ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের ডাকা বিক্ষোভ ঠেকাতে নয়াদিল্লিজুড়ে নজিরবিহীন ধরপাকড় চালিয়েছে পুলিশ। দিনভর অভিযানে চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকারসহ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের আটক করা হয়। আটক হন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা, ধ্রুব রাঠী ও নেহা বোরাও। পুলিশি অভিযানে মোট সাত হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। তবে রাতের দিকে চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, নেহা বোরাসহ অধিকাংশ আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে বলে দিল্লি পুলিশের সূত্রে জানিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ধ্রুব রাঠী, অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার মুক্তির খবর মেলেনি।

ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। গতকাল দলটি জানিয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আজ থেকে প্রতিদিন যন্তর মন্তরমুখী মিছিল করা হবে। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট আগামীকাল দিল্লিতে বড় বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে।

গতকাল বিক্ষোভ শুরুর আগে নয়াদিল্লির বিভিন্ন প্রবেশপথ, সড়ক, মেট্রো স্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কার্যত বন্ধ করে দেয়া হয়। যন্তর মন্তরে যাওয়ার পথে বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়। বিভিন্ন গাড়ি ও বাসে তল্লাশি চালানো হয় এবং আটক ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়া হয় অস্থায়ী আটক কেন্দ্রে। যন্তর মন্তর ঘিরে ব্যারিকেড বসানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে চেকপোস্ট স্থাপন করে পুলিশ। কয়েকটি প্রধান সড়কে কংক্রিট ব্লক ও ব্যারিকেড বসানোয় যান চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যান ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের সরঞ্জাম মোতায়েন রাখা হয়।

দিল্লিকে কার্যত লকডাউনের মধ্যে ফেলা হয়। অন্তত ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের গেট বন্ধ রাখা হয়, ২৫০টির বেশি ট্রেন বাতিল করা হয় এবং যন্তর মন্তরের চার কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ইন্টারনেট সেবা স্থগিত রাখা হয়। দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মিলিয়ে অন্তত ২৫ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যই ছিলেন প্রায় ২৩ হাজার।

বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা ছিল যন্তর মন্তর। কিন্তু সকাল থেকেই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে নেয় পুলিশ। পাঁচজন বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে বিক্ষোভকারীরা দিল্লি হাট, কনট প্লেস, বাংলা সাহিব গুরুদুয়ারাসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করে। সেখান থেকেও বহু মানুষকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের রাখতে তিনটি বড় স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্থানকে অস্থায়ী আটক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

শুধু সাধারণ বিক্ষোভকারী নয়, সাংবাদিক ও আইনজীবীরাও ধরপাকড়ের মুখে পড়েন। নিউসলন্ড্রির তিন সাংবাদিক ও স্ক্রলের এক প্রতিবেদককে আটক করা হয়। নিউসলন্ড্রি অভিযোগ করে, তাদের সাংবাদিকদের ব্যবহৃত অফিশিয়াল ফোনও জব্দ করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট থেকে যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল করে যাওয়া একদল আইনজীবীকেও আটক করে পুলিশ।

দিনের শুরুতেই আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বকে আটক করা হয়। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা মুম্বাই থেকে দিল্লি পৌঁছার পর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের বিমানের ভেতর থেকেই আটক করে পুলিশ। ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের বিমানে উঠে তাদের নিয়ে যেতে দেখা যায়।

তিন নেতাকে কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে দীর্ঘ সময় তথ্য দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করে সিজেপি। সংগঠনটির নেতা আজিঙ্কা সিন্ধে জানান, দীপকে, রাঙ্কা ও দাসকে আইনজীবীদের সঙ্গেও দেখা করতে দেয়া হচ্ছিল না। এর মধ্যেই দীপকের দাদির মৃত্যুর খবর আসে। দিল্লি পুলিশ জানায়, তাকে মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে এবং শেষকৃত্যে যোগ দিতে নিজ শহরে ফেরার ক্ষেত্রে সহায়তার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। রাতেও দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে মুক্তি দেয়া হয়নি। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

