গল্পকার অনেকেই আছেন। কিন্তু খুব কম গল্পকার আছেন যারা কেবল গল্প বলেন না, বরং একেকটা জীবন্ত পৃথিবী গড়ে তোলেন। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সেই বিরল জাদুকরদের একজন। তিনি শুধু নাটক বা সিনেমা বানাননি, পর্দায় তৈরি করেছিলেন এক অন্য জগৎ। সেখানে চরিত্ররা আচমকা থেমে যায়, হেসে ফেলে, কাঁদে, আবার বিভ্রান্ত হয়। যেমন আমরা আমাদের জীবনে হই। নব্বইয়ের দশকে যখন টেলিভিশন নাটক ছিল অতিনাটকীয় ও কৃত্রিমতায় ভরা, তখন হুমায়ূন নিয়ে এলেন নীরবতার সৌন্দর্য, হাস্যরসের মাধুর্য আর জীবনের নির্মল সত্য। দর্শক নিজেদেরই দেখতে পেলেন ওইসব চরিত্রের মধ্যে। এটাই ছিল হুমায়ূনের নির্মাণের জাদু। চরিত্র বাছাইয়ে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন অনন্য। তিনি একজন অভিনেতার ভেতরের সত্তাকে চিনতে পারতেন—তার চোখে, কণ্ঠে, কিংবা নিঃশব্দ বিরতিতেও। তার হাতে অসংখ্য অভিনেতার জীবন বদলে গেছে। অনেকেই পেয়েছেন নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কারের সুযোগ। যাদের আমরা আজ তারকা বলে জানি, তাদের অনেকেরই ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরেছিল হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরে।
আসাদুজ্জামান নূর
আসাদুজ্জামান নূর ও হুমায়ূন আহমেদের সম্পর্ক ‘প্রতিভা নির্মাণ’-এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। ‘কোথাও কেউ নেই’ (১৯৯২-৯৩) ধারাবাহিক নাটকে হুমায়ূন সৃষ্টি করেছিলেন ‘বাকের ভাই’ নামের এক কিংবদন্তি চরিত্র। আর নূর তাকে রক্ত-মাংসে জীবন্ত করে তুলেছিলেন। এ চরিত্র তাকে কেবল সম্মানিত অভিনেতা নয়, এক সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত করেছিল। এক সাক্ষাৎকারে নূর বলেছিলেন, ‘তিনি (হুমায়ূন আহমেদ) অনেক চরিত্র, বিশেষভাবে আমার জন্য লিখেছিলেন। তবে বাকের ভাই আমার জন্য বিশেষ।’ যখন সিরিয়ালে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির আদেশ হয়, তখন ঢাকার রাস্তায় ধ্বনিত হয়েছিল স্লোগান, ‘বাকের ভাইয়ের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে।’ টেলিভিশনের ইতিহাসে দর্শক-প্রতিক্রিয়ার এমন নজির আর দেখা যায়নি। এই চরিত্র নূরকে সাধারণ অভিনেতা থেকে এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত করে।

জাহিদ হাসান
‘আশ্চর্য! মেয়েটা রেগে গেল কেন?’ সংলাপটি জেন-জির কাছেও পরিচিত। তৈরি হয়েছে অসংখ্য মিম। সংলাপটি আনিসের। আনিস চরিত্রে ‘আজ রবিবার’ (১৯৯৬) নাটকে অভিনয় করেছিলেন জাহিদ হাসান। হুমায়ূন আহমেদ তার এই কমেডি ড্রামাটিতে জাহিদ হাসানকে দিয়েছিলেন ‘আনিস’ নামের এক চিরস্মরণীয় চরিত্র। ‘আনিস ভাই’য়ের বাচনভঙ্গি, পোশাক, সংলাপ, সবকিছু মিলে তিনি হয়ে ওঠেন এক অসাধারণ রসিকতার প্রতীক। এর আগে জাহিদ হাসান জনপ্রিয় ছিলেন বটে, কিন্তু ‘আজ রবিবার’ তাকে নিয়ে যায় অন্য উচ্চতায়। চরিত্রের গভীরতায় প্রবেশ করতে গিয়ে তিনি নিজেকে ভেঙেছেন বারবার। আজও দর্শক জাহিদ হাসানকে যেন আনিস ভাইয়ের রূপেই দেখতে পায়।

ফারুক আহমেদ
থিয়েটারকর্মী ফারুক আহমেদের জীবনে মোড় ঘুরেছিল ‘আজ রবিবার’-এর ‘মতি মিয়া’ চরিত্রে অভিনয়ের পর। তখন টেলিভিশনে পার্শ্বচরিত্রে এমন গুরুত্ব কমই দেয়া হতো, কিন্তু হুমায়ূন পাল্টে দিয়েছিলেন সেই ধারণা। এক সাক্ষাৎকারে ফারুক আহমেদ বলেছেন, ‘আজ রবিবার করার পর থেকে তিনি আমাকে ‘‘মতি মিয়া’’ বলেই ডাকতেন।’ এ চরিত্র তাকে এনে দেয় জাতীয় পরিচিতি ও ভালোবাসা। মঞ্চ থেকে টেলিভিশনের স্বীকৃত মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।

জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়
হুমায়ূনের শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’য় (২০১২) জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন কমলার বাবার চরিত্র। দর্শক এ চরিত্রকে যেমন ঘৃণা করেছেন, তেমনি দেখিয়েছেন সহমর্মিতাও, এই দ্বৈত অনুভূতির সঞ্চালক ছিলেন জয়ন্ত। এর আগেও হুমায়ূনের বিভিন্ন নাটক ও চলচ্চিত্রে তিনি বিশেষভাবে আলোচিত ছিলেন, তবে শেষ সিনেমাটিতে যুক্ত হয়ে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ শুধু জাতীয় পুরস্কারই পায়নি, ‘অস্কার এন্ট্রি’ হিসেবেও মনোনীত হয়, যা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের কাজকে দিয়েছে স্থায়ী মর্যাদা।
মাসুম আজিজ
থিয়েটার থেকে টেলিভিশনে আসা মাসুম আজিজকে নতুন পরিচয় এনে দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ‘উড়ে যায় বক পক্ষী’ (২০০৫) তার অভিনয়জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। হুমায়ূনের নাটকগুলোয় মাসুম আজিজ বারবার নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন, নতুনভাবে প্রকাশ করেছেন। তার চরিত্রগুলোতে যেমন গাম্ভীর্য ছিল, তেমনি ছিল সহজতার মায়া, যে মায়া দর্শকের হৃদয়ে থেকে গেছে আজও।
আহমেদ রুবেল
‘চন্দ্রকথা’ (২০০৩) সিনেমায় ‘আমিন’ চরিত্রে অভিনয় করে আহমেদ রুবেল হয়ে ওঠেন নতুন প্রজন্মের মুখ। তার স্বীকারোক্তি, ‘আমার চলচ্চিত্রজীবনের সাফল্য শুরু হুমায়ূন আহমেদের হাত ধরেই।’ এ চরিত্রের জন্যই তিনি পান মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, যা তার অভিনয়জীবনের অন্যতম মাইলফলক। ‘চন্দ্রকথা’ তার জন্য ছিল থিয়েটার ও টেলিভিশনের সীমা ছাড়িয়ে চলচ্চিত্র তারকায় পরিণত হওয়ার সূচনা।
ডা. এজাজুল ইসলাম
ডা. এজাজুল ইসলামের জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। চিকিৎসক হিসেবে এজাজুলের সংযত ব্যক্তিত্ব, মৃদু কণ্ঠস্বর আর নিখাদ স্বাভাবিক অভিনয় যেন হুমায়ূনের বাস্তবধর্মী গল্প বলার অনুপম ধারার সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিশে গিয়েছিল।

‘আবারো তিনজন’, ‘অনুসন্ধান’, ‘চোর’—–এ জনপ্রিয় নাটকগুলোসহ আরো বহু নির্মাণে হুমায়ূনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সাধারণ মানুষের সহজ-সরল জীবনের গল্পে ডা. এজাজুল ইসলাম এনে দিয়েছিলেন এক অনন্য সত্য ভাষা ও মানবিক স্পর্শ।
শামিমা নাজনীন
হুমায়ূন আহমেদের বহু নির্মাণে শামিমা নাজনীন ছিলেন এক নির্ভরযোগ্য শিল্পী। তার অভিনয়ে ছিল বাস্তবতার গভীরতা, যা হুমায়ূন বারবার তুলে ধরেছেন বিভিন্ন চরিত্রে। হুমায়ূনের কলমে ও ক্যামেরায় তিনি পেয়েছেন বহুরূপে নিজেকে প্রকাশের সুযোগ, যা পরবর্তী সময়ে তাকে টেলিভিশনের একজন সফল অভিনেত্রীতে পরিণত করেছে।

রহমত আলী
হুমায়ূনের ‘নয় নাম্বার বিপদ সংকেত’ (২০০৭) সিনেমায় রহমত আলী এমন এক চরিত্রে অভিনয় করেন, যা তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জাতীয় স্বীকৃতি পাওয়া এ চলচ্চিত্র তাকে এনে দেয় বিপুল সাফল্য ও নতুন পরিচিতি। হুমায়ূনের সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়েই রহমত আলী হয়ে ওঠেন টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে এক স্বতন্ত্র মুখ।
এ তালিকা অনেক দীর্ঘ। মেহের আফরোজ শাওন, চ্যালেঞ্জার, ড. ইনামুল হক, মামনুন মিজানসহ আরো বহু তারকা নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করেছেন হুমায়ূন আহমেদের নির্মাণে। হুমায়ূন আহমেদ শুধু অভিনেতা তৈরি করেননি—তিনি এক প্রজন্ম তৈরি করেছিলেন। তার চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে দর্শকের প্রতিবেশী, তার সংলাপ ঢুকে পড়েছিল আমাদের দৈনন্দিন কথায়, তার গল্পগুলো জড়িয়ে গেছে স্মৃতিতে। তিনি শুধু পরিচালক ছিলেন না, ছিলেন জীবনের গল্পকার, যিনি পর্দায় মানুষের নিশ্বাস, হাসি আর বেদনার রঙ মিশিয়ে দিয়েছেন। আজও যখন পর্দায় তার চরিত্ররা ফিরে আসে, মনে হয় যেন তারা ঘরেরই মানুষ—অতি পরিচিত, অতি আপন।










