ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ডাকা বিক্ষোভ ঘিরে শনিবার সকাল থেকেই দিল্লিজুড়ে ব্যাপক পুলিশি অভিযান চালানো হয়েছে। বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী, ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাসহ বহু রাজনৈতিক নেতা, অ্যাক্টিভিস্ট ও বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। রাতভর অভিযানে অন্তত তিন হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।

জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার অপসারণের দাবিতে দিল্লির যন্তর-মন্তরে ‘যন্তর-মন্তর: ২.০’ নামে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ভোর থেকেই রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়। দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ৪০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড ও স্পাইক স্ট্রিপ বসানো হয়। যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় চলাচলেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।

সকালের দিকে পুলিশ প্রথমে সিজেপি নেতাকর্মী ও বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা ব্যক্তিদের আটক করতে শুরু করে। সকাল ৯টার কিছু পর পুলিশ ধ্রুব রাঠীর গুরুগ্রামের বাসভবনে যায়। পরে তাকে আটক করার খবর আসে। এর কিছুক্ষণ পর জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর কাব্য কর্ণাটককেও আটক করা হয়।

এরপর দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং দলটির নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হয়। একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা তাদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বিমানবন্দরে তাদের আটকের জন্য দক্ষিণ-পশ্চিম জেলা পুলিশের দল মোতায়েন করা হয়েছিল। আটকের পর তাদের কোথায় নেয়া হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি।

অভিজিৎ দীপকে আটক হওয়ার আশঙ্কায় আগের রাতেই একটি ভিডিও রেকর্ড করে রেখেছিলেন। সেই ভিডিওতে তিনি জানান, তাকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করা হলে সিজেপির সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা অজিঙ্ক্য শিন্ডে যন্তর মন্তরের কর্মসূচির নেতৃত্ব দেবেন।

পুলিশি অভিযানের মধ্যে যন্তর মন্তর পৌঁছাতে না পেরে বিক্ষোভের স্থান পরিবর্তনের কথাও জানায় এআইএসএ। সংগঠনটি যন্তর মন্তরের পরিবর্তে দিল্লি হাটে কর্মসূচি সরিয়ে নেয়ার ঘোষণা দেয়। এর কিছুক্ষণ পর সংগঠনটির জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাকে আটক করা হয়। তাকে বহনকারী পুলিশ বাস বিক্ষোভকারীরা ঘিরে রাখে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্ষোভে যোগ দিতে যাওয়া ভারতের বামপন্থী রাজনীতিকদেরও আটক করা হয়। কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ সিপিআই(এম)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, এম ভি গোবিন্দন মাস্টার, এ বিজয়ারাঘবন, কে কে শৈলজা, জন ব্রিটাস, কে এন বালাগোপাল ও বৃন্দা কারাটকে যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর পর পুলিশ হেফাজতে নেয় বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

দিল্লির বাংলা সাহিব গুরুদুয়ারা থেকেও ৬০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ রাতে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সকালে তারা বেরিয়ে এলে বাইরে অপেক্ষমাণ পুলিশ তাদের আটক করে। যন্তর মন্তরের আশপাশ থেকেও বিক্ষোভকারী ও স্বাধীন সংবাদকর্মীদের আটক করা হয়।

দিল্লির বাইরেও ধরপাকড়ের খবর পাওয়া যায়। মুম্বাইয়ে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র ও অ্যাক্টিভিস্ট তুষার গান্ধীকে আটক করে পুলিশ। সিজেপির কর্মসূচির সমর্থনে আগস্ট ক্রান্তি ময়দানে একটি বিক্ষোভে তার যোগ দেয়ার কথা ছিল। অন্যদিকে আম আদমি পার্টি (এএপি) দাবি করেছে, দলটির নেতা মনীশ সিসোদিয়াকে চণ্ডীগড়ে আটক করা হয়েছে।

দিনের পরের দিকে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ এলাকায় মমতা ব্যানার্জিকে আটকে দেয়া হলে তিনি সড়কে ধর্নায় বসেন। পরে দিল্লি পুলিশ তাকেও আটক করে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই তিনি সেখানে অবস্থান নিয়েছিলেন।

ব্যাপক নিরাপত্তা তৎপরতায় কেন্দ্রীয় দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় তীব্র যানজটও সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভস্থলের দিকে যাওয়া সড়কগুলোয় তল্লাশি, ব্যারিকেড ও নজরদারি বাড়ানোর ফলে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ধরপাকড়ের তীব্র সমালোচনা করেছে। কংগ্রেস নেতা শশী থারুর বলেন, নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেয়ার বদলে রাজধানীকে দুর্গে পরিণত করলে সন্দেহ আরো বাড়বে। এনসিপি-এসপি নেত্রী সুপ্রিয়া সুলেও সিজেপি নেতাদের আটকের ঘটনাকে ‘ভুল ও অসাংবিধানিক’ বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র কর্মসূচিকে ‘নৈরাজ্যবাদীদের ব্যর্থ প্রদর্শনী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার দাবি, দিল্লির একটি অংশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হলেও কর্মসূচি সফল হয়নি।