১৯৪৫ সালের পৃথিবী। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে ইউরোপ আর এশিয়া নিজেদের পুনর্গঠনের লড়াই শুরু করেছিল। তখন আরেকটি অদৃশ্য যুদ্ধ শুরু হয়—চলচ্চিত্র শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সিনেমাকে কেবল বিনোদন বা শিল্পরূপ হিসেবে নয়, বরং এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছিল।
যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে অফিস অব ওয়ার ইনফরমেশন সরাসরি হলিউডের সঙ্গে কাজ করত। ক্যাসাব্লাংকা (১৯৪২) ও মিসেস মিনিভারের (১৯৪২) মতো চলচ্চিত্রগুলো সৈন্যদের মনোবল দৃঢ় করতে এবং মার্কিন আদর্শ প্রচারে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে জার্মানিতে লেনি রিফেনস্টাহলের ট্রায়াম্ফ অব দ্য উইল (১৯৩৫) হয়ে ওঠে নাৎসি প্রোপাগান্ডার প্রতীক। জাপানে সামরিক সরকার সেন্সর বোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটি স্ক্রিপ্ট অনুমোদন করত যাতে সিনেমায় তাদের সম্রাট ও সেনাবাহিনীর গৌরবগাথা নিশ্চিত করা যায়।

কিন্তু যুদ্ধ শেষ হতেই এ প্রোপাগান্ডা পন্থা ভেঙে পড়ে। ১৯৪৫ সালের পর দেখা গেল ইউরোপের অধিকাংশ স্টুডিও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইতালির সিনেসিত্তা স্টুডিওস মিত্রবাহিনীর বোমায় বিধ্বস্ত। জার্মানির ইউএফএ ধসে পড়েছে, আর ফ্রান্সের পাথে ও গোমট দেউলিয়া। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হলিউড প্রায় অক্ষত থেকে যায়। সেই থেকেই শুরু হয় আমেরিকার বৈশ্বিক চলচ্চিত্রে আধিপত্যের যুগ।
১৯৪৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় ‘প্যারামাউন্ট ডিক্রি’ পুরো স্টুডিও সিস্টেমের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। এ রায়ের মাধ্যমে প্যারামাউন্ট, এমজিএম, ওয়ার্নার ব্রোসসহ বড় স্টুডিওগুলোকে তাদের নিজস্ব সিনেমা হল বিক্রি করতে ও ‘ব্লক বুকিং’-এর মতো অন্যায্য প্রথা বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়। ফলে ভেঙে পড়ে সেই যুগের স্টুডিও সিস্টেম—যেখানে স্টুডিওগুলোই চলচ্চিত্রের নির্মাণ, পরিবেশন ও প্রদর্শন নিয়ন্ত্রণ করত। একদিকে করপোরেট ক্ষমতা কমে গেলেও অন্যদিকে জন্ম নিল স্বাধীন প্রযোজক ও বিকল্প চলচ্চিত্র চেতনা।
ইতালির ধ্বংসস্তূপে জন্ম নেয় বাস্তববাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতালিতে ফ্যাসিবাদের পতনের পর চলচ্চিত্রকাররা স্টুডিও ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। রবার্তো রসেলিনির রোম, ওপেন সিটি (১৯৪৫) এবং ভিট্টোরিও দে সিকার বাইসাইকেল থিভস (১৯৪৮) সৃষ্টি করে এক নতুন ধারার—ইতালিয়ান নিওরিয়ালিজম।

