প্রকৃতির মতো সুসমন্বিত কী আছে। যদিও মানবকেন্দ্রিক এ বিশ্বে প্রকৃতিকে দেখা হয় মানুষের ভালো-মন্দের নিরিখে। আবার বিশেষ বিশেষভাবে দেখার কারণে সামগ্রিক পরিস্থিতি আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়। পার্থেনিয়াম নামের আগাছার পরিচয় থেকে আলাপ এগোয় নির্মূলের দিকে। কিন্তু আগাছার চেয়ে ‘নির্মূলের’ ধারণাই ক্ষতিকারক। এমন নয় যে আগাছা পরিষ্কার করব না। তবে প্রকৃতিতে তার ভূমিকাও দেখে নেয়া দরকার। 

প্রকৃতিতে যখন বিশেষ প্রাণ বা সত্তা নিয়ে আলোচনা তোলা হয়, তার সঙ্গে বিশেষ স্থান ও কালের বৈশিষ্ট্য জড়িয়ে থাকে। সে হিসেবে কোনো প্রাণ এককভাবে খারাপ বা ভালো নয়। বরং বাস্তুসংস্থানে তার নিজস্ব গুণাগুণ ও অবস্থানের আলাদা মূল্য থাকে। কোনো একটি পরিসরে কোনো গুণ প্রকট হয়ে ওঠে। সে বিবেচনা রাখলে প্রাণ-প্রকৃতির ওপর খবরদারির চেয়ে আমানতদারি বেশি চোখে পড়বে। 

সম্প্রতি পার্থেনিয়াম নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয় বণিক বার্তায়। যেখান থেকে জানা যায়, এটি আক্রমণাত্মক ও একবর্ষজীবী বীরুৎ উদ্ভিদ। উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার সাব-ট্রপিক্যাল অঞ্চল, মেক্সিকো ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এর উৎপত্তি। এখন পর্যন্ত পাঁচটি মহাদেশ ও অসংখ্য দ্বীপসহ বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বিষাক্ত এ আগাছা। 

বাংলাদেশে নাকফুল নামে পরিচিত আগাছাটি গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিপাত ৫০০ মিলিমিটারের ওপরে হলে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর অভিযোজন ক্ষমতা অসাধারণ। সহজে অন্য প্রতিযোগীকে সরিয়ে দিতে পারে। অধিক বীজ উৎপাদনে সক্ষম, মাটির নিচে বীজের দীর্ঘায়ু, ছোট ও হালকা বীজ যা বহু দূরত্বে ভ্রমণে সক্ষম। সব মিলিয়ে আগ্রাসী হয়ে ওঠার সব গুণাগুণ বিদ্যমান। আশঙ্কার বিষয় হলো আলু, টমেটো ও গম খেতে তুলনামূলক কম হলেও প্রায় সব ফসলে এর নেতিবাচক ভূমিকা রয়েছে, এটি উৎপাদন কমিয়ে দেয়। 

প্রশ্ন উঠেছে, এ ধরনের আগ্রাসী একটি উদ্ভিদ সাগর-মহাসাগর পেরিয়ে বাংলাদেশে কীভাবে এল। এ নিয়ে বিস্তৃত কোনো গবেষণা না থাকলেও বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এর প্রাদুর্ভাব বেশি। যা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের মধ্যবর্তী অংশেও। ভারতীয় বাংলা পত্রিকায় পার্থেনিয়াম নিয়ে কিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সে হিসেবে বায়ুর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্যতিক্রম কোনো ঘটনা নয়। 

প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে দুই দশক আগেও বিষাক্ত আগাছা পার্থেনিয়ামের অস্তিত্ব ছিল না। প্রতিবেশী ভারত থেকে বছর কয়েক আগেই এটি উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। এখন সীমান্তঘেঁষা অন্তত ৩৫টি জেলার ২৫ ধরনের ফসলের খেতে বিস্তার ঘটেছে উদ্বেগজনক এ আগাছার। আরেকটি উৎস বলছে, পাথরবাহী ট্রাকের মাধ্যমে ভারত থেকে ঢুকে পড়েছে। যদি এমনই হয়, তবে শুধু পার্থেনিয়াম নয়, আরো অনেক কিছু ঢুকে পড়তে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিকূল উদ্ভিদ সেধে আনার উদাহরণও রয়েছে। শৌখিন উদ্ভিদের কথা বাদ দিলেও আমাদের পরিচিত উদাহরণ ইউক্যালিপটাসকে এড়িয়ে যেতে পারি না। ১৯৮০-এর দশকে সবুজায়নের নামে দেশের কৃষিজমির আল, প্রাকৃতিক বন কেটে কৃত্রিম বনায়ন, রাস্তার ধার সব জায়গায় এই বিস্তার ঘটেছে। সেই ক্ষতি নির্ধারণ ও পদক্ষেপের জন্য কেটে গেছে কয়েকটি দশক। 

এ ধরনের অনাত্মীয় উদ্ভিদ বায়ো-উইপেনও হতে পারে। এই অনির্ধারিত ক্ষতি অপ্রচলিত যুদ্ধ ব্যবস্থাকে মনে করিয়ে দেয়। তবে সেই আলাপের বাইরে যা বলা যেতে পারে, পরিবেশ একক কোনো বিষয় নয়। এর যেকোনো ক্ষতি অপরাপর বাস্তুসংস্থানে প্রভাব ফেলে। পার্থেনিয়ামের আবির্ভাবের ক্ষতিকারক দিকের বাইরে এর সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিবাচক আলাপ চোখে পড়ে না। সে হিসেবে প্রশ্নটাই স্বাভাবিক যে এই আগ্রাসন কীভাবে থামানো যায়। বিদেশী প্রাণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক আলাপ হলো, যথাযথ কোয়ারেন্টাইন অনুসরণ করে বিদেশী গাছপালা আনতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এর ইতি-নেতিবাচক দিকগুলো নির্ধারণ করতে হবে। কিন্তু পার্থেনিয়ামের মতো উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভবও নয়। যদি বায়ুর মাধ্যমে ছড়ায়, তবে তা রোধ করা মানে বায়ুপ্রবাহ রোধ করা। তবে পণ্য আনা-নেয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা মাথায় রাখতে হবে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। 

রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় এ আগাছা দমনের কথাও উঠেছে। বিশ্লেষজ্ঞরা বলছেন, ফুল আসার আগে গ্লাইফোসেট নামক আগাছানাশক প্রতি লিটার পানিতে ১০-১৫ মিলিলিটার মিশিয়ে স্প্রে করে এ আগাছা দমন করা সম্ভব। সাধারণ লবণের ১৫-২০ শতাংশ দ্রবণ অর্থাৎ প্রতি লিটার পানিতে ২০ গ্রাম মিশিয়ে স্প্রে করে পার্থেনিয়াম দমন করা যায়। কিন্তু প্রাকৃতিক কৃষির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বরাবরই রাসায়নিক ব্যবহার করে আগাছা ও বালাই দমন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। কারণ রাসায়নিকের ব্যবহারের কারণে অন্য প্রাণ, পরিবেশ ও মানবদেহে ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। গ্লাইফোসেট বা লবণের ব্যবহারে তাদের আপত্তি কম নয়। পরিবেশগত ক্ষতি বাদ দিলেও গ্লাইফোসেটের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। আবার লবণের ব্যবহার বাড়িয়ে দিতে পারে জমির লবণাক্ততা, যা ফসল উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। আবার এ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের সঙ্গে মানুষের ধ্বংসাত্মক ও অতি ব্যবসায়ীকরণের প্রবণতাও যুক্ত।

যেকোনো ধরনের আগাছা ধ্বংসের আগে এর সঙ্গে পরিবেশের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা উচিত। সেখানে খুবই সাধারণ বিষয় হলো উদ্ভিদটি পচিয়ে ফেলে সার হিসেবে ব্যবহার। পার্থেনিয়ামের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। তবে ফল হওয়ার আগেই ধ্বংস করতে হবে। নইলে ফলে থাকা বীজ থেকে আবারো ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আমাদের আলোচনার শুরুটি ছিল প্রকৃতিতে কোনো প্রাণের উপস্থিতির অর্থ আসলে কী। যেখানে কোনো কিছু শুধু ক্ষতিকারক দিক নিয়ে আবির্ভূত হয় না। পার্থেনিয়ামের আলাপে জানা যায়, পরিবেশ থেকে ভারী ধাতু ও রঞ্জক অপসারণে এর ভূমিকা রয়েছে। বাণিজ্যিক এনজাইম ও বায়োগ্যাস উৎপাদনে এটি ব্যবহার করা যায়। এমনকি বায়োপেস্টিসাইড হিসেবেও ভূমিকা রয়েছে। তবে ক্ষতিকারক দিক বিবেচনায় এ আলোচনাগুলো উহ্যই থাকে। 

সায়েন্স অ্যালার্ট সাইটে কৃষিতে পার্থেনিয়ামের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখেছেন প্রেম কিশোর, এ কে ঘোষ, বি আর মৌর্য ও সুরেন্দ্র সিং। ‘পার্থেনিয়াম ব্যবস্থাপনা শতাব্দীর একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে থাকবে’ উল্লেখ করে তারা বলেন, পার্থেনিয়াম একটি সবুজ সার, কম্পোস্ট, জৈব নিয়ন্ত্রণ ও মাটির উন্নতি ঘটাতে পারে যা মাটির ভৌত, রাসায়নিক এবং জৈবিক বৈশিষ্ট্যকে উন্নত করতে পারে। এটি সহজেই গ্রহণ করা যায় এমন ম্যাক্রো-পুষ্টির উৎস। মাটিতে পার্থেনিয়ামের সমন্বিত ব্যবহার মাটির ভৌত রাসায়নিক, জৈবিক ও পুষ্টিগুণ পরিবর্তন করে। মাটির স্বাস্থ্য ও ফসলের কর্মক্ষমতা পরিবর্তনে এর কার্যকারিতার কারণে কৃষিতে পার্থেনিয়ামের প্রচুর সম্ভাবনা দেখতে পান এ গবেষকরা। তারা বলছেন, পার্থেনিয়ামে থাকা কম্পোস্ট উপাদান ফলন বাড়ায়। গত দুই দশকের অসংখ্য গবেষণার একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা এ গবেষণায় স্থান পেয়েছে, যা পদ্ধতিগতভাবে কৃষিতে পার্থেনিয়ামের ব্যবহার সম্পর্কে গুরুত্ব, সুযোগ ও আশঙ্কা তুলে ধরে। বোঝা যায়, পার্থেনিয়াম নিয়ে সচরাচর যে আলোচনা তার বাইরে আরো অনুল্লেখ দিক থাকে। আমরা কেন সেই আলাপগুলো তুলিনি, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। সেটাই হলো প্রাণ-প্রকৃতিকে দেখা ও তার যত্ন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির অদূরদর্শিতা।

পার্থেনিয়াম সম্পর্কে এ আলোচনা অবশ্যই কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত নয়। কিন্তু কোনো কিছুকে আগ্রাসন হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে এর সব ভূমিকা যাতে আমরা খতিয়ে দেখতে পারি, সে দিকটি মনে করিয়ে দেয়া।

ওয়াহিদ সুজন: সাংবাদিক