কৃষি কিংবা নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের বাইরে গত কয়েক দশকে জেলার অর্থনীতিতে আরেকটি শক্তিশালী স্তম্ভ তৈরি হয়েছে—প্রবাসী আয়। জেলার হাজার হাজার পরিবার এখন সরাসরি বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল বিদেশে কর্মরত স্বজনদের পাঠানো অর্থের ওপর। সেই অর্থে বদলেছে ঘরবাড়ি, সন্তানের শিক্ষার সুযোগ, স্থানীয় বাজারের চাহিদা এবং অনেক পরিবারের জীবনযাত্রা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জেলাভিত্তিক হিসাব বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মুন্সিগঞ্জে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় এসেছে ৬০ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে এ আয় ছিল ৪৫ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জেলার রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের শীর্ষ ১০ রেমিট্যান্সপ্রাপ্ত জেলার তালিকায় মুন্সিগঞ্জের অবস্থানও উঠে এসেছে।
ডলারের হিসাবে অংকটি বড় হওয়ার পাশাপাশি জেলার অর্থনীতিতে এর প্রভাবও বিস্তৃত। কারণ প্রবাসী আয় শুধু একটি পরিবারের হাতে পৌঁছায় না; এর একটি অংশ জমি কেনা, বাড়ি নির্মাণ, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিয়ে কিংবা দৈনন্দিন ভোগে ব্যয় হয়। আবার কেউ সেই অর্থ দিয়ে দোকান, পরিবহন, কৃষি, মাছের ঘের বা ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। ফলে বিদেশে একজনের কর্মসংস্থান থেকে তৈরি হওয়া আয় স্থানীয় অর্থনীতির একাধিক স্তরে ঘুরতে থাকে।
মুন্সিগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীর আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন এ পরিবর্তনের একটি উদাহরণ। কয়েক বছর আগে স্থানীয়ভাবে করা এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইউনিয়নটির ১২৫ থেকে ১৩০ জনের মতো মানুষ তখন বিদেশে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রবাসী পরিবারের আয় এলাকার জীবনযাত্রা ও শিক্ষায়ও প্রভাব ফেলেছে। বিদেশে থাকা তরুণদের একটি অংশ নিজেদের শিক্ষাজীবনের সীমাবদ্ধতার অভিজ্ঞতা থেকে পরিবারের ছোটদের পড়াশোনায় বেশি ব্যয় করছেন। আবদুল্লাহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এক পর্যায়ে সপ্তম শ্রেণীতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি থাকার ঘটনাকেও স্থানীয়রা এর একটি সামাজিক প্রতিফলন হিসেবে দেখেছেন।
তবে মুন্সিগঞ্জে প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা কত—এ প্রশ্নের উত্তর একেবারে সরল নয়। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে জনশক্তি কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ২০০০ সাল থেকে এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জ থেকে মোট ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১০১ জন বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরেই কর্মভিসায় বিদেশে গেছেন ১ লাখ ৪ হাজার ২০১ জন। একই প্রতিবেদনে মুন্সিগঞ্জকে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে অভিবাসী জনসংখ্যার দিক থেকে ১৫তম হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে বিদেশে থাকা সক্রিয় কর্মীর সংখ্যা জেলা পর্যায়ে নির্ভুলভাবে আলাদা করা কঠিন, কারণ অনেকে দেশে ফিরে আসেন, আবার অনেকে একাধিকবার বিদেশে যান।
বিপুল এ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জেলায় দক্ষতা উন্নয়নের অবকাঠামোও তৈরি হয়েছে। মুন্সিগঞ্জ সদর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিএমইটির নির্দেশনায় বিদেশগামী কর্মীদের জন্য প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশনসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পরিচালনা করছে। বিদেশে যাওয়ার আগে অভিবাসন প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও চাকরির বিধি সম্পর্কে কর্মীদের ধারণা দেয়াই এসব প্রশিক্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য।
কিন্তু এখানেই মুন্সিগঞ্জের প্রবাসী অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা ও দুর্বলতা—দুটিই পাশাপাশি দেখা যায়। বিদেশে কর্মরত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের কতজন দক্ষ বা উচ্চ দক্ষ পেশায় রয়েছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই সংখ্যক কর্মী যদি নিম্ন মজুরির কাজের বদলে কারিগরি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, মেরিন, ইলেকট্রিক্যাল কিংবা অন্যান্য দক্ষ পেশায় যেতে পারেন, তাহলে একজন কর্মীর আয় যেমন বাড়বে, তেমনি জেলার সামগ্রিক রেমিট্যান্স প্রবাহও বাড়তে পারে।
প্রবাসী আয় বাড়ার সঙ্গে তাই শুধু ‘কত ডলার এল’—এ হিসাব যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হলো সেই অর্থের কতটা দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ তৈরি করছে। একটি পরিবার প্রবাসীর পাঠানো অর্থে নতুন বাড়ি তুললে তা পারিবারিক সম্পদ বাড়ায়। সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় পাঠালে তৈরি হয় মানবসম্পদ। কিন্তু অর্থের বড় অংশ যদি শুধু জমি কেনা, অলস সঞ্চয় কিংবা ভোগে চলে যায়, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীল প্রভাব সীমিত থাকে।
এ জায়গাতেই মুন্সিগঞ্জের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। পদ্মা সেতু ও ঢাকা-মাওয়া মহাসড়ককেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জেলার অর্থনৈতিক ভূগোলও বদলে দিয়েছে। রাজধানী ও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের ফলে শিল্প, গুদামজাত, পরিবহন, আবাসন ও বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রবাসী পরিবারের সঞ্চয় যদি এসব খাতে পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে রেমিট্যান্স শুধু পারিবারিক ভোগের অর্থ না হয়ে স্থানীয় বিনিয়োগের পুঁজিতে পরিণত হতে পারে।
জেলার অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বোঝার আরেকটি দিক হলো এর ধারাবাহিকতা। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসেই মুন্সিগঞ্জের প্রবাসীরা প্রায় ২৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছিলেন বলে সে সময়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে জেলার রেমিট্যান্স প্রবাহে যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা কেবল সাময়িক কোনো মাসের ওপর নির্ভরশীল নয়।
এখন প্রবাসীর পাঠানো প্রতিটি ডলার যদি একটি বাড়ির দেয়াল ছাড়িয়ে একটি ব্যবসা, একটি কারখানা, একটি শিক্ষিত প্রজন্ম কিংবা একটি নতুন কর্মসংস্থানে রূপ নেয়, তাহলে মুন্সিগঞ্জের জন্য প্রবাসী আয় শুধু বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ থাকবে না; হয়ে উঠতে পারে জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি।










