সামিম আহমেদ। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিপিজিএমইএ) সভাপতি। আসন্ন বাজেটকে কেন্দ্র করে প্লাস্টিক খাতের নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শেখ তৌফিকুর রহমান

দেশের প্লাস্টিক খাতের সম্ভাবনা ও বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট কী?

বর্তমানে প্লাস্টিক খাতে সম্ভাবনা ও সংকট উভয়ই বিদ্যমান। প্লাস্টিক খাত হচ্ছে লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি। অর্থাৎ ফুড প্রসেসিং, গার্মেন্ট, ইলেকট্রনিকস, হাউজহোল্ড, ফার্মাসিউটিক্যাল প্রভৃতি খাতের সঙ্গেই প্লাস্টিক জড়িত। তাছাড়া এ শিল্পকে আর্থিক প্রবৃদ্ধির চালকও বলা যেতে পারে। অর্থাৎ দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধিতে অন্যান্য শিল্পের মতো এটাও সাহায্য করে। এখন সরকার চাইছে অটোমোবাইল শিল্পকে উন্নত করতে। অটোমোবাইল শিল্পের ৭০-৮০ শতাংশ উপাদান প্লাস্টিকের। ফলে প্লাস্টিক শিল্পের উন্নয়নটাও এ সঙ্গে চলে আসে। একইভাবে ইলেকট্রনিকস শিল্পের ৫০-৬০ শতাংশ উপাদান প্লাস্টিকের। মোটরসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিরও ৫০-৬০ শতাংশ উপাদান প্লাস্টিকের। সুতরাং গুরুত্ব বিবেচনায় প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিকে আরো উন্নত করতে হবে। এ শিল্পের যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলোকে সমাধান করতে পারলেই অন্য যেসব শিল্প রয়েছে সেগুলোতেও প্রবৃদ্ধি আসবে।

আমি কোনো শিল্পকেই ছোট করে দেখছি না। যেসব শিল্পের সঙ্গে প্লাস্টিক খাতের সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলোর স্বার্থেই বলছি। প্রত্যেক শিল্পেই কম-বেশি সমস্যা থাকে। প্লাস্টিক খাতও তার বাইরে না। আমাদের এ খাতেও বেশকিছু সমস্যা রয়েছে। সবার আগে আমরা চাই সরকার আরো ব্যবসাবান্ধব হোক, শিল্পবান্ধব হোক। ব্যবসা বা শিল্পবান্ধব হতে সরকারকে শুল্ক কমাতে হবে। আমরা সেটা বলছি না। শুল্ক কমানোটা এখানে একটা বিষয় হলেও সেটা মুখ্য না। আমাদের সেক্টরে এসএমই খাতের যেসব ব্যবসায়ী রয়েছেন তারা ভ্যাট, ট্যাক্স, সুরক্ষা আইন, শ্রম আইন—এগুলো একসঙ্গে প্রতিপালন করতে পারে না। ফলে সরকারের চোখে তারা দোষী হয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে কোম্পানি অনুযায়ী আলাদা আইন তৈরি করা। 

সংকট মোকাবেলায় বাজেটে কিছু করণীয় আছে কিনা?

অতিমারীর অভিঘাত কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলো। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম হু হু করে বেড়েছে। যেটা এখনো চলছে। প্লাস্টিক খাতের যেসব কাঁচামালের দাম ছিল ৮০০-৯০০ ডলার, সেগুলো এখন ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলার হয়েছে। এছাড়া যাতায়াত ভাড়াসহ সব ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে শুনেছি সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের বিল বাড়াবে। এ পরিস্থিতিতে যদি এসবের মূল্য বাড়ানো হয়, তাহলে প্লাস্টিক খাতের ছোট-বড় সব শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন যেটা উচিত হবে সেটা হচ্ছে যতদূর পারা যায় স্থিতি অবস্থা বজায় রাখা। যাতে সবকিছু আবার আগের মতো সহনীয় পর্যায়ে আসতে পারে।

সুনির্দিষ্টভাবে এবারের বাজেট থেকে প্লাস্টিক খাতের প্রত্যাশা কী?

