সমুদ্রের পাশে বেড়ে উঠা ফাতেমা আক্তারের সঙ্গে সার্ফিংয়ের পরিচয় ছোটবেলায়। চোখের দেখাতেই কক্সবাজারের ছোট্ট মেয়েটির ওপর সওয়ার হতো সার্ফবোর্ডের ওপর ভেসে থাকা মানুষটার উত্তেজনা। আর নয় বছর বয়সে সার্ফিং শেখা শুরু করার পর এমন এক আনন্দের সন্ধান পান ফাতেমা, যার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা চলে না।

সেই আনন্দ ও নৈপুণ্য ভাগাভাগিতে চলতি এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছেন ফাতেমা। সম্প্রতি ১৬ বছর বয়সী এ কিশোরীকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আরব নিউজ। সেখান ফাতেমা বলেন, ‘যখন শেষ পর্যন্ত নিজে চেষ্টা করলাম, তখন এই অনুভূতির প্রেমে পড়ে গেলাম।’

‘শুরুতে বিশাল ঢেউ দেখে আমি ভীষণ ভয় পেতাম। কিন্তু বোর্ডের ওপর দাঁড়াতে শেখার পর সেই ভয়ই নিখাদ আনন্দে পরিণত হলো। সার্ফিং আমাকে সব দুঃখ ও জীবনের সংগ্রামের কথা ভুলিয়ে দেয়।’

ফাতেমার বাবা মারা যাওয়ার তাদের চার ভাইবোনের লালন-পালনের ভার পড়ে মায়ের ওপর। বছরের পর বছর পরিবারটি আর্থিক সংকটে ছিল। সার্ফিংয়ের কারণে সামাজিকভাবে সমালোচনারও মুখোমুখি হতে হয়েছে ফাতেমাকে। কারণ এখনো মেয়েদের সার্ফিং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

ফাতেমা বলেন, ‘আমাদের সমাজে কোনো মেয়ের টি-শার্ট পরে ছেলেদের সঙ্গে পানিতে নামা সহজে মেনে নেয়া হয় না। আমার এলাকার মানুষজন আমার মাকে বলতেন, রোদে আমার গায়ের রং কালো হয়ে যাবে এবং আমাকে কেউ বিয়ে করবে না।’

‘এটা ভীষণ হতাশাজনক ছিল। কিন্তু আমার কোচ রাশেদ সবসময় আমার পাশে ছিলেন। তিনি আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলে সার্ফিং করতে দেয়ার জন্য রাজি করান। এমনকি আমার পড়াশোনার খরচের দায়িত্বও নেন। এখন আমার মা আমাকে পুরোপুরি সমর্থন করেন।’

চলতি মাসে নতুন ইতিহাসের অংশ হচ্ছেন ফাতেমা। সম্প্রতি জাপানে শুরু হওয়া এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে প্রতিযোগিতা করবেন তিনি। এই আসরেই প্রথমবারের মতো সার্ফিং যুক্ত হচ্ছে।

ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরগুলোয় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে যেতে চান ফাতেমা। তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, ‘একদিন অলিম্পিকে সার্ফিং করা।’

ফাতেমার সতীর্থ মাহিমা আক্তার মিলিও জাপানের গেমসে ব্যাকআপ সার্ফার হিসেবে থাকছেন। তার কাছে সার্ফিং শুধু ক্রীড়া নয়, বরং পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সুযোগও।

মাহিমা বলেন, ‘আমি সার্ফিংয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়তে চাই, যাতে বাবা-মাকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারি এবং আমার ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করতে পারি। বিশ্বকে দেখাতে চাই, বাংলাদেশের নারী সার্ফাররা কী করতে পারে।’

কক্সবাজারে মেয়েদের সার্ফিংয়ে যুক্ত করার অন্যতম উদ্যোগী ব্যক্তি রাশেদ আলম। তিনি শহরটির ফাতেমা, মাহিমাসহ আরো অনেক তরুণ সার্ফারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ মান্নানও রয়েছেন, যিনি এশিয়ান গেমসে পুরুষদের সার্ফিং বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

বাংলাদেশ সার্ফ গার্লস অ্যান্ড বয়েজ ক্লাব পরিচালনাকারী রাশেদ আলম বলেন, তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মেয়েদের সার্ফিংয়ে ধরে রাখা। রক্ষণশীল সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত সাংস্কৃতিক বাধার পাশাপাশি অর্থের সংকটও বড় সমস্যা। কারণ সরকার বা পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে প্রায় কোনো সহায়তাই পাওয়া যায় না।

তবে এবারের এশিয়ান গেমস বাংলাদেশের সার্ফিং অঙ্গনকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে পারে বলে আশাবাদী তিনি।

রাশেদ বলেন, ‘জাপান থেকে এই দুই মেয়েকে যদি ভালো পারফরম্যান্স করে ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে সার্ফিং নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই বদলে যেতে পারে।’