১৯৫২ সালে চট্টগ্রামের নাছিরাবাদ শিল্প এলাকায় গড়ে ওঠে ‘ইস্ট বেঙ্গল স্টিল রি-রোলিং মিলস’। স্বাধীনতার পরে নাম বদল করে যা রাখা হয় বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস বা বিএসআরএম। প্রায় ৭০ বছর আগে যাত্রা করা প্রতিষ্ঠানটি ইস্পাত খাতে নিজের দক্ষতা আর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দামে অস্থিরতায় দেশের ভারী এ শিল্প খাতের বর্তমান অবস্থা, মেগা প্রকল্পে রডের ব্যবহার ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন বিএসআরএমের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান রাশেদ এইচ চৌধুরী
করোনার ধকল
সামলে উঠতেই
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ
পরিস্থিতি ইস্পাত শিল্পে কেমন
প্রভাব ফেলছে?
চলমান যুদ্ধ
উদ্যোক্তাদের একটি
কঠিন পরিস্থিতিতে
ফেলেছে। সরবরাহ
ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত
হয়ে বিশ্বজুড়ে
ইস্পাতের কাঁচামালের
দাম খুব
বেশি বেড়েছে।
বর্তমানে বিশ্ববাজার
থেকে আমাদের
মেল্টিং স্ক্র্যাপ
৫২৫-৫৫০
ডলারে কিনতে
হচ্ছে। এক
বছরের হিসাব
করলে প্রায়
দ্বিগুণ বেড়েছে।
একইভাবে বেড়েছে
রাসায়নিকের মধ্যে
সবচেয়ে প্রয়োজনীয়
কাঁচামাল ফেরো
অ্যালয়সের দামও।
কাঁচামালটি ১
হাজার ৪০০
থেকে ১
হাজার ৪৫০
ডলারে কিনতে
হচ্ছে। যেটি
ছয় মাস
আগেও ৮০০-৮৫০
ডলারের মধ্যে
ছিল। এর
সঙ্গে যুক্ত
হয়েছে সমুদ্রপথে
পণ্য পরিবহনে
অস্বাভাবিক ভাড়া।
সব মিলিয়ে
পণ্যের উৎপাদন
খরচ বেড়েছে
অস্বাভাবিকভাবে। এর
মধ্যে কাঁচামাল
আমদানিনির্ভর হওয়ায়
দেশে ডলারের
সংকটে উদ্যোক্তাদের
আরো বেকায়দায়
ফেলেছে। আগে
আমদানি করা
এলসি নিষ্পত্তিতে
এখন অনেক
বেশি অর্থ
পরিশোধ করতে
হচ্ছে। এলসি
খোলা ও
নিষ্পত্তিতে ডলারের
বিনিময় হারের
বড় ব্যবধান
কোম্পানির মুনাফা
কমিয়ে দিচ্ছে।
বাড়িয়ে দিচ্ছে
উৎপাদন ব্যয়।
ব্যবসা পরিচালনায় আর কোন
চ্যালেঞ্জগুলো সামনে
আসছে?
শিল্পে চ্যালেঞ্জ
থাকবে। কিন্তু
সেটা শনাক্ত
করে সমাধান
করার উদ্যোগ
নিতে হবে।
আমদানি হওয়া
ইস্পাত শিল্পের
কাঁচামাল খালাসের
জন্য চট্টগ্রাম
বন্দরের অবকাঠামোগত
উন্নয়ন খুব
বেশি প্রয়োজন।
দেশের অর্থনীতি
যে পরিসরে
বড় হয়েছে,
সে তুলনায়
বন্দর সুবিধা
বাড়েনি। বন্দরের
সক্ষমতা বাড়লে
উদ্যোক্তাদের কাঁচামাল
আমদানিতে ক্ষতি
কমে আসবে।
ব্যবসা এগিয়ে
নিতে ‘ইজ
অব ডুইং
বিজনেস’ (ব্যবসা
সহজ করা)
সূচক বড়
ফ্যাক্টর। এ
সূচকে আমাদের
অত্যধিক গুরুত্ব
দিতে হবে।
এছাড়া শিল্পের
বিকাশে করভারের
ক্ষেত্রে সরকারি
নীতির ধারাবাহিকতা
রাখাটা খুবই
জরুরি।
ইস্পাত শিল্পে সরকারের নীতিসহায়তা কেমন আশা
করছেন?