এখানে তারকা নয়, অভিনয় করেছেন সাধারণ মানুষ; আলোকসজ্জার পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়েছে প্রাকৃতিক আলো, আর সেটের বদলে যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরের আসল রাস্তা। এ সিনেমাগুলো শুধু ইতালি নয়, বরং ফ্রান্স ও জাপানের চলচ্চিত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
পরাজিত জার্মানি তখন নিজের অপরাধবোধ ও নৈতিক ভাঙনের মুখোমুখি। সে সময়কার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র দ্য মার্ডারারস আর অ্যামাং আস (১৯৪৬) তৈরি হয় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। সেখানে দেখা যায় যুদ্ধ-পরবর্তী অপরাধবোধ, আত্মসমালোচনা ও পুনর্গঠনের গল্প। এ ধারাকেই বলা হয় ট্রুমার্ন ফিল্ম বা রাবল ফিল্ম। এখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন জার্মান চলচ্চিত্রধারা যা পরবর্তী কালে ফাসবিন্ডার, হারজগ ও ওয়েন্ডার্স প্রমুখের নিউ জার্মান সিনেমার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
হিরোশিমা ও নাগাসাকির পরাজয়ের পর জাপানি সমাজে গভীর মানসিক ক্ষত তৈরি হয়। চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়া, কেনজি মিজোগুচি ও ইয়াসুজিরো ওজু সেই ক্ষত, নৈতিক শূন্যতা ও মানবিক অনিশ্চয়তাকে চলচ্চিত্রে অনুবাদ করেন। কুরোসাওয়ার রাশোমন (১৯৫০) ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কৃত হয়। এটি জাপানি সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করে। মার্কিন সেন্সরশিপের মাঝেও জাপানি চলচ্চিত্র তখন ধীরে ধীরে নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখে—যুদ্ধ, দোষ আর মানবতার দায় নিয়ে।

যুদ্ধকালীন জার্মান অধিকারে ফ্রান্সে সিনেমা তৈরির সুযোগ ছিল সীমিত। কিন্তু যুদ্ধশেষে জন্ম নেয় এক বিপ্লব—কায়ে দ্যু সিনেমা (১৯৫১)। আন্দ্রে বাজাঁ প্রতিষ্ঠিত এ পত্রিকা প্রথমবারের মতো ঘোষণা করে ‘চলচ্চিত্রও এক ধরনের সাহিত্য ও শিল্প।’ এ পত্রিকাই জন্ম দেয় ফেঞ্চ নিউ ওয়েভ আন্দোলনের। এর পথিকৃৎ গদার, ত্রুফো, রেনোয়া, শাব্রল প্রমুখ। তাদের দর্শন ছিল সহজ কিন্তু গভীর—ক্যামেরা ইজ পেন। অর্থাৎ চলচ্চিত্রই একজন পরিচালকের আত্মপ্রকাশের ভাষা।
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর ভারতেও জন্ম নেয় নতুন চলচ্চিত্রধারা, যেখানে যুদ্ধোত্তর দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও পুনর্গঠনের কাহিনী কেন্দ্রস্থলে। মেহবুব খানের মাদার ইন্ডিয়া (১৯৫৭), গুরু দত্তের পেয়াসা (১৯৫৭), এবং সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী (১৯৫৫) শুধু ভারত নয়, বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসেই এক নতুন অধ্যায় রচনা করে।
এই সিনেমাগুলো পালটে দেয় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, প্রমাণ করে—চলচ্চিত্রও হতে পারে জাতির আত্মকথন। একই সময়ে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার নবস্বাধীন দেশগুলোও সিনেমাকে সামাজিক মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
যুদ্ধোত্তর সময়েই গড়ে ওঠে নতুন সাংস্কৃতিক কূটনীতি। ১৯৪৬ সালে শুরু হয় কান চলচ্চিত্র উৎসব। ১৯৫১ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব—যেখানে সিনেমা হয়ে ওঠে শান্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রতীক। এ উৎসবগুলোই একত্র করে বিশ্বের চলচ্চিত্রচর্চাকে এবং জন্ম দেয় ‘গ্লোবাল ফিল্ম কালচার’ ধারণার।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলচ্চিত্র শিল্পকে যেমন ভেঙে দিয়েছিল, তেমনি তার ভেতরেই ছিল পুনর্জন্মের বীজ। পুরনো স্টুডিও গ্ল্যামার ভেঙে জন্ম নেয় বাস্তববাদ, আত্মসমালোচনা আর মানবতার নতুন ভাষা। সিনেমা হয়ে ওঠে সময়ের সাক্ষী—প্রতিটি দৃশ্য বলে যুদ্ধের ক্ষত, পুনর্গঠন ও আশার গল্প। যেমন ইতিহাসবিদ মার্ক কজিনস দ্য স্টোরি অব ফিল্মে লিখেছেন, ‘যুদ্ধের পর সিনেমা সেরে ওঠেনি, নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করেছে। ধ্বংসের মধ্য থেকে উঠে এসেছে সত্য।’










