আমরা যতটা ভাবতে সমর্থ হয়েছি, কভিড-১৯ তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ক্ষতি করেছে। এই তো কিছুদিন আগেও আমরা অর্থনীতি, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্পর্ধায় উন্নয়নশীল, উন্নত দেশের কাতারে নিজেদের সাজিয়েছি। আমরা পাল্লা দিয়েছি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের সঙ্গে। আমাদের বোঝার ভুল ছিল যে পাল্লা কেবল উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধি আমলে নিয়ে নয়; শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, সুরক্ষিত সমাজ গঠনের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও আমলে নিয়ে দিতে হয়। 

বিশ্বের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কেউ কেউ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে কভিড মহামারী পৃথিবীর মানুষের জন্য কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কেননা মহামারী মোকাবেলা করতে গিয়ে মানুষ বিভিন্নভাবে নিজেদের সত্যিকারের সামর্থ্য কতটুকু, তা উপলব্ধি করতে হয়তো সক্ষম হয়েছে। তাই কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কভিডের বাস্তবতাগুলো বিবেচনা করে বিশ্ববাসী নতুন ধরনের মানবিক নীতি ও সামাজিক সুরক্ষাজাল প্রণয়নে সচেষ্ট হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিকার অর্থে কি আমরা সচেষ্ট হব? আমাদের স্পর্ধা গিয়ে প্রকৃত বিনয় আসবে মানবিক রাষ্ট্র গঠনের?

করোনা আমাদের মতো দেশের, মানুষের যে ক্ষতি করতে পারত, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতি হয়েছে কেবল সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না গ্রহণের ফলে। দেশের কোটি কোটি লোক, যারা পরিশ্রমের মাধ্যমে রোজগার করে অন্ন জোগাতে সক্ষম, আজ তারা অসহায়। উন্নত দেশের লকডাউন ব্যবস্থা আমাদের খেটে খাওয়া নাগরিকদের জন্য কার্যকর হয়নি। কাজ নেই তো আয় নেই। আমরা আমাদের স্পর্ধার যে গল্প বলি, উন্নয়নের যে বড়াই করি, সেখানে এই মানুষগুলোর অংশগ্রহণ নেই, অন্তর্ভুক্তি নেই। প্রবৃদ্ধি, উন্নয়নের সঙ্গে সমাজের প্রতিটি স্তরকে যে তার সুফল পৌঁছে দিতে হয়, আমরা সেসব উপেক্ষা করে গেছি। করোনা বিনয়ের সঙ্গে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে সেসব উপেক্ষা। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি আমরা যদি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের দিকে নজর দিতাম, শিক্ষা খাতের দিকে লক্ষ রাখতাম, তাহলে সাধারণ নাগরিকের মনোবলে এতটা চিড় ধরত না। স্বেচ্ছাসেবক ও বিভিন্ন সংগঠন এগিয়ে না এলে কত লোককে না খেয়ে মরতে হতো। অথচ সরকারের গুদামে খাদ্যের সমাহার আছে বলে শোনা যায়। আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে ওঠা অতিধনীদের ওপর সামান্য কর বসিয়ে অসহায় মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা কি অনেক অসম্ভব?

দিন আনে দিন খায়- এমন হাজার হাজার লোকের খাদ্যের বন্দোবস্ত করতে আমরা হিমশিম খাব বলে কাজ, কারখানা চালু হলো। কারখানা খোলা-বন্ধ ও খোলার  সিদ্ধান্ত  নিয়ে আমরা যা করেছি তা অনন্য। ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে আবার মাইলের পর মাইল হাঁটিয়ে এনেছি। এ কাজের জন্য আমাদের কারো কোনো জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হয়নি। উপরন্তু, আমরা সরকারের কাছ থেকে শ্রমিকদের বেতনের দোহাই দিয়ে ভর্তুকি বের করে নির্বিকার থেকেছি। আমরা যেন কথা দিয়ে কথা না রাখার নেশায় মেতেছি। 

