দেশের টেরিটাওয়েল খাতের যাত্রা চার দশকের। এ চার দশকে খাতটি নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়েছে, এগিয়েছে বহুদূর। এখন বিলিয়ন ডলারের ঘরে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা মহামারীতে ভালো করলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কমেছে রফতানিও। দেশের টেরিটাওয়েল খাতের সার্বিক বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ টেরিটাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিটিএলএমইএ) চেয়ারম্যান ও টাওয়েল টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম শাহাদাত হোসেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরফিন শরিয়ত।

দেশের টেরিটাওয়েল খাতের যাত্রা কীভাবে? গল্পটা বলবেন আমাদের।

টেরিটাওয়েলের যাত্রা অনেকটা নাটকীয়ভাবেই। গার্মেন্টসের যাত্রা শুরুর পর সারা বিশ্বের মানুষ জানল, বাংলাদেশে গার্মেন্টস পণ্য উৎপাদন হয়। তখনকার সময়ে টেরিটাওয়েল বলতে কুষ্টিয়ায় পুরনো আমলের কয়েকটি ফ্যাক্টরি ছিল, তারা উৎপাদন করে দেশেই সরবরাহ করত। রফতানির সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সম্পর্ক ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র যখন বড় আকারে আমদানি শুরু করল, তখন তারা পাকিস্তানের ওপর এমনভাবে কোটা দিয়ে দিল যে, নির্দিষ্ট সংখ্যার চেয়ে বেশি পরিমাণ টেরিটাওয়েল পাকিস্তানিরা রফতানি করতে পারবে না। পাকিস্তানি টাওয়েল প্রস্তুতকারকদের হাতে প্রচুর অর্ডার, তারা কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।

এরই মাঝে আমেরিকা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ, স্বাধীনতার পর আমেরিকার সঙ্গে নানা টানাপড়েনের বিষয়টি চিন্তা করে বাংলাদেশকে কোটা দিয়ে দিল, যেটা বাংলাদেশের পক্ষে অসম্ভব বিষয় ছিল তখন। দেশে কোনো শিপমেন্ট, অবকাঠামো, কারখানা কিছুই নেই। সে পরিস্থিতিতে এটা একটা বিশাল ব্যাপার। বাংলাদেশ করতে পারবে ২ অথবা ৪; বাংলাদেশকে দিয়ে রেখেছে ৪০। পাকিস্তান তখন রফতানি করলেও তাদের কোটা দিয়ে রফতানির পরিমাণ ছোট করে দেয়ায় তারা আর কিছু করতে পারছিল না। তখন পাকিস্তানের শিল্পপতিরা রাতারাতি এসে চট্টগ্রামের ইপিজেডে কারখানা দিয়ে দিল। সেখান থেকে বাংলাদেশের টেরিটাওয়েল খাতের যাত্রা। কোটা ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের টেরিটাওয়েলের বিশ্ববাজারে ভালোভাবে সুনাম অর্জন করে।

যাত্রার পর বাংলাদেশ কতটুকু ভালো করতে পেরেছে?

যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া সে পথপরিক্রমায় আজকের এখানে এসেছে। তবে এ খাতকে অনেক বেশি এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। গার্মেন্টস খাতে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করছি। সে অনুযায়ী টেরিটাওয়েল খাত ও হোম টেক্সটাইলে অনেক ভালো করা উচিত ছিল। অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডাসহ অনেক দেশেই আমাদের শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে। এসব সুবিধা নিয়ে আমরা অনেক বেশি এগিয়ে যেতে পারতাম। আমাদের ১৪৭টি কারখানা থেকে ১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার রফতানি করছি। এটা কম করে হলেও ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের বাজার হওয়া উচিত ছিল।

আমাদের সবার সমস্যা হচ্ছে আমরা গার্মেন্টস করব বললে সবাই গার্মেন্টসের দিকে দৌড়াই, সোয়েটার করব বললে সবাই সোয়েটারের দিকে দৌড়াই, নিট করব বললে সবাই নিটের দিকে দৌড়াই। এত বড় একটা সেক্টর আছে তা নিয়ে আমরা চিন্তা করি না, বিনিয়োগ করি না।

২০২৬ সালের মধ্যে জিএসপি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন প্রতিযোগিতা করবেন কীভাবে?

