একটি রাষ্ট্র যখন ইন্টারনেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, তখন প্রকৃত অর্থে কী বন্ধ হয়? কেবল কয়েকটি ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মোবাইলের ডেটা সংযোগ? নাকি তার চেয়েও গভীরে, নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তি, মতপ্রকাশ, শিক্ষা, জীবিকা, সামাজিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের যে অদৃশ্য স্নায়ুতন্ত্র, তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাময়িকভাবে অচল হয়ে যায়? ডিজিটাল সভ্যতার এ সন্ধিক্ষণে প্রশ্নটি আর প্রযুক্তিগত নয়, এটি ক্রমে মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে।
একসময় ইন্টারনেট ছিল প্রযুক্তিগত বিস্ময়, পরে তা হয়ে উঠল যোগাযোগের মাধ্যম, আর আজ তা আধুনিক জীবনের অবকাঠামোগত পূর্বশর্ত। একজন শিক্ষার্থীর শ্রেণীকক্ষ, একজন রোগীর চিকিৎসা পরামর্শ, একজন ফ্রিল্যান্সারের কর্মক্ষেত্র, একজন উদ্যোক্তার বাজার, একজন সাংবাদিকের তথ্যভাণ্ডার, একজন নাগরিকের রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ, সবকিছুর সঙ্গে ইন্টারনেটের সম্পর্ক ক্রমেই নিবিড়তর হয়েছে। ফলে ইন্টারনেটের অনুপস্থিতি এখন কেবল সংযোগের অনুপস্থিতি নয়; বহু ক্ষেত্রে তা সুযোগের অনুপস্থিতি, অধিকারের কার্যকর প্রয়োগের অনুপস্থিতি এবং নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের ব্যাঘাত।
মানবাধিকারের আধুনিক ইতিহাসে অধিকারের ভাষা কখনই স্থির নয়। ১৯৪৮ সালে যখন সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (ইউডিএইচআর) গৃহীত হয়, তখন ইন্টারনেটের অস্তিত্ব কল্পনাতীত ছিল। ফলে ঘোষণাপত্রে ‘ইন্টারনেট’ শব্দটির অনুপস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু মানবাধিকারের কোনো অধিকারকে কেবল তার ঘোষণাকালীন প্রযুক্তিগত বাস্তবতার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখলে অধিকারের সর্বজনীনতার ধারণাটিই সংকুচিত হয়ে পড়ে। ইউডিএইচআরের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি ‘যেকোনো মাধ্যমের মাধ্যমে’ তথ্য ও ধারণা অনুসন্ধান, গ্রহণ ও প্রচারের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এই ‘যেকোনো মাধ্যম’ ধারণাটিই ডিজিটাল যুগে নতুন তাৎপর্য অর্জন করেছে।
অর্থাৎ ইন্টারনেট আবিষ্কারের কারণে নতুন কোনো মানবাধিকার হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়েছে—বিষয়টি এত সরল নয়। বরং বিদ্যমান মানবাধিকারের পরিসর ও প্রয়োগের ক্ষেত্র প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্প্রসারিত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার ব্যবস্থার বিভিন্ন ব্যাখ্যামূলক দলিল ও প্রস্তাবে এ বাস্তবতা ক্রমে সুস্পষ্ট হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির জেনারেল কমেন্ট নাম্বার-৩৪ (২০১১) মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে ইন্টারনেট ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগের সম্পর্ককে স্বীকার করেছে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের বিভিন্ন প্রস্তাবেও অনলাইন ও অফলাইনে একই মানবাধিকারের সুরক্ষার নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ফলে ডিজিটাল পরিসর আজ মানবাধিকারের বাইরে কোনো পৃথক ভূখণ্ড নয়, বরং মানবাধিকারের সমকালীন প্রকাশ ক্ষেত্র।
এখানেই একটি মৌলিক পার্থক্য অনুধাবন করা জরুরি। ইন্টারনেট প্রবেশাধিকারকে সর্বত্র এবং সর্বাবস্থায় একটি স্বতন্ত্র, পরম ও অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে—এমন দাবি আইনগতভাবে অতিসরলীকৃত। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে সমকালীন সমাজে ইন্টারনেট ক্রমে এমন এক ‘অধিকার-নিশ্চিতকারী অবকাঠামো’-এ পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষ মতপ্রকাশ, তথ্যপ্রাপ্তি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সংগঠিত হওয়া, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করে। সুতরাং ইন্টারনেটের গুরুত্ব কেবল প্রযুক্তিগত সুবিধায় নয়, এর গুরুত্ব নিহিত অধিকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতায়।
এ বাস্তবতাকে বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর আলোতেও বিবেচনা করা জরুরি। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একুশ শতকের নাগরিক যখন তার মতামত প্রকাশ করেন ফেসবুকে, ইউটিউবে, ব্লগে, অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কিংবা অন্য কোনো ডিজিটাল প্লাটফর্মে, তখন সেই মতপ্রকাশের স্থানটি কাগজের পৃষ্ঠা থেকে সরে গেলেও তার সাংবিধানিক তাৎপর্য বিলীন হয় না। রাষ্ট্র যদি এমন একটি মাধ্যমের প্রবেশাধিকার নির্বিচারে বন্ধ করে দেয়, যার ওপর নাগরিকের সমকালীন মতপ্রকাশ উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, রাষ্ট্র কি কেবল মাধ্যমটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি কার্যত মতপ্রকাশের পরিসরকেও সংকুচিত করছে?
