দিনক্ষণ মিলিয়ে আজ থেকে ঠিক ৩২১ বছর আগে স্কটল্যান্ড থেকে পশমের মোজা, কম্বল, পরচুল, পবিত্র গ্রন্থ বাইবেল, ২৫ হাজার জোড়া চামড়ার জুতাসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে একে একে পাঁচটি জাহাজ পানামার পথে যাত্রা করে। উল্লেখ্য, জাহাজে নাকি ছাপাখানাও বসানো হয়েছিল, যা স্থাপনের উদ্দেশ্য প্রায় ১ হাজার ২০০ উপনিবেশ চুক্তির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো লিখিত আকারে ছাপানো। যদিও জাহাজে এমন আয়োজনের পরিসর বের করতে খাদ্যদ্রব্য ও কৃষিজাতীয় পণ্যসামগ্রী মজুদের পরিমাণ কমিয়ে ফেলতে হয়েছিল।
যাহোক, জাহাজগুলোর গন্তব্য ছিল পানামার দারিয়েন অঞ্চলে। কোম্পানি অব স্কটল্যান্ডের উদ্দেশ্য ওই অঞ্চলে একটি বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলা, যার মাধ্যমে ইস্টমাসের পাশাপাশি মহাসাগরের অন্যান্য অংশের সঙ্গে এক ধরনের যোগাযোগ তৈরি সম্ভব হবে। তাছাড়া দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী পরিস্থিতির মোকাবেলার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরির উপায় হিসেবে বাণিজ্যকেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনাটি তখন স্কটল্যান্ডের বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষকদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধারণা করা হয়, স্কটল্যান্ডের মোট অর্থের এক-চতুর্থাংশ থেকে শুরু করে প্রায় দেড় শতাংশ পরিমাণ এ কর্মযজ্ঞে বিনিয়োগ করা হয়েছিল।
তবে প্রত্যাশার ধারেকাছেও প্রাপ্তি লাভ হয়নি। নতুন জায়গায় বসতি স্থাপনের পরপরই হলুদ জ্বর আর ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ঔপনিবেশিকদের বেশির ভাগই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। স্কটিশ বসতি স্থাপনকারীদের ডায়েরি, চিঠি এবং অন্যান্য তথ্যমতে, মশাবাহিত রোগের ফলে ম্যালেরিয়া জ্বরে ভুগেই তাদের বেশির ভাগের মৃত্যু হয়। বসতি স্থাপনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে প্রায় অর্ধেক স্কটিশ সেটেলারের একই পরিণতি ঘটে। এ অবস্থায় আক্রান্তদের মধ্যে যারা খুব রুগ্ণ এবং চলাচলের অনুপযোগী, তাদের সৈকতে ফেলে রেখেই বাকিরা জাহাজে চড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। তবে তাতেও রেহাই মেলে না। সেখানেও দলে দলে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করে। উদ্ধারকারী জাহাজটি যখন দারিয়েনে গিয়ে পৌঁছে, তখন জুতার সারি, পরচুল, চিরুনি আর শূন্য ছাপাখানা ছাড়া জীবিত কোনো মানুষের অস্তিত্ব ছিল না। ব্যর্থ অভিযানের দুর্বহ ঋণের ভার শেষ পর্যন্ত অনিচ্ছুক স্কটিশদের ইংল্যান্ডের সঙ্গে একীভূতকরণে বাধ্য করেছিল। ঘটনাটিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, দারিয়েনের অপ্রতিরোধ্য মশা অপ্রত্যাশিতভাবে গ্রেট ব্রিটেনের জন্মের ছক এঁকে দিয়েছিল।
আরো বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, গ্রহাণুুর আঘাতে ডাইনোসরের প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার আগেই মশা থেকে সৃষ্ট রোগে তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছিল। প্রাগৈতিহাসিক আফ্রিকায় মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি কিংবা প্রাচীন গ্রিক ও রোমানদেরও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি জানা যায়। গ্রিক চিকিৎসাবিদ হিপোক্রেটস ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধির সময়টাকে ‘ডগ ডেস অব সামার’ নামে অভিহিত করেছিলেন। ৯৪ খ্রিস্টপূর্ব আগে চীনা ঐতিহাসিক সিমা কিয়ান লিখে গেছেন, ‘দক্ষিণ ইয়াংজির সমতলটা তুলনামূলক নিচু এবং আবহাওয়াটাও স্যাঁতসেঁতে। এখানে পুরুষরা যুবক বয়সেই মারা যায়।’ শুধু এই নয়, তৃতীয় শতাব্দীতে ম্যালেরিয়া মহামারী মানুষকে একটি বিশ্বাস আঁকড়ে ধরতে সাহায্য করেছিল; অসুস্থদের সেবা করা, যত্ন নেয়ার বিষয়গুলোকে জোর দেয়ার মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায় কিংবা বলা যায় বিষয়টি খ্রিষ্টধর্মকে নবরূপ দান করে।
বহুযুগ আগে মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে যে মানুষটির মৃত্যু হয়েছিল, তিনি ছিলেন পশ্চিম ইতালির পন্তিনি মার্শেস এলাকার বাসিন্দা। সে সময় সেখানে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল এ জায়গাটিকে ‘মৃত্যুছায়ার উপত্যকা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। জার্মান এক মিশনারি জায়গাটি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ‘বসন্ত ঋতুতে এটি ঠিক স্বর্গের মতো, গ্রীষ্মে এটি নরক এবং শরত্কালে যা হাসপাতালে পরিণত হয়।’ কলম্বাসের যুগের আগে বেঁচে যাওয়া এক মায়ান ব্যক্তির মতে, ‘মৃত্যুর দুর্গন্ধ ছিল ভয়াবহ... আমাদের সবার পরিণতি একই। আমরা জন্মেছি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে।’
উনিশ শতকে এসে বিজ্ঞান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়, মশার মাধ্যমে ম্যালেরিয়া ছড়ায় বা মশা ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করে। তার আগ পর্যন্ত কিন্তু এ সম্পর্কে কারো ধারণাই ছিল না যে এভাবে আক্রান্ত হয়ে মানুষকে কেন মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। এর আগে মিয়াসমা থিয়োরি অনুযায়ী বিশ্বাস করা হতো, যেকোনো মহামারীর জন্য দায়ী অশুভ বাতাস। বাতাসে দুর্গন্ধযুক্ত পদার্থই মহামারী আনে। এ বাতাসে ভর করে ম্যালেরিয়া জ্বর ভেসে বেড়ায়। অতএব মহামারী আটকাতে হলে সবকিছুর প্রথমে পরিবেশ থেকে দুর্গন্ধের উৎসগুলো সরাতে হবে। মশার মতো ক্ষুদ্র পোকামাকড়গুলো যে আমাদের জীবনে এতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা বোধ করি কল্পনারও বাইরে ছিল।
পনেরো শতকের দিকে পানামায় স্কটিশদের কলোনি বসানোর আগে রোমানদের উপনিবেশ তৈরির চেষ্টাকেও রুখে দিয়েছিল ম্যালেরিয়ার প্রকোপ। আট হাজার রোমান সৈন্যের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মারা গিয়েছিল। মশার প্রকোপে ইতালি যাওয়ার পথে বিপর্যস্ত হতে হয়েছিল হানিবালের বাহিনীকে, চেঙ্গিস খানের সেনাবাহিনী দক্ষিণ ইউরোপ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় কিংবা এটি ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের পবিত্র ভূমি দখলের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় (ক্রুসেডারদের এক-তৃতীয়াংশ সদস্য ম্যালেরিয়ার আক্রান্ত হয়ে মারা যায়)।
মিসর ও সিরিয়ার প্রথম সুলতান সালাদিন থেকে শুরু করে নািস বাহিনী সরাসরি যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ক্ষুদ্র এ পতঙ্গের ব্যবহার করে। তবে সবচেয়ে বেশি নাটকীয়তার জন্ম হয়েছিল কলম্বাসের ‘নিউ ওয়ার্ল্ড’ আবিষ্কারের সময়। মশাবাহিত পুরনো ব্যাধি কলম্বাস ও তার সহযোগীদের হাত ধরে নতুন জায়গায়ও পৌঁছে যায়। কলম্বাসের আবিষ্কৃত নতুন দুনিয়া যে একেবারেই মশাশূন্য ছিল তা নয়। বিরক্তিকর মশার উপস্থিতি সেখানেও ছিল কিন্তু সেগুলো কোনো রোগের বাহক ছিল না। কিন্তু কলম্বাসের নতুন ভূখণ্ড আবিষ্কারের সঙ্গে তার জাহাজে করে যে কয়েকটি মশা এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছিল, তাদের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে যায়।
