উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উভয় বিবেচনায় দেশের অর্থনীতির অন্যতম খাত হলো কৃষি। কিন্তু এ খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির তুলনায় উৎপাদনশীলতা কম। এতে একদিকে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে খাতটিতে নিয়োজিতদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে না, যা দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির যুগে তাদেরকে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ফেলছে। এমনকি এ খাতে ছদ্ম বেকারত্বের হারও বেশি। যে কারণে কর্মে নিয়োজিত থাকলেও খাতটির উৎপাদনশীলতা কম।

গত কয়েক দশকে কৃষিতে কয়েক গুণ উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার অনুপাতে তা ন্যূনতম। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উৎপাদন বৃদ্ধি আর উৎপাদনশীলতা দুটি ভিন্ন বিষয়। কোনো খাত কতটা উৎপাদনশীলতা সেটি নির্ভর করে তার উৎপাদন সক্ষমতার ওপর। দেশের কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদন সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাড়েনি।

বর্তমান প্রযুক্তির যুগে বিভিন্ন দেশে স্বল্পসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে বেশি উৎপাদন করছে। কিন্তু দেশের অন্যতম শ্রমঘন খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষি। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ বর্তমানে কৃষি খাতে নিয়োজিত। কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে ৩ কোটি ৮ লাখ মানুষ। কিন্তু কৃষকপ্রতি উৎপাদনশীলতার হার তুলনামূলক কম। ভারতের কৃষি খাতে নিয়োজিতের হার ৪১ শতাংশের ঘরে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের কৃষি শ্রমিকপ্রতি বার্ষিক উৎপাদন মূল্য ছিল ১ হাজার ২৩৬ দশমিক ২২ ডলার, যেখানে ভারতে এ সংখ্যা ২ হাজার ১৫৯ ডলার। এমনকি পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশও এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে।

অর্থাৎ কৃষিতে বিপুল শ্রমশক্তি নিয়োজিত থাকার পরও কৃষকপ্রতি উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে। তবে এটি কেবল কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট সমস্যা নয়, শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় অনেক মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। ফলে কৃষিতে অতিরিক্ত শ্রমশক্তি বাড়ছে। কিন্তু কৃষির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে না। এর পেছনে বহুমাত্রিক কারণ অবশ্য রয়েছে।

দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে। এতে ভূমির ওপর চাপ পড়ছে। কৃষিজমির পরিমাণ ও পুষ্টিগুণ কমছে। আবার মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো কৃষিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাবে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার যখন বিপুল পরিমাণ উৎপাদন হয়, তখন তা হিমাগার ও সংরক্ষণের সুযোগের অভাবে নষ্ট হতে দেখা যায়। ফলে কৃষিতে শ্রমশক্তি থাকলেও সেটিকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো উৎপাদনশীলতা না বাড়লে ভবিষ্যতের বাড়তি খাদ্যচাহিদা পূরণে আমদানিনির্ভরতা বাড়তে পারে। বৈশ্বিক বাজারে মূল্য ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বিবেচনায় এটি খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আরো বড় ঝুঁকিপূর্ণ। যে কারণে উৎপাদনশীলতার সঙ্গে কৃষকের আয় ও দারিদ্র্যও সরাসরি যুক্ত।

একজন কৃষক একই জমি, সময় ও শ্রম ব্যবহার করে যদি বেশি মূল্য সৃষ্টি করতে পারেন, তাহলে তার আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে উৎপাদনশীলতা কম থাকলে উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমের তুলনায় আয় কমে যায়। এতে কৃষকের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সক্ষমতা সীমিত হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি প্রকট। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ফলে শুধু খাদ্যের জোগান বাড়বে না, গ্রামীণ অর্থনীতিতে আয় ও কর্মসংস্থানের গুণগত পরিবর্তনও আসতে পারে।

এক্ষেত্রে সীমিত জমি ও সম্পদ থেকে বেশি উৎপাদন পেতে হলে শ্রমের দক্ষতা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার—দুটিই প্রয়োজন। কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। জমি প্রস্তুত, বপন, সেচ, ফসল কাটা ও মাড়াইসহ বিভিন্ন কাজে যন্ত্রের ব্যবহার শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। কোন অঞ্চলে কোন প্রযুক্তি উপযোগী, ক্ষুদ্র কৃষকের পক্ষে সেটি কীভাবে সহজলভ্য করা যায় এবং যন্ত্র ব্যবহারের পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষতা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয়ও নীতি-কৌশলে বিবেচনা করতে হবে।

একই সঙ্গে উন্নত বীজ, সেচ, কৃষি উপকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির বিস্তার প্রয়োজন। কৃষকের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়াতে সরকারি সম্প্রসারণসেবা জোরদার করতে হবে। বেসরকারি খাতকেও এক্ষেত্রে যুক্ত করা যেতে পারে। কৃষিযন্ত্র ও প্রযুক্তির বাজার গড়ে তুলতে সহজ অর্থায়ন, সেবাভিত্তিক যন্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থা এবং কৃষক সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। এতে ছোট কৃষকরাও ব্যয়বহুল প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবেন। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে।

সর্বোপরি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা পূরণ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাস—কোনোটিই টেকসই হবে না। তাই কৃষিনীতি ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে এখন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রযুক্তি, দক্ষতা, অর্থায়ন, বাজার ও অবকাঠামো—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে কৃষির রূপান্তর ঘটাতে হবে। তাহলেই সীমিত সম্পদের দেশে খাদ্যনিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।