প্রতি বছর ১০ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এবারের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অসম বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য’। করোনার আগের বিশ্বেও অসমতা ছিল। তবে করোনা-পরবর্তী সে অসমতা গতি পেয়েছে। মহামারীর কারণে কর্মসংস্থান ও জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশের লাখ লাখ মানুষ নতুন করে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ওয়ার্ল্ড ইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল আউটলুক ট্রেন্ডস ২০২১ অনুসারে, ২০২০ সালে মহামারীটি বৈশ্বিক কর্মঘণ্টার প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত করে। চলতি বছরও এ প্রবণতা জারি আছে; বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা হারিয়ে গেছে তা ১৪০ ও ১২৭ মিলিয়ন ও পূর্ণকালীন চাকরি সমতুল্য। শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে ২০২২ সালেও মোট কর্মসংস্থানের পরিমাণ ২০১৯ সালের তুলনায় কম হবে। ফলে শ্রমবাজারের মন্দাবস্থা বাড়বে অনুন্নত অঞ্চলগুলোতে। যা বেকার ও তরুণদের বিষাদগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিগুলোকে বাড়িয়ে দেয়।
তাহলে মন খারাপের উত্স কোথায়? সমাজে নাকি বৈশ্বিক সিস্টেমে? এ প্রশ্নের উত্তরে বিশ্বজুড়ে টিকা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বাস্তবতা উন্নত ও অনুন্নত বিশ্বের মধ্যকার মোটা দাগের বৈষম্য রেখাটিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষের মতে, দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা প্রাক-মহামারীর আগের অসম বিশ্বের জন্য কল্পনা করাটাও ছিল কঠিন। অনেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আয় হারিয়েছে, ফলে তারা নিজেদের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। ক্ষুধা-বঞ্চনা বাড়ছে। বিশ্বের বেশির ভাগ সম্পদ অল্পকিছু মানুষের কাছে রয়েছে। বেশির ভাগ সম্পদ ও উপার্জন দখল করে আছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। কভিড পরিস্থিতির মধ্যে যাদের আয় ও সম্পদের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়েছে।
এমন একটা অসম বৈশ্বিক ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য কতটা সুরক্ষিত থাকে, তা প্রশ্ন। তবে কভিড-১৯ হয়তো আমাদের অন্য রকম কিছু শেখাতে পারত। শোভন ও ন্যায্য পৃথিবী গড়ার দাবিকে সুস্পষ্ট করতে পারত। আমাদের নীতিনির্ধারকদের সচেতন করতে পারত সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা বিষয়ে। কভিডের শুরুতে যেভাবে ওজোন স্তরের ক্ষত সেরে উঠছিল, তেমনি পৃথিবীর মানুষের চিন্তার ক্ষতগুলোও যদি সেরে উঠতে শুরু করত তাহলে আজ ‘অসম বিশ্বে মানসিক স্বাস্থ্য’—এমন বাস্তবতা নিয়ে আমাদের হাজির হতে হতো না।
গবেষকরা বলছেন কভিডকালের কথা; ভাইরাসটি শরীরের ক্ষতি করার পাশাপাশি ছড়িয়ে দিচ্ছে মনের অসুখও। যারা অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে আছে, যাদের দিনের হিসাব দিনে করতে হয়, যারা শিক্ষিত বেকার হয়ে বসে থাকছে, তাদের ক্রমেই বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক মন্দার সময় মানুষের আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছেলেটা-মেয়েটা আজ পাস করে বের হতো, সে এখনো আটকে আছে। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও কভিডকালীন নানা ধরনের অস্থিরতার শিকার। বছরের পর বছর দিন-রাত বাসায় থাকার কারণে অধিকাংশ মানুষই মানসিক স্থিতি হারিয়েছে। মনোবিদরা বারবার সতর্ক করে যাচ্ছেন, আমরা যেন কোনোভাবেই হতাশা ও আতঙ্কগ্রস্ত না হই।
ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহামারীর মধ্যে যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে ৫ হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সেই সময় ১১ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছে। বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, হাসপাতাল ও থানা থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা যায় যে ২০২০ সালে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা ছিল ১৪ হাজার ৪৩৬টি। অথচ ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের কাছাকাছি। অর্থাৎ করোনাকালীন পরিস্থিতিতে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েছে বিগত বছরের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ, যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ভারতীয় সাইক্রিয়াট্রি সোসাইটির তথ্য বলছে, দেশটিতে শুধু করোনার কারণে প্রায় ২০ শতাংশ মানসিক রোগী বেড়েছে।
করোনার অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু করে হঠাৎ আরোপিত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে অনেকেই দুশ্চিন্তা ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যাকে। ধারণা করা হচ্ছে, মহামারী থেকে পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত ‘নতুন’ কাজগুলো সাধারণত কম মজুরির ও নিম্নমানের হবে। অন্যদিকে বৃদ্ধি পাবে বেতনবৈষম্য। কেননা শ্রমবাজারে দক্ষ ও মেধাবীদের নিয়োগ ঘিরে উচ্চ প্রতিযোগিতা থাকবে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশের তরুণ ও কর্মসংস্থানহীনদের নিয়ে চিন্তিত হতে হয়।
আমরা দেখি যে যুদ্ধপরবর্তী আশির দশকে জার্মানিতে আত্মহত্যার হার চরমে পৌঁছে। পরের তিন দশকে তা কমে অর্ধেক হয়ে আসে মানসিক চিকিত্সা-সংক্রান্ত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণের ফলে। মানসিক রোগের হাসপাতাল ও চিকিত্সাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ওষুধপত্রের প্রভূত উন্নতি আর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা বৃদ্ধির মাধ্যমে তারা মানুষের হতাশা ও অবসাদগ্রস্ততা কমিয়ে আনতে পেরেছিল। কিন্তু ২০০৭ সাল থেকে দেশটিতে আত্মহত্যার হার আবার বাড়তে থাকে। কেননা ২০০৭-এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের ওপর যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে তার উত্তাপ অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশের পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের গায়েও লাগে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের তথ্যমতে, ধনী দেশের মানুষদের ডিপ্রেশনের ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে ওই বৈশ্বিক মন্দা-পরবর্তী সময়ের পর থেকে। এমনকি ২০০৭ সাল-পরবর্তী ১০ বছরে দেশগুলোতে এ হার দ্বিগুণ হয়েছে। এক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে ছিল আইসল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। অর্থনৈতিক মন্দা-পরবর্তী প্রায় পাঁচ বছর পরও আইসল্যান্ডের ১০ শতাংশ মানুষ মেজাজ প্রফুল্ল রাখার জন্য ওষুধ সেবন করেছে। অথচ ২০০০ সালে অর্থাৎ বৈশ্বিক মন্দার আগে এ হার ছিল ৭ শতাংশ।
গবেষণা তথ্য বলছে, সারা বিশ্বেই করোনার সময় মানসিক বিষণ্নতাসহ মানসিক রোগ বেড়েছে তিন থেকে পাঁচ গুণ। আমাদের তাই মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাসম্পর্কিত প্রস্তুতি ও কর্মসূচি গ্রহণে জোর দিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে যেমন বিভিন্ন সুরক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি, তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করছেন, এমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে পরিকল্পনা নিয়ে কাজে নামতে হবে। সবার আগে জরুরি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কর্মসৃজন, আর্থিক সমর্থন ও প্রশিক্ষণের মতো বিষয়গুলোকে জোর দিয়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সৃষ্টির প্রক্রিয়াগুলোকে যেমন ত্বরান্বিত করা জরুরি, তেমনি মানসিক চিকিত্সা-সংক্রান্ত সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। যেমনটা জার্মানি করেছিল।
লেখক: সাংবাদিক









