‘ট্রিপল এ’ রেটিং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠানের দর্শন, নীতি ও সামগ্রিক কার্যক্রমের প্রতিফলন। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শুরু থেকেই সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রেখেছে। ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্ষদের তদারকি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বাধীন যাচাই-বাছাই ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়েও আমরা সবসময় অগ্রণী। দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অটোমেটেড ব্যাংক হিসেবে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে আমরা দেশের অন্যতম বৃহৎ এটিএম, সিআরএম এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছি, যা পরিচালন ঝুঁকি ও ব্যয়—উভয়ই কমিয়েছে।

আমরা কখনই স্বল্পমেয়াদি মুনাফাকে অগ্রাধিকার দিইনি; বরং টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ বেছে নিয়েছি। পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ, রক্ষণশীল প্রভিশনিং নীতি এবং বৈচিত্র্যময় ঋণ পোর্টফোলিও আমাদের আর্থিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে। সর্বোপরি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, নিয়মনীতির প্রতি শ্রদ্ধা, জবাবদিহিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিই এ অর্জনের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

এ রেটিং ধরে রাখার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক চাপ, উচ্চ সুদের হার বা ব্যবসায়িক দুর্বলতার কারণে ঋণের মান অবনতি হলে রেটিংয়ের ওপর দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে মুনাফা ও ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিক মুনাফার আশায় অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয়ার পরিবর্তে ঝুঁকি-সমন্বিত প্রবৃদ্ধির ওপর আমাদের জোর দিতে হয়। এছাড়া দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যার অনেকটাই কোনো ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেও ক্রেডিট রিস্ক, সম্পদের গুণগত মান (Asset Quality) এবং করপোরেট সুশাসনের মান অক্ষুণ্ন রাখাই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।

‘ট্রিপল এ’ রেটিং কি তহবিল সংগ্রহের খরচ কমাতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাস্তব সুবিধা দিচ্ছে?

নিঃসন্দেহে। ‘ট্রিপল এ’ রেটিং শুধু একটি স্বীকৃতি নয়; এর বাস্তব আর্থিক মূল্যও রয়েছে। প্রথমত, আন্তঃব্যাংক তহবিল সংগ্রহ ও আমানত সংগ্রহে আমরা তুলনামূলক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অর্থায়ন পাই, যা সামগ্রিক তহবিল ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং সম্পর্ক স্থাপন ও বজায় রাখা সহজ হয়, যা বৈদেশিক বাণিজ্য অর্থায়ন, রেমিট্যান্স ও এলসি লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক ও খুচরা—উভয় শ্রেণীর আমানতকারীর কাছে এ রেটিং আস্থার একটি স্পষ্ট প্রতীক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন এবং নতুন ব্যবসায়িক অংশীদার আকৃষ্ট করতেও এ রেটিং ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।

আপনার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বর্তমান অবস্থা কী? ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কী ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন?

আমরা ঐতিহাসিকভাবে আমাদের শ্রেণীকৃত ঋণের হার ইন্ডাস্ট্রি গড়ের তুলনায় অনেক নিচে রাখতে সক্ষম হয়েছি। এর পেছনে মূল কারণ আমাদের কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো। ঋণ প্রদানের আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করা, সে অনুযায়ী ঝুঁকি প্রশমিত করার প্রক্রিয়াগুলো ঠিক করা, নিয়মিত নজরদারিতে রাখা এবং অগ্রিম সতর্কতার মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসাব আগেভাগে চিহ্নিত করা আমাদের পদ্ধতির মূল ভিত্তি। আদায় প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে আপস-মীমাংসা ও প্রি-সুট মিডিয়েশনের মতো পদ্ধতিও কার্যকরভাবে ব্যবহার করছি, যা সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংকগুলোকে জোরদার করতে বলেছে।

আগামী দিনের ব্যাংকিং প্রযুক্তিনির্ভর হবে। AI, ডেটা অ্যানালিটিকস, ওপেন ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট ও সাইবার নিরাপত্তায় আপনার ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কৌশল কী?

আগামী দিনের ব্যাংকিং যে প্রযুক্তিনির্ভর হবে তাতে সন্দেহ নেই এবং আমরা সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। আমাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে; যা ক্রেডিট স্কোরিং, প্রতারণা শনাক্তকরণ ও গ্রাহকসেবা স্বয়ংক্রিয়করণে সাহায্য করবে। ডেটা অ্যানালিটিকসের মাধ্যমে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি ও নির্ভুল ঝুঁকি মূল্যায়ন করছি। ওপেন ব্যাংকিং এপিআই কাঠামো গড়ে তোলার কাজ করছি, যাতে ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিরাপদ সহযোগিতার মাধ্যমে গ্রাহকদের আরো বেশি সেবা দেয়া যায়। ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে আমাদের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা এবং দেশজুড়ে বিস্তৃত এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করছে এবং আমরা এ নেটওয়ার্ক আরো সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়েছি। সাইবার নিরাপত্তা এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়—নিয়মিত পেনিট্রেশন টেস্টিং, সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার শক্তিশালীকরণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের আইসিটি নির্দেশিকা কঠোরভাবে অনুসরণ এবং কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা এ ঝুঁকি মোকাবেলায় সক্রিয় আছি।

ব্যাংক খাতকে আন্তর্জাতিক মানে শক্তিশালী করতে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে কী ধরনের সমন্বয় ও সংস্কার সবচেয়ে জরুরি?

যেকোনো সংস্কার সফল করতে হলে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটি ধারাবাহিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত সমন্বয় প্রয়োজন। সবচেয়ে জরুরি হলো ঋণ আদায়-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততর করা, বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল ও বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা এবং খেলাপি সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তাবিত নতুন আইনি কাঠামো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নীতিমালা ঘোষণার চেয়ে তার সামঞ্জস্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন এবং এক্ষেত্রে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

আগামী পাঁচ বছরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার কী হবে?

আমাদের অগ্রাধিকার হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংকিং নিশ্চিত করা, যাতে গ্রাহক প্রায় প্রতিটি সেবা নির্বিঘ্নে ডিজিটাল মাধ্যমে পেতে পারেন। একই সঙ্গে সিএসএমই এবং নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সম্প্রসারণে আমরা বিশেষ গুরুত্ব দেব। কারণ এ খাত ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। টেকসই ও সবুজ অর্থায়নও আমাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন এবং ইএসজি (ESG) নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমরা আরো জোর দেব। পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে প্রত্যন্ত ও ব্যাংকিং-সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দিয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরো বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নেও বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। আর সবকিছুর কেন্দ্রে থাকবে সম্পদের গুণগত মান বজায় রেখে ‘ট্রিপল এ’ ক্রেডিট রেটিং ধরে রাখা এবং একটি টেকসই, আস্থাশীল ও দায়িত্বশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রাহক ও অংশীদারদের পাশে থাকা।