একইভাবে সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ যোগাযোগের ক্ষেত্রে নাগরিকের অধিকার ও গোপনীয়তার সুরক্ষা প্রদান করে। ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তৃত বাস্তবতায় এ সাংবিধানিক নিশ্চয়তার তাৎপর্যও নতুন মাত্রা পেয়েছে। আর ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার যে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়া হয়েছে, তার কার্যকর অর্থও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কারণ আধুনিক জীবনে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আর্থিক লেনদেন, সরকারি সেবা, কর্মসংস্থান এবং জরুরি তথ্যপ্রাপ্তির সঙ্গে ডিজিটাল সংযোগের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা কখনো কখনো পরোক্ষভাবে জীবন ও জীবিকার ওপরও বাস্তব অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণ করেছে। কিন্তু তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে কেবল আইনগ্রন্থের অক্ষরে সীমাবদ্ধ রাখলে তার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না; তথ্য যেখানে সঞ্চালিত হয়, নাগরিকের প্রবেশাধিকারও সেখানে কার্যকর হতে হয়। রাষ্ট্র যখন একদিকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং পরবর্তীতে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর মতো উন্নয়ন দর্শনের মাধ্যমে ডিজিটাল অবকাঠামোকে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির রূপান্তরের কেন্দ্রে স্থাপন করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সামাজিক উত্তেজনার সময় ইন্টারনেটের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, তখন একটি মৌলিক নীতিগত অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ডিজিটাল অর্থনীতি যদি রাষ্ট্রের উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়, তাহলে ডিজিটাল সংযোগ বিচ্ছিন্নতার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্যও রাষ্ট্রকে বিবেচনায় নিতে হবে। ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নীরব হয় না; অনলাইন ক্লাস থেমে যায়, দূরবর্তী কর্মসংস্থান ব্যাহত হয়, ফ্রিল্যান্সারদের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে, ব্যবসায়িক লেনদেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সংবাদপ্রবাহ সংকুচিত হয় এবং সাধারণ নাগরিকের রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল একটি সমাজে ইন্টারনেট বন্ধ করা তাই অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপরও একটি অদৃশ্য কর আরোপের মতো।
সবচেয়ে গভীর প্রশ্নটি অবশ্য রাজনৈতিক। গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো নাগরিকের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছাবে এবং রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নাগরিক অবহিত থাকবে। এ দ্বিমুখী যোগাযোগই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রাণ। কিন্তু রাষ্ট্র যদি নাগরিকের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যমটিই সাময়িকভাবে অচল করে দেয়, তাহলে নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার এ যোগাযোগ-সেতু দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশেষত রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন, আন্দোলন কিংবা সামাজিক অস্থিরতার মুহূর্তে যখন তথ্যপ্রবাহের গুরুত্ব সর্বাধিক, তখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা গণতান্ত্রিক পরিসরকে আরো সংকুচিত করতে পারে।
অবশ্যই রাষ্ট্রের হাতে জননিরাপত্তা, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা সহিংসতা প্রতিরোধের মতো বৈধ স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধ, সহিংসতা, গুজব বা বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়লে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের বৈধ উদ্দেশ্য থাকলেই যেকোনো ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নতা বৈধ হয়ে যায় না। মানবাধিকারের মৌলিক নীতিই হলো, রাষ্ট্রের ক্ষমতা উদ্দেশ্য দ্বারা নয়, বরং তার প্রয়োগের বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা ও আনুপাতিকতার মাধ্যমে বিচার্য।
