আমি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক। প্রায় ৪০ বছর ধরে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াচ্ছি। ফলে ভবনের নিরাপত্তার বিষয়টিতেই গুরুত্ব দেব। বিশেষ করে এক্ষেত্রে ঘাটতিগুলো কোথায়, সে বিষয়ে আলোকপাত করব।
একটি ভবন নিরাপদ কিনা তা আপাতদৃষ্টিতে বোঝার উপায় নেই। ঢাকা শহরে প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে। এসব ভবন কীভাবে নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর সঠিক নকশা ছিল কিনা—এসব বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমরা এসব নিয়ে আলোচনা শুনি, কিন্তু এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারিনি, যেখানে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে আমাদের ভবনগুলো নিরাপদ।
একটি ভবন নিরাপদ হবে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য দুটি মৌলিক বিষয় প্রয়োজন। প্রথমটি হলো সঠিক নকশা এবং দ্বিতীয়টি হলো নির্মাণকালীন তদারকি ব্যবস্থা।
সৌভাগ্যবশত, ১৯৯৩ সালে আমরা একটি ভালো বিল্ডিং কোড পেয়েছি। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালে সেটি হালনাগাদ করা হয়েছে। সরকার আবারো বিল্ডিং কোড নবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত বিল্ডিং কোড হলো একটি নির্দেশিকা, যা অনুসরণ করে ভবন নির্মাণ করা হলে সেগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
তবে আমরা এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারিনি, যেখানে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আজ যে ভবনটি নির্মিত হচ্ছে, সেটি নিরাপদ হবে। এর অন্যতম কারণ, আমাদের কার্যকর নির্মাণকালীন তদারকি ব্যবস্থা নেই।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা এরই মধ্যে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিট ব্যবস্থার আওতায় প্রকৌশলীদের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালার আওতায়ও কিছু প্রকৌশলীর নিবন্ধন হয়েছে। ফলে একটি বিষয়ে আমরা আশ্বস্ত হতে পারি—আমাদের একটি ভালো বিল্ডিং কোড রয়েছে এবং দক্ষ পেশাজীবীরা নকশা প্রণয়ন করলে তা মোটামুটি মানসম্মত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
কিন্তু পরবর্তী ধাপ, অর্থাৎ ভবন নির্মাণের সময় মান ও নিরাপত্তা তদারকির যে ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, সেটি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অনেক বড় ডেভেলপার নিশ্চয়ই জানে, তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনেকে মান নিয়ন্ত্রণ (কোয়ালিটি কন্ট্রোল) ও মান নিশ্চিতকরণের (কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স) ব্যবস্থা বজায় রাখেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সারা দেশে ভবন নির্মাণের মান ও নিরাপত্তা তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
১৯৯৩ সালের বিল্ডিং কোডে এবং পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের কোডেও বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি নামে একটি তদারকি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার কথা ছিল। দীর্ঘদিন এটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান সরকার আইনগতভাবে এ কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু গত ছয় মাসেও এ বিষয়ে খুব বেশি অগ্রগতি হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। এখনো নিয়োগ হয়নি, কর্তৃপক্ষের বাজেট নেই, এমনকি কোন কাঠামোর অধীনে এটি কাজ করবে, সেটিও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর কাছে আমার অনুরোধ, বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করবেন। কারণ নির্মাণকালীন তদারকির জায়গায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আমরা যদি এ দায়িত্ব পুরোপুরি ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর ছেড়ে দিই, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছা সম্ভব হবে না।
বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটিতে দক্ষ পেশাজীবী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। শুধু প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভর না করে প্রকৌশল ও নির্মাণ খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রকৌশলী ও স্থপতিদেরও যুক্ত করতে হবে।
প্রতিটি নির্দিষ্ট ভবনের নির্মাণকাজ কীভাবে তদারকি করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন থাকতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা ভবনের নিরাপত্তা ও নির্মাণমান যাচাই করে প্রত্যয়ন করবেন। এরপর অকুপেন্সি সার্টিফিকেট বা ভবন ব্যবহারের সনদ দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় সনদও যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এ সমন্বিত ব্যবস্থা কার্যকর করতে না পারলে আমরা সামনে এগোতে পারব না।
ইতিবাচক দিক হলো, এখন বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না। এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিধিমালা প্রণয়ন, সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি, জনবল নিয়োগ এবং বাজেট বরাদ্দের মতো কাজগুলো সম্পন্ন করতে হবে। এগুলো খুব সহজ কাজ নয়। আমার মনে হয় না, আগামী ছয়-সাত মাসের মধ্যে সবকিছু সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তবে আমরা আশা করি, মন্ত্রী মহোদয় বিশেষ উদ্যোগ নেবেন। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী দুই বছরের মধ্যে যদি আমরা একটি কার্যকর অবস্থানে পৌঁছতে পারি, তাহলে এ সরকারের মেয়াদকালেই এমন একটি পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব হবে, যখন আমরা বলতে পারব—এরপর বাংলাদেশে নির্মিত ভবনগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
নতুন ভবনের পাশাপাশি বিদ্যমান ভবনগুলোর বিষয়েও আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। দেশে বিপুলসংখ্যক ভবন এরই মধ্যে নির্মিত হয়েছে। এসব ভবন নিরাপদ কিনা তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমাদের বিল্ডিং কোডে ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ভবন নির্মাণের নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমাদের ভবনগুলো কতটা নিরাপদ, সেটি যাচাই করা জরুরি।
গত বছরের নভেম্বরে একটি মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও আমাদের বেশকিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ১০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের স্বল্প বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পে সাধারণত এমন পরিস্থিতি হওয়ার কথা নয়। এর চেয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে।
দুর্যোগের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আমি যাচ্ছি না। তবে সরকারি দায়িত্বে নিয়োজিত নীতিনির্ধারকদের কাছে আমার অনুরোধ, বিদ্যমান ভবনগুলোর নিরাপত্তা মূল্যায়নের জন্য একটি পদ্ধতিগত ও কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করুন।
আমাদের আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। এ সময়ের মধ্যে বিদ্যমান ভবনগুলোর নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে একটি তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। কোন ভবন নিরাপদ, কোন ভবনে রেট্রোফিটিং বা কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন এবং কোন ভবন ভেঙে ফেলতে হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত থাকতে হবে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের হাতে বিদ্যমান ভবনগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র থাকা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে আমি বলতে চাই, সরকার বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটিকে কার্যকর করতে হবে। এটি যেন শুধু আইন বা সরকারি ফাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাস্তবে এর কার্যক্রম শুরু করতে হবে এবং ভবনের নকশা থেকে শুরু করে নির্মাণ ও ব্যবহার পর্যন্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
আগামী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যও নিরাপদ অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি মন্ত্রী মহোদয়সহ উপস্থিত সবাই জানেন। এর একটি ভালো উদাহরণ হলো আমাদের তৈরি পোশাক খাত।
রানা প্লাজা ধস ও তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের সময় তৈরি পোশাক খাত যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে এ খাতের অনেক কারখানা ভবনের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নত হয়েছে। ফলে এ খাতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমরা একটি ইতিবাচক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগ সারা দেশের ভবন নির্মাণ এবং সামগ্রিক অবকাঠামো খাতে প্রয়োগ করতে হবে। শুধু তৈরি পোশাক খাত নয়, দেশের সব ধরনের ভবন ও স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই আমরা একটি নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলার পথে এগোতে পারব।
ড. ইশতিয়াক আহমেদ: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট
[বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট সিটি কনক্লেভ ২০২৬-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]









