দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ হলে এর প্রভাবে পড়ে প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে জনজীবন। বাংলাদেশের বর্তমান সামগ্রিক পরিস্থিতি এরই প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের তথ্যও একই বার্তা দিচ্ছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার ও দরিদ্রের সংখ্যা উভয়ই বাড়ছে। ২০২৫ সালের ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির নানা সূচকে কার্যত যে স্থরিবতা রয়েছে তারই ফলাফল এটি।

দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে পর্যাপ্ত উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইত্যাদি বিশেষ ভূমিকা রাখে। কারণ এগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব কমাতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সময়ের পরিক্রমায় দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার মতো প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গগুলোর পরিস্থিতি ক্রমেই নিম্নমুখী হয়েছে এবং এ প্রবণতা বজায় আছে। ফলে সংগত কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে মূল্যস্তর আরো স্ফীত হচ্ছে, বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। সব মিলিয়ে মানুষ দরিদ্র হচ্ছে এবং দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে বাস করছে।

দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সরকার নানা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করেছে। ভর্তুকি, ভাতার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাস্তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির তুলনায় এগুলোর পরিমাণ যথেষ্ট নয়। আবার প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি না পৌঁছার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি সরকারের দেয়া সুযোগ-সুবিধা পেতে গিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীরা নানা ভোগান্তিরও শিকার হচ্ছেন। সম্প্রতি ফ্যামিলি কার্ড করে দেয়ার কথা বলে এক বিধবার একটি কাগজে টিপসই নেয়া হয়েছিল। পরে তিনি জেনেছেন যে তার ‘বিয়ে হয়ে গেছে’—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। অর্থাৎ বহু প্রতারণা ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে।

বর্তমান পরিস্থিতিই যদি এমন হয়ে থাকে এবং ভবিষ্যতে আরো মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ে তাহলে কেবল সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেয়া যে যাবে না তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তার পরও সাময়িক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি হলো অর্থনীতির উৎপাদনশীল সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় বের করা। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করা। তা না হলে দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও জনজীবন দুটোই ধুঁকে ধুঁকে চলবে এবং ভবিষ্যৎ আরো নাজুক হয়ে উঠবে।

অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করতে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের স্থবিরতা কাটানো জরুরি। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিও ছিল প্রায় ২ শতাংশ। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, দুর্বল চাহিদা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা শিল্পের সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ ব্যাহত হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নীতির ধারাবাহিকতা, জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, ব্যাংক খাতে সুশাসন এবং ব্যবসা পরিচালনার বাধা দূর করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশেও সহজ অর্থায়ন ও নীতিসহায়তা প্রয়োজন।

বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখা জরুরি। শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেই দারিদ্র্য কমবে না, যদি সেই প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কাজের সুযোগ তৈরি করতে না পারে। শ্রমঘন শিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং সেবা খাতে নতুন কাজের সুযোগ তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কর্মসংস্থান বাড়লে পরিবারের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি ভোগ ও বাজারের চাহিদাও শক্তিশালী হবে, যা উৎপাদন ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে।

অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা কঠিন। খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় অদক্ষতা, বাজারে প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং জ্বালানি ব্যয় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। এসব সমস্যার সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা, নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ এবং অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সহায়তা যেন প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটি যাচাইয়ে জবাবদিহি বাড়ানো জরুরি।

সামাজিক সুরক্ষা মানুষের তাৎক্ষণিক দুর্দশা লাঘব করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল অর্থনীতি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান। সরকারের নীতি ও ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণে এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। সর্বোপরি দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রবণতা থামাতে হলে অর্থনীতির গতি ফেরানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এবং সামাজিক সুরক্ষার দুর্বলতা দূর করতে হবে। অন্যথায় প্রবৃদ্ধির সুফল সীমিত থাকবে, আর বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতেই থেকে যাবে।