ফিরিয়ে এনে চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকেন্দ্রিক ডাকাতি বন্ধে নেয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চেকিং ও সার্বক্ষণিক টহল কার্যক্রম। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর গত এক বছরে সংঘটিত প্রতিটি ডাকাতির ঘটনা উদঘাটন করা হয়েছে এবং বেশির ভাগ ডাকাত গ্রেফতার হয়েছে। প্রত্যন্ত নদীকেন্দ্রিক অঞ্চলগুলোয় ডাকাত দলের আধিপত্য ছিল প্রবল, সেখানে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করে ডাকাতদের ধরতে চিরুনি অভিযান চলমান। গুয়াগাছিয়া পুলিশ ক্যাম্পের সুফল পেতেও শুরু করেছে এলাকাবাসী। ডাকাতদের ভয়ে এলাকাছাড়া হাজার হাজার মানুষ নিজ ভূমিতে ফিরে এসেছে।

কিছু চ্যালেঞ্জও সবসময় বিদ্যমান। বিশেষ করে মাদক ব্যবসা ও সেবন, কিশোর গ্যাং, ইভ টিজার সাইবার অপরাধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করছে।

মাদক একটি জাতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে—এটি আমরা সবাই জানি। তাই মাদকের বিরুদ্ধে মুন্সিগঞ্জ জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। আমাদের নীতি হলো জিরো টলারেন্স। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি আমরা কেবল দমন নয়, প্রতিরোধমূলক উদ্যোগেও জোর দিচ্ছি। স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক সভা, মাদকবিরোধী শোভাযাত্রা ও সেমিনারের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে সচেতন করার চেষ্টা চলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যান্য জেলার মতো মুন্সিগঞ্জেও কিশোর গ্যাং একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। আমরা এ সমস্যার মোকাবেলায় দুটি দিককে গুরুত্ব দিচ্ছি—প্রথমত আইনি ব্যবস্থা, দ্বিতীয়ত সামাজিক প্রতিরোধ। অপরাধে জড়িত কিশোরদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসনে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য জেলা পুলিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জেলা পুলিশ সর্বদা সক্রিয়। এ-সংক্রান্ত অভিযোগকে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। থানায় নারী ও শিশুবান্ধব ডেস্ক চালু রয়েছে, যেখানে ভুক্তভোগীরা নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন। পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সমাজকে এসব অপরাধ সম্পর্কে আরো সংবেদনশীল করার চেষ্টা চলছে।

প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং কার্যক্রমও জেলায় চালু রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, অনলাইন জিডি গ্রহণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল সেবা প্রবর্তন এবং নারী ও শিশুবান্ধব হেল্প ডেস্ক চালুর মাধ্যমে সেবা আরো সহজ ও দ্রুতগামী হয়েছে।

অপরাধ দমন শুধু পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আমরা কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। গ্রাম ও মহল্লা পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং সভা, ওপেন হাউজ ডে, মতবিনিময় সভা ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফলে জনগণ এখন অপরাধের তথ্য সরবরাহে আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যা অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

মুন্সিগঞ্জ জেলা পুলিশের লক্ষ্য হচ্ছে—‘একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও অপরাধমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা।’ এ জন্য আমরা সততা, পেশাদারত্ব এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।