সুতরাং ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্তকে নিছক প্রশাসনিক কিংবা প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা বিপজ্জনক। এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি, নির্দিষ্ট ও বৈধ উদ্দেশ্য, প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা, সীমিত সময়সীমা, স্বাধীন তদারকি এবং জনসম্মুখে জবাবদিহি থাকা জরুরি। যদি কোনো নির্দিষ্ট ডিজিটাল প্লাটফর্ম বা নির্দিষ্ট কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করেই কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা-উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভব হয়, তাহলে সমগ্র ইন্টারনেট অবকাঠামো অচল করে দেয়া কেন প্রয়োজন, তারও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা থাকা উচিত। কারণ সর্বব্যাপী নিষেধাজ্ঞা সাধারণত সবচেয়ে বিস্তৃত এবং অধিক ক্ষতিকর হস্তক্ষেপ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশও এ প্রশ্নকে ভিন্ন ভিন্নভাবে মোকাবেলা করেছে। ফিনল্যান্ড ২০১০ সালে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের মৌলিক প্রবেশাধিকারের বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির স্থাপন করেছিল। যুক্তরাজ্যও সর্বজনীন সেবা কাঠামোর মাধ্যমে ব্রডব্যান্ড প্রবেশাধিকারের গুরুত্বকে স্বীকার করেছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায় যে রাষ্ট্র চাইলে ইন্টারনেটকে কেবল বাজারনির্ভর ভোগ্যসেবা হিসেবে নয়, নাগরিক জীবনের মৌলিক অবকাঠামো হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে।
তবে ইন্টারনেটকে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনার প্রশ্নটি শুধু ‘শাটডাউন’ বন্ধ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়। অধিকারের প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন প্রবেশাধিকার সর্বজনীন, সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, নিরাপদ এবং বৈষম্যহীন হয়। শহরের নাগরিক দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন, কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সংযোগের অভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন, এমন ডিজিটাল বৈষম্যও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের বিষয়। ডিজিটাল অধিকার তাই একই সঙ্গে স্বাধীনতার প্রশ্ন এবং সমতার প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের। রাষ্ট্র কি নাগরিককে এমন এক আধুনিক জনপরিসরে অবাধে প্রবেশের সুযোগ দেবে, যেখানে সে তথ্য জানবে, প্রশ্ন করবে, মতামত প্রকাশ করবে, অন্যের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি দাবি করবে? নাকি সংকটের মুহূর্তে রাষ্ট্র সেই পরিসর সংকুচিত করার সহজতম পথ হিসেবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতাকে বেছে নেবে?
একবিংশ শতাব্দীতে নাগরিকের জীবন আর কেবল বাস্তব ভূগোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিজিটাল পরিসরেও বিস্তৃত। নাগরিক যেমন রাস্তায়, বিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে ও সংসারে নাগরিক, তেমনি সে অনলাইন পরিসরেও নাগরিক। তার অধিকারও তাই স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে বিলীন হয় না। বরং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে অধিকারের কার্যকর রূপ নতুন ভূখণ্ডে বিস্তৃত হয়।
অতএব, ইন্টারনেটকে কেবল একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখার সময় শেষ হয়েছে। এটি আজ শিক্ষা, তথ্য, মতপ্রকাশ, জীবিকা, সামাজিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অন্যতম প্রধান বাহন। ইন্টারনেট নিজেই হয়তো প্রতিটি পরিস্থিতিতে একটি স্বতন্ত্র ও পরম মানবাধিকার নয়; কিন্তু মানুষের বহু স্বীকৃত অধিকারকে কার্যকর করার জন্য এটি ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে। সেই কারণে ইন্টারনেটের প্রবেশাধিকার এবং বিশেষত নির্বিচারে ইন্টারনেট বন্ধের প্রশ্নটি মানবাধিকার ও সাংবিধানিক স্বাধীনতার বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেই বিচার করা উচিত।
কারণ একটি রাষ্ট্র যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে, তখন সে শুধু একটি নেটওয়ার্কের সুইচ অফ করে না। কখনো কখনো সে নাগরিকের তথ্যপ্রাপ্তির জানালা বন্ধ করে, মতপ্রকাশের পথ সংকুচিত করে, জীবিকার প্রবাহ থামিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের যোগাযোগের সেতুতেও অন্ধকার নামিয়ে আনে। ডিজিটাল যুগে তাই নাগরিকের কণ্ঠস্বরের পথ রক্ষা করা আর প্রযুক্তিগত বিলাসিতা নয়; এটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
রাষ্ট্রের ক্ষমতা তখনই গণতান্ত্রিক, যখন সেই ক্ষমতা নাগরিকের স্বাধীনতাকে রক্ষা করে, অযথা সংকুচিত করে না। আর একবিংশ শতাব্দীতে নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো তার সংযোগের পথটি অকারণে রুদ্ধ না করা। কারণ ইন্টারনেট বন্ধ হলে শুধু সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না, অনেক সময় নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যকার গণতান্ত্রিক সংযোগটিও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
মো. আল-আমিন: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং পিএইচডি ছাত্র, ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকি, যুক্তরাষ্ট্র।









