বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) বাংলাদেশভিত্তিক সব ধরনের শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী একক এবং একমাত্র জাতীয় শিল্প সংগঠন। বিসিআই তরুণ শিল্প উদ্যোক্তা সৃষ্টি, মাইক্রো ও স্মল শিল্প উদ্যোক্তা সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্পায়নের প্রসার, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা এবং বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন ছাড়াও স্থানীয় সব শিল্পের সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা নিরসনে কাজ করে চলেছে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে সরকারের জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১, এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ২০৩০, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রক্রিয়া, অষ্টম পঞ্চমবার্ষিক পরিকল্পনা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পথপ্রদর্শক হিসেবে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট কাজ করবে বলে বিসিআই বিশ্বাস করে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বাংলাদেশের করপোরেট ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নেয়ার ব্যাপারে কাজ শুরু করেছে এবং আমরাও এ ব্যবস্থাকে সাধুবাদ জানাই।

নিবন্ধিত হওয়ার পর মুনাফা অর্জনে নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ সময়কার ব্যয় অথবা ক্ষতি বিবেচনা করা হয় না। প্রাথমিক খরচের বিষয়টি (কোম্পানি প্রতিষ্ঠার আগের খরচ) বিবেচনা করার প্রস্তাব করছি। ব্যবসায় ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও টার্নওভার কর নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, যা প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আয় কর আইনের ৮২সি ধারা অনুসারে সর্বনিম্ন কর হিসেবে উৎসে কর কর্তন করা হয়ে থাকে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা আবার অ্যাসেসমেন্টে নেয়া হয়, আমরা উৎসে করকে চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করেছি। কর নিরূপণ সম্পন্ন হওয়ার পর আয়কর রিফান্ড সৃষ্টি হলে (ধারা-১৫০, বিধি-৩৬) ফেরত দেয়ার বিধান থাকলেও অগ্রিম আয়কর ফেরত পাওয়া যায় না। আমরা ওই ধারার প্রয়োগের প্রস্তাব করেছি। আয়কর আইনের ৩০ ধারা মোতাবেক অননুমোদিত খরচ অতিরিক্ত বোঝা বহন করে। এ ধারার ক্ষেত্রে বিজনেস প্রমোশনের খরচ যেমন মার্কেটিং, এন্টারটেইনমেন্ট, স্যাম্পল, বিদেশ ভ্রমণ, এমপ্লয়ি পারকুইজিট, ইনসেনটিভ বোনাস, টেকনিক্যাল ফি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ধারা ৩০ অনুযায়ী খরচের সীমা রহিত করে প্রকৃত খরচ হিসেবে আমলে নেয়ার প্রস্তাব করেছি। বর্তমান আইনে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন খরচের ওপর মূসকের হার ৫-১৫ শতাংশ আরোপিত আছে। এ হার ৩-১০ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ এবং রেট নির্বিশেষে সব ক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত অনুমোদন, বিবিধ খরচ দেখানোর কোনো বিধান নেই। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিবিধ খরচ এবং অনবলোকিত খরচ অপরিহার্য যা কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিতে রাজি নয়। আমরা বিবিধ খরচকে বিবেচনার প্রস্তাব করছি। সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে উৎসে কর কর্তন না করা হলে তা অন্য উৎসের আয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিধান বাতিলের প্রস্তাব করছি।

বিসিআই মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তরুণ শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং এর ধারাবাহিকতায় আগামী ২০২২-২৩ অর্থবছরের জাতীয়  বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য নিম্নলিখিত সুপারিশ পেশ করছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে বাজেটে বিশেষ তহবিল গঠন করা হয়েছে কিন্তু সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে এ তহবিলের সুফল পাওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল বিতরণের জন্য নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করছি। কর ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, দ্রুত, আধুনিক, যুগোপযোগী এবং সবাইকে কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করার প্রস্তাব করছি। বাংলাদেশের করপোরেট কর হার আশপাশের দেশের তুলনায় অনেক বেশি। বিসিআই বিগত বছরের মতো আড়াই শতাংশ হারে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করছে। এতে সরকারের ওপর চাপ কম পড়বে। দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিসিআই করপোরেট করহার ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার প্রস্তাব করছে। শিল্প ক্ষেত্রে মূসক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেশি। শিল্প খাত রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করে দেশের অর্থনীতিতে অধিক ভূমিকা রাখে বিধায় মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতের জন্য করপোরেট কর ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণের প্রস্তাব করছি। আমদানি পর্যায়ে নিয়ম মোতাবেক শুল্ক-করাদি প্রদান করা সত্ত্বেও আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়ে একজন ইন্সপেক্টর কর্তৃক মাঠ পর্যায়ে তদারকি প্রতিবেদন প্রদানের বিধান রহিত করার প্রস্তাব করছি। আমরা করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব করছি। ব্যক্তিগত করমুক্ত সীমা ও বিদ্যমান আয়করের হার পুনর্নির্ধারণ, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় আগামী ২০২২-২৩ কর বছরের জন্য বর্তমান ব্যক্তিগত করমুক্তসীমা ও বিদ্যমান আয়করের হার পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করছি।

মূসক ব্যবস্থায় ভোক্তা ও দেশের ৮৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি পণ্য এবং সেবা খাতে নিয়োজিত শিল্প ও সেবা খাতের ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ও সামর্থ্য অনুযায়ী একটি ভোক্তাবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব এবং রাজস্ববান্ধব ভ্যাট ব্যবস্থা বলবৎ করার জন্য নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। মূলধনি যন্ত্র আমদানি পর্যায়ে যেহেতু মূসক অব্যাহতি দেয়া আছে, সেহেতু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মূলধনি যন্ত্রের ওপর মূসক আরোপ রহিত করার প্রস্তাব করছি। মূসক নিবন্ধিত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য উৎপাদনে ব্যবহূত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ০ থেকে ৫ শতাংশ মূল্যসংযোজন করের প্রস্তাব করছি। মূসক নিবন্ধিত রফতানি বিকল্প পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মূসকের সর্বোচ্চ হার ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।

উদ্ভিদ ও উদ্ভিদজাত দ্রব্য আমদানি সেবার ওপর নির্ধারিত ফি ও মাশুলের অতিরিক্ত শূন্য মূল্যসংযোজন কর আরোপ করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। আমদানিকারক নির্বিশেষে মাইক্রো, ক্ষুদ্র, মাঝারি, নারী এবং নতুন শিল্প উদ্যোক্তাসহ সব শ্রেণীর জন্য বিনিয়োগবান্ধব এবং উৎপাদনশীল পণ্যভিত্তিক আমদানি শুল্ক স্তর করা হোক। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি পণ্য- ডিজিটাল ভিডিও ডিসপ্লে, ডিজিটাল হোয়াইট বোর্ড, অ্যাডভারটাইজিং বোর্ড ইত্যাদি পণ্যের কোনো এইচএস কোড  নেই, যে কারণে বিচ্ছিন্নভাবে আমদানি হচ্ছে। আমরা এ ধরনের পণ্যের নতুন এইচএস কোড সৃষ্টির প্রস্তাব করছি।