গত অক্টোবর থেকে রফতানিতে হ্রাসের চিত্র দেখছি, এটা ভয়ংকর মনে হয়েছে আমার কাছে। আমরা পাকিস্তানের সঙ্গেও পারছি না, ভারতের সঙ্গেও না। যেখানে আগে ভারত আমাদের কাছাকাছি কোথাও ছিল না, এখন তারা আমাদের থেকে ভালো অবস্থানে। ১৮ জানুয়ারির পরে কেউ ভালো করেছে বলে মনে হয় না, সবাই আবছা আবছা বলছে। ১৪৯ শতাংশ গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করে দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বললে তো হবে না, এটা তো হতে পারে না।

আপনি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন, বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন, মজুরি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমি প্রতিযোগিতা করব কীভাবে? পাকিস্তানের নিজস্ব তুলা আছে, কেমিক্যাল আছে। তাদের গ্যাসের দাম আমাদের গ্যাসের দামের চেয়ে অনেক কম। এ অবস্থা বিরাজ করলে ২০২৬ সাল কেন, এখনো তো প্রতিযোগিতা করার সুযোগ নেই। 

জিএসপি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও তো আমাদের টিকে থাকতে হবে। এজন্য আপনারা কী পদক্ষেপে নিচ্ছেন?

২০২৬ সালে সক্ষমতার জায়গায় শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য আমাদের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আমাদের প্রতিযোগীর মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারত গার্মেন্টস খাতে প্রবলভাবে এগিয়েছে। যেটা আমরা ১০-১২ বছর আগে দেখতাম না। আমাদের ১০ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয়, তার ওপর আবার ১০ শতাংশ কেটে নেয়। খয়রাতি দেয়, খয়রাতির ওপর ১০ শতাংশ কেটে নেয়। ছোট ছোট কিছু জিনিস অ্যাডজাস্ট করলে প্রতিযোগী হিসেবে আমরা সক্ষমতার জায়গায় থাকব।

আমাদের টিকে থাকার জন্য প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। এভাবে তো টিকে থাকা এবং কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা কঠিন।

টেরিটাওয়েলের স্থানীয় বাজার কেমন? রফতানি সাইজ কত?

আমাদের বাংলাদেশে টেরিটাওয়েল ব্যবহারের প্রচলন এখনো সেভাবে হয়নি। টেরিটাওয়েলের ব্যবহার না করে গ্রাম-বাংলার মানুষ এখনো গামছা ব্যবহার করে। বৈশ্বিকভাবে এটা ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাজার, সেখানে আমাদের রফতানি সাইজ মাত্র ১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

অপ্রচলিত বাজারে প্রবেশের চেষ্টা হিসেবে আপনারা কী করছেন? 

অপ্রচলিত বাজার বলতে লাতিন আমেরিকা, জাপান, চীন, ভারতকে বলা হয়। জাপানের বাজারে ঢোকার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। জাপানিরা প্রতিটি পণ্য যাচাই করে নেয়। জাপানিদের বাজারে ঢোকার জন্য পণ্যের যে মান নির্ধারণ করতে হয়, সে মানসিকতা এখনো আমাদের গড়ে ওঠেনি।। যার কারণে এ মার্কেটে যেতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে। লাতিন আমেরিকার বাজার অনেক বড় বাজার। পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে ভারত-চীনে আমাদের প্রবেশ করতে হবে। আগে আমরা এখান থেকে ‘ইনকোয়ারি’ পেতাম না, এখন আস্তে আস্তে পাচ্ছি। এসব বাজার ওপেন হলে ইউরোপ-আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।

টেরিটাওয়েলের কাঁচামালের অধিকাংশই আমাদের দেশে উৎপাদন হয়। আমদানির জন্য কেমন অংশ খরচ করতে হয়?

টেরিটাওয়েলের প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে দেশীয় সুতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেশে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার করা হয়। দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোয় যে সুতা ব্যবহার করা হয়, তা কারখানায় ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়ভাবে অনেকে এখন কেমিক্যাল উৎপাদন করছে। টিকে গ্রুপ, বিএম গ্রুপ কিছু কেমিক্যাল উৎপাদন করে। স্থানীয় এসব ক্যামিকেল আমরা ব্যবহার করি। বিদেশ থেকে আমাদের কিছু আমদানি করতে হয় না। টেরিটাওয়েল একমাত্র পণ্য, যার শতভাগ দেশীয় কাঁচামাল দ্বারা উৎপাদন হয়।

বর্তমানে আমাদের এখানে কতটি কারখানা আছে, বিনিয়োগ কত আছে?

