গ্রাহকদের আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রাইম ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি ট্রিপল ‘এ’ ক্রেডিট রেটিং অর্জন করেছে। তবে এটি কোনো একদিনের সাফল্য নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের ধারাবাহিক চর্চার ফল। শুরু থেকেই আমরা সম্পদের গুণগত মান, শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি, পর্যাপ্ত তারল্য, কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর কমপ্লায়েন্স কাঠামোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং, গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে পরিচালন দক্ষতা ও সেবার মান ধারাবাহিকভাবে উন্নত করেছি। তবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি—যেখানে সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দলগত কাজ প্রতিটি সিদ্ধান্তের ভিত্তি। পরিচালনা পর্ষদের দূরদর্শী দিকনির্দেশনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিটি সহকর্মীর পেশাদারত্ব এ অর্জনের মূল চালিকাশক্তি।

আমরা বিশ্বাস করি, ট্রিপল ‘এ’ রেটিং শুধু অতীতের সাফল্যের স্বীকৃতি নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রতিও একটি দায়বদ্ধতা। এ স্বীকৃতি গ্রাহক, আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য অংশীজনের আস্থা আরো সুদৃঢ় করবে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ মানের সুশাসন, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্বও আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই রেটিং ধরে রাখার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

ট্রিপল ‘এ’ ক্রেডিট রেটিং অর্জনের মতোই এটি ধরে রাখাও একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আর ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রাইম ব্যাংক পিএলসি. দীর্ঘমেয়াদে টানা দুই বছর সর্বোচ্চ রেটিং অর্জন করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার, বিনিময় হারজনিত চাপ এবং পরিবর্তনশীল নিয়ন্ত্রক পরিবেশ ব্যাংকগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সম্পদের গুণগত মান বজায় রাখা, দক্ষতার সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা, পর্যাপ্ত মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। আমাদের বিশ্বাস, শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স, কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যবসায়িক কৌশলই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মূল ভিত্তি। একই সঙ্গে আমরা টেকসই প্রবৃদ্ধি, স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা প্রতিপালনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। ট্রিপল ‘এ’ রেটিং আমাদের কাছে শুধু একটি স্বীকৃতি নয়, বরং প্রতিদিন আরো দায়িত্বশীল, স্থিতিশীল ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার অঙ্গীকার।

‘ট্রিপল এ’ রেটিং কি তহবিল সংগ্রহের খরচ কমাতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাস্তব কোনো সুবিধা দিচ্ছে?

অবশ্যই ট্রিপল ‘এ’ ক্রেডিট রেটিং একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের প্রতি বাজারের সর্বোচ্চ আস্থার প্রতিফলন। এর বাস্তব প্রভাব বিভিন্ন স্তরে অনুভূত হয়। প্রথমত, এটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়ায়। ফলে প্রতিযোগিতামূলক শর্তে তহবিল সংগ্রহের সুযোগ সম্প্রসারিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের ব্যয় আরো দক্ষভাবে ব্যবস্থাপনার সম্ভাবনা তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, এই রেটিং গ্রাহক, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো সুদৃঢ় করে, যা একটি ব্যাংকের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আস্থার এ ভিত্তি আমাদের আমানত সংগ্রহ, করপোরেট সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে আমি মনে করি, ট্রিপল ‘এ’ রেটিংকে শুধু একটি বাণিজ্যিক সুবিধা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে ধরা পড়ে না। এটি আমাদের প্রতি অংশীজনদের প্রত্যাশাকে আরো বাড়িয়ে দেয় এবং সর্বোচ্চ মানের সুশাসন, আর্থিক শৃঙ্খলা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার দায়িত্বও বহুগুণে বৃদ্ধি করে। সেই দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতিই আমাদের ভবিষ্যৎ পথচলার মূল শক্তি।

আপনার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বর্তমান অবস্থা কী? ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কী ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন?

ঋণের গুণগত মান একটি ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই আমরা সবসময়ই প্রবৃদ্ধির চেয়ে গুণগত ও টেকসই ঋণ বিতরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছি। আমাদের খেলাপি ঋণের হার সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে, যা আমাদের বিচক্ষণ ঋণনীতি, শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সফল ঋণ আদায় কার্যক্রমের প্রতিফলন। ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আমরা কঠোর ক্রেডিট মূল্যায়ন, খাতভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ, নগদপ্রবাহের সক্ষমতা যাচাই এবং গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগেই শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করি। নিয়মিত পোর্টফোলিও পর্যালোচনা, স্ট্রেস টেস্টিং, স্বাধীন ঝুঁকি ও পরিপালন তদারকি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যাপ্ত প্রভিশন সংরক্ষণের মাধ্যমে আমরা ঋণ পোর্টফোলিওর মান নিশ্চিত করি। যেসব ঋণ চাপে পড়ে, সেগুলোর ক্ষেত্রে গ্রাহকের ব্যবসায়িক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী পুনর্গঠন, পুনঃতফসিলীকরণ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং কার্যকর ঋণ আদায় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। আমাদের লক্ষ্য শুধু খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনা নয়; বরং একটি সুস্থ, বৈচিত্র্যময় ও টেকসই ঋণ পোর্টফোলিও গড়ে তোলা, যা ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি এবং অংশীজনদের আস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে।

প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে আপনাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী?

আমরা বিশ্বাস করি, আগামী দিনের ব্যাংকিং হবে প্রযুক্তিনির্ভর, ডেটা-চালিত এবং গ্রাহককেন্দ্রিক। তাই প্রাইম ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হলো প্রযুক্তিকে শুধু সহায়ক অবকাঠামো হিসেবে নয়, বরং ব্যবসায়িক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিকসের মাধ্যমে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সেবা, দ্রুত ঋণ মূল্যায়ন, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর করছি। ওপেন ব্যাংকিং ও এপিআই-ভিত্তিক ইকোসিস্টেমের মাধ্যমে ফিনটেক ও করপোরেট অংশীদারদের সঙ্গে নিরাপদ সংযোগ তৈরি করে নতুন সেবার সুযোগ সম্প্রসারণ করছি। একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট, তাৎক্ষণিক লেনদেন এবং উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। প্রযুক্তিগত এ রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাইবার নিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা কাঠামো, রিয়েল টাইম থ্রেট মনিটরিং এবং নিয়মিত সাইবার রেজিলিয়েন্স অনুশীলনের মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য ও আর্থিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করছি।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে আন্তর্জাতিক মানে আরো শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করতে কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন?

আন্তর্জাতিক মানের ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ অপরিহার্য। সুদহার ও মুদ্রা বিনিময় হারকে আরো বাজারভিত্তিক করা, উচ্চ খেলাপি ঋণ মোকাবেলায় দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের জন্য জবাবদিহিতামূলক পুনর্গঠনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ও ক্রেডিট তথ্যভাণ্ডারকে আধুনিক ও রিয়েল টাইমভিত্তিক করা এবং ওপেন ব্যাংকিং ও ফিনটেক অংশীদারত্বের জন্য সহায়ক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। আমাদের বিশ্বাস, নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সহায়তা ও কার্যকর তদারকির ভারসাম্যই বাংলাদেশকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় আরো প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিয়ে যাবে।