বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের ও বহুমাত্রিক। উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্য দিয়ে যে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি সহযোগিতার দিকে এগিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের মধ্য দিয়ে এ সম্পর্ক আরো শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এরই মধ্যে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো ও আইসিটি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে এ সম্ভাবনার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। সম্ভাব্য এ বিনিয়োগ দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে পারলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো এর বাস্তবায়নে।
বাংলাদেশের জন্য জাপানি বিনিয়োগের গুরুত্ব শুধু বৈদেশিক মূলধন প্রবাহে নয়। বিনিয়োগের সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনশীলতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের শিল্পায়ন এখন এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে কম খরচের শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর ও উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। এক্ষেত্রে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।
অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি উৎপাদন শিল্পে জাপানি কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মতো খাতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। এতে স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমানো ও রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জাপানি কোম্পানির সরবরাহকারী নেটওয়ার্কে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
মাতারবাড়ীকে ঘিরে অবকাঠামো উন্নয়নের সম্ভাবনাও এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। গভীর সমুদ্রবন্দরটি শুধু বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো যাবে না। উন্নত সড়ক, রেল ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার সঙ্গে বন্দরকে যুক্ত করে আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সংযোগের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ, অবকাঠামোগত সক্ষমতা ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। এলএনজি অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জাপানি বিনিয়োগ এ খাতে সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, জ্বালানি ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। জাপানি অংশীদারত্বের মাধ্যমে দক্ষ প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও সহযোগিতার পরিসর বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্কের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে জাপানি কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও দক্ষ তরুণদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ইলেকট্রনিকসের মতো খাতে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করা গেলে এর সুফল বিনিয়োগের বাইরেও বিস্তৃত হবে। মহাকাশ প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলেও জাপানের সক্ষমতা কাজে লাগানো যেতে পারে। বড় বিনিয়োগের আলোচনা টেকসই করতে হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীর জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, জমি ও ইউটিলিটি সুবিধা নিশ্চিত করা, কর ও শুল্ক ব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের জটিলতা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতা ও বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা বিনিয়োগকারীর আস্থা বাড়াবে। সম্ভাব্য জাপানি বিনিয়োগের জন্য আলাদা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সমঝোতা বা ঘোষণা করার পর প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
বিনিয়োগের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। জাপান থেকে আমদানি বাড়ার বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে রফতানি বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি না হলে অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সুফল সীমিত থাকবে। তৈরি পোশাকের বাইরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হালকা প্রকৌশল পণ্য এবং আইসিটি সেবার মতো খাতে জাপানের বাজারে প্রবেশ বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। এজন্য পণ্যের মান, উৎপাদন সক্ষমতা, প্যাকেজিং, সনদ ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে।
আসন্ন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। শুল্ক সুবিধা পাওয়া গেলেই রফতানি বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই। জাপানি বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা, অশুল্ক বাধা মোকাবেলা এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করার প্রস্তুতি এখন থেকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে ইপিএর ফলে প্রতিযোগিতা বাড়লে স্থানীয় শিল্প যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও নীতিগত প্রস্তুতি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। সম্ভাব্য ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে শুধু বিনিয়োগ আনার লক্ষ্য না রেখে প্রযুক্তি, দক্ষতা, উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিতে হবে। দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প চিহ্নিত করা, বিনিয়োগ পরিবেশের সংস্কার, স্থানীয় শিল্পকে জাপানি সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা এবং রফতানি বহুমুখীকরণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই জাপানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের আস্থার সম্পর্ক একটি শক্তিশালী, উৎপাদনমুখী ও পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে পরিণত হবে।