বর্তমানে আমাদের দেড়শর বেশি কারখানা আছে। এসব কারখানায় বিনিয়োগ আছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার।

অনেক কারখানা মালিক অভিযোগ করছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী বলছে?

সারা পৃথিবীর যেখানে যাবেন, সেখানে আপনি মেড ইন বাংলাদেশ পণ্য দেখবেন। গার্মেন্টস শিল্পকে তার উৎকর্ষের জায়গায় যদি রাখতে হয়, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইউটিলিটির দাম নির্ধারণ করতে হবে। তাহলে আমরা আবার সক্ষমতা ফিরে পাব।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে কারা রফতানি করছে, কারা আসছে, যাচ্ছে তাদের দেখছেন। সারা দেশের জন্য আপনি ঢালাওভাবে গ্যাসের দাম কমাতে না চাইলে রফতানিমুখী শিল্পের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের জন্য আলাদাভাবে গ্যাসের দাম নির্ধারণ করুক। তাহলে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে।

করোনার আগে টেরিটাওয়েল খাত বিলিয়ন ডলার ছুঁতে পারেনি। করোনার সংকটে এটা বিলিয়ন ডলার ছোঁয়। শুধু বিলিয়ন ডলার না, দেড় বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত যায়। এর কারণ কী বলে মনে হয় আপনার?

করোনা শুরুর আগে থেকে আমাদের আশা ছিল রফতানি দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে। ২০১৬, ২০১৭ সালেই দেড় বিলিয়ন ডলার হওয়া উচিত ছিল। করোনার সময় পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বন্ধ ছিল, আমাদের সরকারের সুন্দর পদক্ষেপের কারণে আমরা কখনো বন্ধ রাখিনি। অন্যান্য দেশ বন্ধ থাকার কারণে আমাদের দেশের সে সুযোগ-সুবিধা বেশি ছিল। আমরাও রাত-দিন কাজ করে আমাদের ক্রয়াদেশগুলো শেষ করেছি। যার কারণে দেড় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। করোনা পরবর্তীকালে যুদ্ধ পরিস্থিতিসহ আঞ্চলিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে এখন আর কেউ ভালো নেই। তার ওপর ১৮ জানুয়ারি থেকে গ্যাসের দাম বেড়েছে, বিদ্যুতের দাম কয়েক দফা বাড়ল। এখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাই আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশে দেড়শরও বেশি টেরিটাওয়েল কারখানা আছে। এর মধ্যে মাত্র ৬০টি কারখানা উৎপাদনে আছে। বাকি কারখানাগুলো নিষ্ক্রিয় কেন?

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে ছোট ছোট কারখানা করা হয়েছিল। তখন কারো উইভিং ছিল, ডায়িং ছিল না, কারো ডায়িং ছিল, উইভিং ছিল না বা স্ট্রিচিং ছিল না। যেগুলো তখনকার দিনের কোটা ব্যবস্থার কারণে খুব ভালো ছিল। পরবর্তী সময়ে বাজারের প্রতিযোগিতার কারণে তারা টিকে থাকতে পারেনি। যেমন ঋণখেলাপি, ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের প্রবাহ কমে যাওয়া, ব্যবসা পরিবর্তন, সবকিছু মিলিয়ে অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশে আরো বেশি ইন্ডাস্ট্রি হওয়া উচিত ছিল, মার্কেট ছোট হওয়ার কারণে ইন্ডাস্ট্রি কমে গেছে, বিদেশ থেকে ক্রয়াদেশ আসা কমে গেছে, ক্যাশ ফ্লো কমে গেছে। তারা অন্য ব্যবসায় শিফট করে গেছে।

সামনের দিনগুলোয় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটা গোলযোগের আশঙ্কা সবাই করছে। এ পরিস্থিতি ব্যবসা খাতে কতটুকু প্রভাব ফেলবে?

নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব বড় ব্যাপার না। এটা স্বাভাবিক, আমরা আগেও দেখে এসেছি, বড় কিছুর আশঙ্কা করছি না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধটা বন্ধ হলে আমাদের পরিস্থিতি উন্নতি হবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি পরিবর্তন না হলে আমাদের উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে ইউটিলিটির দাম সামঞ্জস্য করে তারপর আমাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে।