এশিয়ায় সরবরাহের নিরাপত্তা জোরদার করতে সিঙ্গাপুরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদের পরিকল্পনা করেছে সৌদি আরব। ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) সিঙ্গাপুরের জুরং রক ক্যাভার্নসে এ কার্যক্রম শুরু হবে। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে এ উদ্যোগ নিয়েছে দেশ দুটি। খরব রয়টার্স।

সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি উইক সম্মেলনে গত সোমবার এ পরিকল্পনার কথা জানান দেশটির জ্বালানি, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী তান সি লেং। তিনি বলেন, ‘সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুর যৌথভাবে এ মজুদ ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সৌদি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা আরো মজবুত ও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি যেকোনো সংকটকালে সিঙ্গাপুরের নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তাও সুনিশ্চিত হবে।’

এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো সিঙ্গাপুরের জ্বালানি বাজার কর্তৃপক্ষ (ইএমএ) ও জেটিসি করপোরেশনের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করবে। কয়েক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তান সি লেং।

সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘এশিয়ার প্রধান বাজারগুলোর কাছাকাছি জ্বালানি তেলের মজুদ থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থার নমনীয়তা বাড়বে। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুরের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রস্তুতিও জোরদার হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগে এশিয়ার আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসত দেশটি থেকে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিভিন্ন দেশ নিজস্ব মজুদ থেকে তেল ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে বেড়েছে উদ্বেগ। এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহের উৎসের কাছাকাছি জ্বালানি তেল মজুদ রাখাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে দেশগুলো।

ভূগর্ভস্থ গুহায় মজুদ করা হবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল

সিঙ্গাপুরের জুরং দ্বীপে ভূগর্ভের প্রায় ১৫০ মিটার বা ৪৯২ ফুট গভীরে অবস্থিত জুরং রক ক্যাভার্নস। এ স্থাপনায় ১৪ লাখ ৭০ হাজার ঘনমিটার তরল হাইড্রোকার্বন মজুদ করা যায়, যা প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেলের সমান। এখানে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও কনডেনসেটের মতো জ্বালানি রাখা সম্ভব।

সৌদি আরব এরই মধ্যে এশিয়ার আরো দুটি দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদ করে রেখেছে। দেশ দুটি হলো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। জরুরি পরিস্থিতিতে এসব মজুদ থেকে জ্বালানি তেল কেনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার অগ্রাধিকার পায়।

জাপানের ওকিনাওয়ায় সৌদি আরামকোর তেল মজুদের সক্ষমতা ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়িয়ে ৮২ লাখ ব্যারেল করা হয়। অন্যদিকে ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কোরিয়া ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশনের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করে প্রতিষ্ঠানটি। ওই চুক্তির আওতায় দেশটির উলসান বন্দরের সংরক্ষণাগারে ৫৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল মজুদের ব্যবস্থা রয়েছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের মজুদ ব্যবস্থা চালু হলে এশিয়ায় সৌদি আরবের তেল সংরক্ষণের ব্যবস্থা আরো বিস্তৃত হবে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

আঞ্চলিক মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ

এদিকে এশিয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ বাড়াতে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে জাপান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রস্তাবিত ‘পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগে এ অঞ্চলের জ্বালানি ও সম্পদ সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর পরিকল্পনা এবং ১ হাজার কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বড় জ্বালানি তেল মজুদ থাকলেও এশিয়ার অনেক দেশের মজুদ তুলনামূলক কম। ফলে দীর্ঘ সময় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এসব দেশ বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। সৌদি আরব ও সিঙ্গাপুরের নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য হলো এ ঝুঁকি মোকাবেলায় সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো মজবুত করা।