একটি জনগণনা থেকে জানা যায়, হিস্পানিওয়ালা (বর্তমানে হাইতি ও ডোমিনিকান রিপাবলিক) দ্বীপে কলম্বাসের পা রাখার মাত্র দুই দশক পর স্থানীয় টাইনো জনসংখ্যা যেখানে পাঁচ থেকে আট লাখের উপরে ছিল, তা মাত্র ২৬ হাজারে নেমে আসে। তথ্যমতে, স্মল পক্স, ইনফ্লুয়েঞ্জা, মশাবাহিত রোগের কারণে আমেরিকার ৯৫ লাখ আদিবাসীর মৃত্যু ঘটে। ইতিহাসবিদ টিমোথি সি. ওয়াইনগার্ডের অনুমান অনুসারে, শুধু মশাবাহিত রোগের ফলে ৫২ বিলিয়ন মানুষ মারা গেছে, যারা কিনা পৃথিবীর এ পর্যন্ত মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ৫০ বছরের মধ্যে বর্তমানের তুলনায় আরো এক বিলিয়ন মানুষ মশাবাহিত সংক্রমণের মুখোমুখি হতে পারে। যদিও বর্তমান ও আগামীর পরিস্থিতি মোকাবেলায় আমাদের প্রস্তুতি যে মোটেও নেই, তা চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি। নীতিনির্ধারক, প্রশাসন আর আমাদের নগরপিতাদের দীর্ঘদিনের উপেক্ষা, উদাসীনতার দায় মেটাতে সাধারণ মানুষের ত্রাহি দশা। এমন পরিস্থিতিতে যাবতীয় নির্লজ্জতা নিয়ে কেবল আমরাই বলতে পারি, ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই।’ বছরের পর বছর মশার বিস্তার রোধের কামান দাগার নাটক সাজিয়ে বলতে পারি, সিটি করপোরেশন তত্পর আছে! অথচ সাধারণ জনগণ জানে, কামানের ধোঁয়া মশার চক্রব্যূহ ভেদ করছে না। মশা মারার ওষুধ অকার্যকর জানার পরও বিষয়টি চেপে যাওয়া হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে মশা মারার ওষুধ নিয়ে ব্যবসা চলছে। এমন উপেক্ষা ও অবহেলার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হবে তা উপরের উদাহরণের সাহায্যে বোধ করি অনুমেয়।
আমাদের প্রশাসক, নীতিনির্ধারকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, রক্তচোষা মশা নিয়ে শঙ্কা, দুর্ভোগ কিংবা দুশ্চিন্তা মোটেই কমেনি। আফ্রিকা অঞ্চলে আজও আট লক্ষাধিক লোক মৃত্যুবরণ করে মশার কামড়ে। বিশ্বায়নের গতিশীলতা বিশ্বের মানুষকে যেমন কিছু সুযোগ-সুবিধা দান করেছে, তেমনি নতুন প্রজন্মের মশাবাহিত রোগ যেমন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া কিংবা জিকার বিস্তার ঘটিয়েছে। উল্লেখ্য, ডেঙ্গুর বয়স হাজার বছর হলেও জিকা ও চিকুনগুনিয়া শনাক্ত হয় ১৯৫২ সালে। শঙ্কার বিষয় হলো, জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তন মশাবাহিত রোগগুলোর বিস্তারলাভে সাহায্য করছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এ ধরনের জীবাণু ও রোগগুলো বিস্তারের জন্য উপযোগী পরিবেশ পাচ্ছে। তাই মশা মারতে কামান দাগানোর নাটক নয়, সত্যিকার অর্থে কাজে নামার বিকল্প নেই। আরো মনে রাখা জরুরি, গত বছরের তুলনায় এবার যেমন ডেঙ্গুর প্রকোপ ও ভয়াবহতা বেড়েছে, আগামীতে এর মাত্রা ক্রমে বৃদ্ধি পাবে বলেই চিকিৎসকরা ধারণা করছেন।
তাই এটি নিয়ন্ত্রণে কীভাবে কার্যকর অর্থে কাজে নামা যায়, গবেষক, চিকিৎসক, পরিবেশ বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনিয়ম, দুর্নীতির ফাঁকগুলো বন্ধ করা জরুরি। তাছাড়া ‘শিখতে গেলে ভুল হতে পারে’—এ অকেজো তত্ত্ব কপচানোর সুযোগ নেই। কেননা আপনারা যে জায়গায় অধিষ্ঠিত, সেখানে ভুল কর্মপন্থা, ভুল নীতি, অকার্যকর ওষুধ—এ ধরনের ‘ভুল’ গ্রহণের সুযোগ কম।
রুহিনা ফেরদৌস: সাংবাদিক









