নারী শিক্ষায় বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। পরিবার যেমন মেয়েদের শিক্ষায় অর্থ ব্যয় করছে, তেমনি সরকারও শিক্ষা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিচ্ছে ও বিনিয়োগ করছে। রাষ্ট্রের এ বিনিয়োগের উদ্দেশ্য শুধু শিক্ষিত নারী জনগোষ্ঠী তৈরি করা নয়। শিক্ষিত নারীদের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমবাজারের বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

দেশের উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫ শতাংশ নারী হলেও তাদের কর্মসংস্থানে উপস্থিতির হার উদ্বেগজনকভাবে কম। কেবল ৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত নারী শ্রমবাজারে রয়েছেন। তবে এর চেয়েও কিছু উদ্বেগজনক তথ্যও সংস্থাটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেটি হলো সামগ্রিকভাবে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের তুলনায় অর্ধেকেরও কম এবং মজুরিবৈষম্য প্রকট। আইএলও ছাড়াও নানা সময়ে বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে নারীরা মূলত কম মজুরি ও কম উৎপাদনশীল খাত এবং অবৈতনিক কাজে বেশি যুক্ত। এছাড়া শ্রমজীবী নারীদের বড় অংশ রয়েছেন অনানুষ্ঠানিক খাতে এবং ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে এ হার ১০ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে যে চিত্রটি দাঁড়াচ্ছে তা হলো শিক্ষায় অগ্রগতি হলেও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীরা পিছিয়ে আছেন। এর মূলে যেসব কারণ রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা না গেলে শ্রমবাজারের নারীদের অবস্থান পরিবর্তন হবে না। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব তা সবার আগে সরকারকে ভাবতে হবে। কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানেও উচ্চ পর্যায়ে নারীদের অংশহগ্রহণ সমতাপূর্ণ না, এমনকি সংবিধান সমর্থিতও না। তাছাড়া সরকার নারী শিক্ষায় নিজস্ব বিনিয়োগের সুফল কতটা চায়, সেটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন, একটি দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক যদি শিক্ষা গ্রহণের পরও শ্রমবাজারে পর্যাপ্তভাবে অংশ নিতে না পারে, তাহলে সেই দেশের মানবসম্পদের পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না। অথচ বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতির জন্য এটি আরো গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রমবাজারের বাইরে বা কম মজুরিভিত্তিক কাজে নিয়োজিত থাকার দায় মোটা দাগে নারীর নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা। বিয়ের পর নারীর প্রধান দায়িত্ব ঘর ও পরিবারের দেখভাল—এমন ধারণা এখনো সমাজে প্রবল। সন্তান লালন-পালন, বয়স্ক ও অসুস্থ পরিবারের সদস্যদের পরিচর্যা, রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজের বড় অংশ নারীকেই করতে হয়। এসব অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজে নারীর অবদানের মূল্য বছরে ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা বলে গত বছর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হাউজহোল্ড প্রডাকশন স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্টে (এইচপিএসএ) উল্লেখ করা হয়। আবার আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, শ্রমজীবী নারীরা সপ্তাহে গড়ে ২৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এ সময় ৭ দশমিক ৬ ঘণ্টা। বেতনভোগী ও গৃহস্থালি কাজ মিলিয়ে নারীরা সপ্তাহে গড়ে ৭৩ দশমিক ৭ ঘণ্টা কাজ করেন; পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৫৯ ঘণ্টা। এমন পরিস্থিতিতে যদি কোনো নারী কর্মক্ষেত্র ছেড়ে কেবল গৃহস্থালি কাজে মনোনিবেশ করেন তবে তাকে মোটেও দায় দেয়া যায় না। দ্বৈত পরিসরে কাজ করার ক্লান্তি ও চাপ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আবার সমাজের রক্ষণশীল একটা অংশ নারী শিক্ষার পক্ষে থাকলেও কর্মজীবনে নারীর প্রবেশকে খাটো করে দেখে, এমনকি পারিবারিকভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে নারীর কর্মসংস্থানে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়। অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ বেড়ে যায়।

তাই নারীর শিক্ষায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করতে হলে শুধু মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো যথেষ্ট নয়। শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবনে যাওয়া ও টিকে থাকার পথটিও মসৃণ হওয়া চাই। উচ্চশিক্ষিত নারীর জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি, দক্ষতার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার সমন্বয়, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে উচ্চ মজুরি ও উচ্চ দক্ষতার পেশায় নারীর অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যায় সেটি ভাবতে হবে। কারণ শিক্ষিত নারীদের যদি কেবল শ্রমবাজারের প্রান্তিক বা কম মজুরির কাজে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে উচ্চ শিক্ষায় বিনিয়োগের পূর্ণ সুফলও পাওয়া যাবে না। এছাড়া নারীরা যেন কাজের ন্যায্যমূল্য পান সেটা প্রতিনিয়ত তদারক করতে হবে। পাশাপাশি নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কীভাবে ইতিবাচক ও আচরণ সহনশীল রাখা যায় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। দেশে নারী ও শিশুদের ওপর যেভাবে সহিংতার পরিমাণ বাড়ছে তাতে তাদের নিজেদেরই কাজে নিয়োজিত হওয়ার উৎসাহে ভাটা পড়া অস্বাভাবিক হবে না।