শ্রমিকরা কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন হেঁটে কাজে ফিরেছেন? কারণ পেট তো কথা শোনে  না। সেখানে অবিরাম ক্ষুধার চাবুক। গ্রামে কাজ নেই। এত দিনে যা সঞ্চয়, তা দিয়ে বড়জোর ২০-২৫ দিন চলেছে তাদের। কিন্তু মাসের পর মাস তো চলে না। তাই মালিকের ডাকে কাজে না ফেরার স্পর্ধা কোথায় তাদের! আধুনিক দাসত্বের রূপ তো এমনই। 

মালিকের চোখে শ্রমিক তো মজুর মাত্র, যন্ত্র বৈ কিছু  নয়। তাদের শরীর, মন বলে কিছু হতে পারে না। অতএব, তাদের সঙ্গে যা খুশি তা-ই করা যায়। তারা পায়ে হেঁটে ফিরুক, মড়কে মারা যাক, কোথাও তাদের হিসাব থাকবে না। তারা এ সমাজে খরচযোগ্য। অথচ আমরা যদি খানিকটা মানবিক হতাম, তাহলে উপলব্ধি  করতে পারতাম এ মানুষগুলো সমাজের বোঝা নয়, সম্পদ। তাদের সম্মানের সঙ্গে  বাঁচিয়ে রেখে, তাদের শ্রমে, তাদের দক্ষতায় নতুন মানবিক সমাজ গড়ার কাজটি করা যায়; যার সম্ভাবনা এখনো রয়েছে।

যদিও মানবিক কল্যাণমূলক সমাজ গড়ার পথে বাধা অশেষ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ঘুণে ধরা, স্বাস্থ্য খাত বিপর্যস্ত, কাজের সুযোগ নেই। এর মধ্যে মানুষ নিজের মতো করে বেঁচে থাকার যে পথগুলো তৈরি করে আসছিল, করোনা সে পথে আরো বন্ধুরতা তৈরি করে দিয়েছে।

কত দিনে উৎপাদনে গতি ফিরবে, বাজারের স্বাস্থ্যোদ্ধার ঘটবে, বলা কঠিন। এদিকে জীবিকার অন্য উপায় এখনো বিশেষ দেখা যাচ্ছে না। হাজার হাজার মানুষ আজকের পরিস্থিতিতে নানা স্থানে আটকেও আছে। অর্থ ব্যবস্থার চাকা ঘুরতে সময় লাগবে। মজুর, শ্রমিক থেকে কাজ হারানো অন্য মানুষেরা সহজে কাজ পাবেন, এমন ভরসা কম। 

সরকারের কোষাগারে ঘাটতি বিরাট। করোনাসৃষ্ট সংকট মোকাবেলা বাবদ কোষাগার থেকে বহু টাকা বেরিয়ে যাবে। তার ওপর কর্মনিয়োজনের জন্য টাকা কোত্থেকে আসবে, সে প্রশ্ন উপেক্ষার সুযোগ নেই। তাই উত্তর না খুঁজলেই নয়। বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞ আর অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বারবার আলোচনার ভিত্তিতে উপায় খুঁজতে হবে। মোদ্দাকথা, মানুষকে অবিলম্বে কাজ দিতে হবে। চলমান দুর্বিপাকে অহেতুক স্পর্ধা দেখানোর সুযোগ নেই। অনেক হিসাব নতুন করে কষতে হবে। 

ক্ষুধা ও দারিদ্র্য সৃষ্টি না করে কীভাবে আমরা করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তা ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় ভাবতে হবে প্রথাগত ছকের বাইরে এসে। করোনা আমাদের অনেক মিথ, মিথ্যাকে উলঙ্গ করে ছেড়েছে। দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের সক্ষমতা, টেকসইত্ব কতটুকু। যে মানুষগুলো সত্যিকার অর্থে কল্যাণমূলক কাজ করতে চায়, তারা যেন কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাঁদে না পড়ে, সরকারকে এটা নিশ্চিত করতে হবে। চলনে-বলনে স্পর্ধা দেখানোর অভ্যাস ভুলতে হবে। তা না হলে করোনা মোকাবেলার পরীক্ষায় পাস করলেও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি নির্মাণের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াটা সহজ হবে না। 

লেখক: রুহিনা ফেরদৌস, সাংবাদিক