বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন নারীরা। তৈরি পোশাক খাত (আরএমজি), কৃষি, রেমিট্যান্স থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। তবে ন্যায্য মজুরি প্রাপ্তি কিংবা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তায় এখনো অনেক পিছিয়ে তারা। জমির মালিকানা, কৃষি ও পরিবারে নারীর শ্রমের মূল্যায়ন না হওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে নারীর সামনে। আমরা নিম্ন আয়ের দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশের সারিতে উঠতে চাচ্ছি। কিন্তু সমাজের একটি অংশকে পিছিয়ে রেখে কোনো দেশের পক্ষে সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আজ ১৫ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে ‘প্রকৃতির যত্নে গ্রামীণ নারী কৃষক’। প্রতিপাদ্যটি প্রকৃতি সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই কৃষিতে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি তাদের অধিকার ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ স্বীকৃতিকে কার্যকর করতে হলে নারী কৃষকের ভূমির অধিকার, সমমজুরি, উৎপাদন উপকরণে প্রবেশাধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষির সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মাটির উর্বরতা রক্ষা, বীজ সংরক্ষণ, পানির সুষ্ঠু ব্যবহার, জীববৈচিত্র্য বজায় রাখা এবং খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এসব কাজে গ্রামীণ নারীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। অথচ কৃষি ও গৃহস্থালিতে তাদের শ্রমের বড় অংশই যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। উৎপাদনে অংশ নিলেও অনেক নারী কৃষক হিসেবে পরিচিতি পান না; জমির মালিকানা, কৃষি ঋণ, প্রশিক্ষণ, কৃষক কার্ড ও সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে থাকেন। ফলে যাদের শ্রমে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি সচল থাকে, সেই নারীরাই উৎপাদনের প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

জাতিসংঘ ২০২৬ সালকে আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ ঘোষণা করেছে। এর লক্ষ্য কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় নারীর অবদানকে দৃশ্যমান করা, নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানো এবং নারী কৃষকের জন্য ভূমি, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও কৃষিসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানো। এ উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও উৎপাদন সম্পদে অধিকার একই হারে বাড়েনি। উত্তরাধিকার সূত্রে জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য, পারিবারিক সিদ্ধান্তে সীমিত কর্তৃত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পেতে জটিলতা তাদের অবস্থান দুর্বল করে। জমির মালিকানা না থাকলে অনেক ক্ষেত্রে কৃষি ঋণ, ভর্তুকি কিংবা কৃষি কার্ডের মতো সহায়তা পাওয়াও কঠিন হয়। ফলে উৎপাদনের ঝুঁকি ও শ্রমের বোঝা বহন করলেও কৃষি থেকে অর্জিত সুবিধার সমান অংশীদার হতে পারেন না তারা।

এ বৈষম্যের আরেকটি দিক মজুরি। গ্রামীণ নারী শ্রমিকরা পুরুষের সমপরিমাণ বা কাছাকাছি শ্রম দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে কম মজুরি পান। কৃষির পাশাপাশি বীজ বাছাই, ফসল শুকানো, সংরক্ষণ, গবাদিপশু পালন ও বিপণনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের শ্রম প্রয়োজন হলেও এসব কাজের সবটুকু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে রান্না, সন্তান লালন-পালন, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তির পরিচর্যার মতো অবৈতনিক কাজ। ফলে নারীর কর্মদিবস দীর্ঘ হলেও তার আয় ও সামাজিক স্বীকৃতি সীমিত থাকে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব পরিমাপ এবং নীতিনির্ধারণে তার প্রতিফলন জরুরি।

প্রকৃতি সংরক্ষণে নারীর ভূমিকা স্বীকার করার অর্থ শুধু তাদের পরিবেশবান্ধব কাজের প্রশংসা করা নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, তাপপ্রবাহ, বন্যা ও খরার অভিঘাত কৃষিকে ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এসব সংকটে সম্পদ ও আর্থিক সক্ষমতা সীমিত থাকা নারীরা বাড়তি ঝুঁকিতে পড়েন। তাই জলবায়ু সহনশীল বীজ, পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি, কৃষি বীমা, প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনে নারী কৃষকের প্রয়োজনকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় ও দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে কৃষিনীতি প্রণয়নে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, কৃষকের সরকারি সংজ্ঞা ও নিবন্ধন ব্যবস্থায় জমির মালিকানার পাশাপাশি বাস্তবে কৃষিকাজে নিয়োজিত নারীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কৃষক কার্ড, ভর্তুকি, ঋণ, বীজ ও প্রযুক্তিসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নারী কৃষকের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, উত্তরাধিকার ও ভূমিতে নারীর আইনগত অধিকার বাস্তবায়ন এবং খাসজমি বন্দোবস্তে যোগ্য ভূমিহীন নারী কৃষককে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে নারী উৎপাদকদের সমবায়, স্থানীয় সংগ্রহ কেন্দ্র ও বাজার সংযোগের সুযোগ বাড়াতে হবে। জামানতমুক্ত বা সহজ শর্তের ঋণ এবং কৃষিবিষয়ক পরামর্শ সেবা তাদের কাছে পৌঁছানোও জরুরি।

প্রকৃতির যত্নে গ্রামীণ নারী কৃষকের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে হলে তাদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য, সম্পদে অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে কৃষির সহায়ক শ্রমশক্তি হিসেবে দেখার পরিবর্তে স্বতন্ত্র কৃষক ও উৎপাদন ব্যবস্থার অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াই এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবসের প্রতিপাদ্য তাই আনুষ্ঠানিক উদযাপনে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর নীতি, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জবাবদিহির ভিত্তি হয়ে উঠুক। নারী কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে কৃষি আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে, প্রকৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ শক্তিশালী হবে এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও অধিক টেকসই ভিত্তি পাবে।