গতকাল সকালে গুরুগ্রাম থেকে ইউটিউবার ও মোদি সরকারের সমালোচক ধ্রুব রাঠীকে আটক করা হয় বলে সিজেপি জানায়। সংগঠনটির আইনি সেলের প্রধান রত্না সিং এবং নীতিবিষয়ক প্রধান মেহর পাসরিচাকেও আটক করা হয়। পরে দিল্লি হাটের দিকে মিছিল করার সময় এআইএসএ সভাপতি নেহা বোরা ও ভারত জোড়ো অভিযানের জাতীয় আহ্বায়ক যোগেন্দ্র যাদবকে আটক করে পুলিশ। নেহাকে সন্ধ্যার দিকেই ছেড়ে দেয়া হয়।

রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও দিনভর চলে আটক অভিযান। কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নের সঙ্গে আটক হন সিপিআই(এম)-এর রাজ্যসভা সদস্য জন ব্রিটাস ও কেরালার সাবেক অর্থমন্ত্রী কেএন বালাগোপাল। কমিউনিস্ট নেতাদের মধ্যে এমএ বেবি, বৃন্দা কারাট ও দীপঙ্কর ভট্টাচার্যকেও আটক করা হয়।

বেলা ৩টার দিকে দক্ষিণ এভিনিউ বাসস্ট্যান্ড থেকে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে আটক করে পুলিশ। যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দেয়ার পর তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে তিনি সেখানে অবস্থান কর্মসূচিতে বসেছিলেন। আটকের সময় মুখে ব্যান্ডেজের মতো টেপ লাগিয়েছিলেন মমতা। পরিস্থিতিকে ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার চেয়েও গুরুতর আখ্যা দিয়ে তিনি একে ‘সুপার ইমার্জেন্সি’ বলেন। পুলিশ বাস থেকে দেয়া ভিডিও বার্তায় মমতা জানান, জনগণের কণ্ঠস্বর শক্তিশালী করতে ইন্ডিয়া জোটের লড়াই চলবে।

এর কিছুক্ষণ পর দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালকেও আটক করা হয়। এর আগে তিনি তরুণদের ‘দিল্লি চলো’ আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, যেখানে পুলিশ বাধা দেবে, সেখানেই বসে পড়ে জায়গাটিকে ‘যন্তর মন্তর’ বানিয়ে দিতে হবে। কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। তার সঙ্গে এএপি নেতা সঞ্জয় সিং, সৌরভ ভরদ্বাজ ও গোপাল রাইও আটক হন। সন্ধ্যায় কেজরিওয়ালসহ এএপি নেতাদের ছেড়ে দেয়া হয়। চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর আরেকজন ত্রিপুরার মানিক সরকার। তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন ও সাকেত গোখলেও আটক হন।

পরে রাতে চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পিনারাই বিজয়ন ও মানিক সরকারসহ বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে থাকা সাত হাজারের বেশি ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। কেবল সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক রাখা হয়েছে।

দিল্লির বাইরেও একই দাবিতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানসহ বিভিন্ন স্থানে সিজেপির কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানাতে জড়ো হওয়া শত শত মানুষকে আটক করে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী ও অভিনেতা ইমরান খান। আহমেদাবাদ ও চেন্নাইয়েও বিক্ষোভ ও আটকের খবর পাওয়া গেছে।

এত ব্যাপক ধরপাকড়ের পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। অভিজিৎ দীপকে আটক হওয়ার পর আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া আজিঙ্কা সিন্ধে জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ বা অপসারিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিন যন্তর মন্তরমুখী মিছিল হবে। ছাত্রসংগঠনগুলোও আজ থেকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ ছড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, যেখানে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বাধা দেবে, সেখানেই নতুন ‘যন্তর মন্তর’ তৈরি করা হবে।

কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়া জোট আগামীকাল দিল্লিতে বড় বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দিয়েছে। কংগ্রেস নেতা কে সি ভেনুগোপাল গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাইকে ওই কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই দিন ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দেয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।

অন্যদিকে বিজেপি পুরো কর্মসূচিকে অরাজকতা তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে। দলটির নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদ বলেন, ভারত ‘বানানা রিপাবলিক’ নয়; দেশ সংসদের মাধ্যমে চলবে, রাস্তার আন্দোলনের মাধ্যমে নয়। তার দাবি, নির্বাচনী পরাজয়ের পর বিরোধীরা রাস্তার আন্দোলনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।