বর্তমানে যে
পরিস্থিতি আমাদের
মোকাবেলা করতে
হচ্ছে, তাতে
সরকারের নীতিসহায়তা
খুবই জরুরি।
আমাদের পার্শ্ববর্তী
দেশগুলোয়ও তা-ই
করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারে অস্বাভাবিক
হারে দাম
বাড়তে থাকায়
আমাদের সংগঠন
থেকে জাতীয়
রাজস্ব বোর্ডে
আমদানিনির্ভর কাঁচামালের
করভার সহনীয়
করার ব্যাপারে
সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব
দেয়া হয়েছে।
আশা করছি
আসন্ন বাজেটে
সরকারের পক্ষ
থেকে এটা
গুরুত্ব দিয়ে
বিবেচনা করা
হবে।
নির্মাণ খাতে
ব্যবহূত অনেক
আমদানিনির্ভর পণ্যই
এখন দেশে
স্থানীয়ভাবে উৎপাদন শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে কোনো
প্রতিবন্ধকতা রয়েছে
কি?
শিল্পায়নের প্রসারের
লক্ষ্যে স্থানীয়
শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা
দিতেই হবে।
বর্তমানে একই
পণ্য বা
তার বিকল্প
পণ্য বিদেশ
থেকে আমদানি
করার কারণে
স্থানীয় শিল্পের
চরম ক্ষতি
হচ্ছে। যেমন
দেশের অবকাঠামো
নির্মাণে ব্যবহূত
এলআরপিসি, কনটিনিউয়াস
আর্ক ওয়েল্ডিং
ওয়্যার ও
এসিএসআর কোর
ওয়্যারের মতো
গুরুত্বপূর্ণ ওয়্যার
প্রডাক্টসের ক্ষেত্রে
এতদিন আমদানিনির্ভরতা
ছিল। কিন্তু
সম্প্রতি দেশে
স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের
উদ্যোগে এ
নির্ভরতা পুরোপুরি
কেটেছে। এজন্য
বড় বিনিয়োগও
করতে হয়েছে।
যদিও নতুনভাবে
বিনিয়োগ করা
স্থানীয় এ
শিল্পকে টিকিয়ে
রাখতে বর্তমান
শুল্ক কর
কাঠামো একটি
বড় প্রতিবন্ধকতা
হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশে এখন
চাহিদার চেয়ে
বেশি তৈরি
হলেও এসব
পণ্য আমদানি
পর্যায়ে নামমাত্র
শুল্কহারের এইচএস
কোডে (হারমোনাইজড
কমোডিটি ডেসক্রিপশন
অ্যান্ড কোডিং
সিস্টেমস) শুল্কায়ন
ছাড়াও রাজস্ব
ফাঁকির ঘটনা
ঘটছে। এ
পরিস্থিতিতে জাতীয়
রাজস্ব বোর্ড
কর্তৃক শুল্কহার
পুনর্বিন্যাস ও
সংশোধন স্থানীয়
বিনিয়োগকে সুরক্ষা
দিতে পারে।
স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি এরই
মধ্যে দেশের
বাইরেও ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে
বিএসআরএম। এ
বিষয়ে জানতে
চাই।
বিএসআরএম ১৯৫২ সাল থেকে রড উৎপাদন করে আসছে। এ দীর্ঘ সময়ে ইস্পাত পণ্য উৎপাদনে মান উন্নত করা সবসময়ে আমাদের লক্ষ্যে থেকেছে। বিএসআরএমের কারখানার এখন বছরে রড উৎপাদনক্ষমতা ১৬ লাখ টন। আর বিলেট উৎপাদনক্ষমতা ১৮ লাখ টন। তবে এ দুটোর ক্ষেত্রেই সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ৪০ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে বিএসআরএম। দেশের পর আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায়ও কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে। কাঁচামাল সাশ্রয়ী করতে এবং এর সংগ্রহের কাজে হংকংয়ে গঠন করা হয়েছে সহযোগী কোম্পানি। আমরা মনে করি, কারখানায় পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে খরচ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে রফতানির মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুরু থেকেই আমাদের ব্যবসার পরিকল্পনা ও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে ইস্পাত খাতকে ঘিরেই। উন্নয়নের নিরিখে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বেস্ট সিক্রেট দেশ হলো বাংলাদেশ। তাই বলব বাড়তি শুল্ককরের বোঝা না থাকলে দ্রুতই অনেক দূর এগিয়ে যাবে দেশের ইস্পাত খাত।