পুরান ঢাকায় আমাদের ছোট ছোট কারখানা রয়েছে। সেগুলোকে সরকার স্থানান্তর করতে চাইছে। প্রধানমন্ত্রীও চাইছেন। আমরাও মনে করি এটা স্থানান্তর করা একান্ত দরকার। তার জন্য সরকার দুটি শিল্পাঞ্চল করছে। আমরা চাই সেই অঞ্চলগুলোর কার্যক্রম শিগগিরই বাস্তবায়ন হোক। পুরান ঢাকায় থাকার কারণে ছোট ছোট কারখানা ট্রেড লাইসেন্স পাচ্ছে না। সঠিকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে না। এছাড়া আমাদের খেলনার একটা উপখাত রয়েছে। খেলনার কাঁচামালের মূল্য কমানো দরকার। যাতে ছোট ছোট ব্যবসায়ী টিকে থাকতে পারেন। এ রকম যে বাধাগুলো আছে সেগুলো নিরসন করা অতি প্রয়োজন।

প্লাস্টিক খাতে বিনিয়োগ কেমন? বিদ্যমান উৎপাদন ও চাহিদা সম্পর্কে জানতে চাই।

সুনির্দিষ্টভাবে বিনিয়োগের পরিমাণটা বলা যাবে না। তবে প্লাস্টিক শিল্প খাতে প্রতি বছর ২০ শতাংশ হারে বিনিয়োগ বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় ছয় হাজারের ওপর শিল্প-কারখানা রয়েছে। বছরে দেশীয় বাজারে আমরা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বিপণন করছি। বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হচ্ছে। প্রতি বছরই এটা ১০-১২ শতাংশ হারে বাড়ছে। 

পরিবেশবান্ধব প্লাস্টিক শিল্প ধারণার বাস্তবতা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

প্লাস্টিক শিল্প কোনো পরিবেশ দূষণ করে না। অনেক শিল্প-কারখানা পানিদূষণ, পরিবেশ দূষণের কারণে জরিমানার আওতায় এসেছে। কিন্তু আমাদের তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণের কারণে শাস্তির আওতায় আসেনি। তবে এর মধ্যে কথা রয়েছে। যারা ব্যান্ড আইটেম তৈরি করছেন তারা জরিমানার আওতায় আসছেন। যেমন নিয়মবহির্ভূতভাবে পলিথিন শপিং ব্যাগ তৈরি করে যারা বাজারজাত করছে, তারা শাস্তির আওতায় আসছে। দূষণটা হচ্ছে পরোক্ষভাবে। যেমন কেউ একটি চানাচুরের প্যাকেট কিনে সেটি খেয়ে প্যাকেটটি যেখানে-সেখানে ফেলে দিচ্ছে। এটাকে বলে পোস্ট-ইউজ ম্যানেজমেন্ট। আমাদের পোস্ট-ইউজ ম্যানেজমেন্টটা সঠিক হচ্ছে না। এটা যেখানে-সেখানে ফেলার কথা না। এটা সঠিক জায়গায় ফেলতে হবে। মিউনিসিপ্যালিটি এসে সেটাকে সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে। তারপর এটাকে ডিসক্লোজআপ অথবা রিসাইক্লিং করে পরিবেশটাকে দূষণমুক্ত রাখবে। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ের দায়িত্ব সেটাকে সঠিক জায়গায় ফেলা।

আবার সরকার এখনো সঠিক জায়গা নির্ধারণ করে দেয়নি। পর্যাপ্ত গার্বেজ বিন নেই। কোথায় ময়লা ফেলতে হবে সেটারও ঠিক-ঠিকানা নেই। মিউনিসিপ্যালিটি, পৌরসভা অথবা স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে ময়লাগুলো সংগ্রহ করে সেটা আবার ডাম্পিং এরিয়ায় ফেলে দিচ্ছে। সেখান থেকে আবার রাস্তায় চলে আসছে। অর্থাৎ আগে সিস্টেমটাকে ঠিক করতে হবে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রেক্ষাপটে প্লাস্টিক খাতের ভবিষ্যৎ রূপান্তর সম্পর্কে জানতে চাই।

প্লাস্টিক শিল্পের জন্য আমদানি করা বেশির ভাগ মেশিনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হয়। এটা ব্যবহার যথেষ্ট নিরাপদ। তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী যদি মেশিন ব্যবহার করা যায় তাহলে আমাদের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যে দৃষ্টিকোণ রয়েছে সেটি অর্জন প্লাস্টিক শিল্পের জন্য সম্ভব। তাছাড়া বর্তমানে আমাদের অনেক শিল্প-কারখানা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে। অনেকেই সে সক্ষমতা অর্জন করছে।