সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের মেয়র হলেন জোহরান মামদানি। তার বাবা মাহমুদ মামদানি একজন ইন্দো-উগাণ্ডান ও মা মীরা নায়ার ভারতীয়। ভারতের সিনেমা জগতে ও বিশ্ব চলচ্চিত্রের পরিসরে মীরা নায়ার এক অনন্য নাম। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা তার প্রতিটি সিনেমায় তুলে ধরেছেন সংস্কৃতি, পরিচয়, অভিবাসী জীবনের টানাপোড়েন এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের গল্প। তার ক্যামেরা শুধু গল্প বলে না—সিনেমাগুলো সমাজের আয়না হয়ে ওঠে। এসব কারণেই জোহরানের পাশাপাশি এই সময় মীরা নায়েরও প্রাসঙ্গিক।

মীরা নায়ারের জন্ম ১৯৫৭ সালে উড়িষ্যার রৌরকেলায়। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি আমেরিকার হার্ভার্ডে সমাজবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনেই নাটক ও তথ্যচিত্র নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা পরবর্তীতে তার চলচ্চিত্র জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়। এরপর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে আসেন।

১৯৮৮ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র সালাম বম্বে! মুম্বাইয়ের রাস্তায় বেঁচে থাকা শিশুদের জীবনের নির্মম বাস্তবতা তিনি এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যে, সিনেমাটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে ঝড় তোলে। এ সিনেমায় মুম্বাইয়ের অন্য এক চিত্র এসেছে। বলিউডের চাকচিক্যময় মুম্বাই এ নয়। সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ক্যামেরা ডি’অর জিতে নেয় এবং অস্কারে সেরা বিদেশী ভাষার সিনেমার মনোনয়ন পায়। এ সিনেমাই মীরা নায়ারকে বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করে। অমর্ত্য সেন তার দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান বইয়ে সিনেমাটির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

lOIk3P3A03-Salaam Bombay! (3)

সালাম বম্বে সিনেমার দৃশ্য। ছবি: সিনে ফ্যান

এরপর ১৯৯১ সালে তিনি নির্মাণ করেন মিসিসিপি মাসালা—এক অনন্য প্রেমের গল্প, যেখানে ভারতীয় অভিবাসী নারী ও এক আফ্রিকান-আমেরিকান পুরুষের সম্পর্কের মাধ্যমে জাতি ও পরিচয়ের রাজনীতি তুলে ধরা হয়। ড্যানজেল ওয়াশিংটন ও সরিতা চৌধুরীর অভিনয় সিনেমাটিকে এক অন্য মাত্রা দেয়।

২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মনসুন ওয়েডিং তার সবচেয়ে জনপ্রিয় সিনেমাগুলোর একটি। দিল্লির এক বড় পরিবারের বিয়ের আয়োজনকে কেন্দ্র করে ভালোবাসা, গোপনীয়তা এবং আধুনিক ভারতীয় সমাজের রূপান্তরকে তিনি হাস্যরস ও সংবেদনশীলতার মিশেলে ফুটিয়ে তোলেন। সিনেমাটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন জয় করে। সিনেমাটি খুবই অল্প বাজেটে নির্মিত। কিন্তু ওই বছর ভারতের বাইরে বলিউডের বড় তারকাদের সিনেমার চেয়েও বেশি আয় করে মনসুন ওয়েডিং।

14-copy_custom-a5da8cd5be7f388bdeaf9a526926a09a2f89c1b0

অভিবাসী জীবনে ভারতীয় সংস্কৃতির চিত্র দেখায় মনসুন ওয়েডিং’। ছবি: কেপিবিএস

এরপর আসে দ্য নেমসেক (২০০৬)। ঝুম্পা লাহিড়ীর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে আমেরিকায় অভিবাসী এক বাঙালি পরিবারের আত্মপরিচয়ের যাত্রা দেখানো হয়েছে। এখানে মীরা নায়ারের ক্যামেরা আরো ব্যক্তিগত, আরো আবেগময় হয়ে ওঠে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেন ইরফান খান ও টাবু। তাদের অভিনয়, সিনেমার গল্প, অভিবাসী জীবন—সব মিলিয়ে এটি ক্ল্যাসিক হয়ে উঠেছে।

২০১৬ সালে তিনি নির্মাণ করেন ডিজনির কুইন অব কাটওয়ে। উগান্ডার বস্তির এক কিশোরীর বাস্তব জীবনের গল্প, যে দাবা খেলে বিশ্বজয় করে। আফ্রিকার পটভূমিতে এই চলচ্চিত্রে নায়ার দেখিয়েছেন—স্বপ্নের কোনো সীমান্ত নেই।

movies-09232016-queen-superJumbo

কুইন অব কাটওয়ের দৃশ্য। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মীরা নায়ার মাইসা ফিল্ম ল্যাব প্রতিষ্ঠা করেছেন, পূর্ব আফ্রিকার তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। তার লক্ষ্য—গল্প যেন শুধু বলিউডের নয়, প্রতিটি গলির, প্রতিটি মুখের হয়।

মীরা নায়ারের সিনেমা তাই কেবল বিনোদন নয়; এটি সংস্কৃতি, পরিচয় ও মানবতার সংলাপ। তিনি যে পৃথিবীকে দেখেন, সেটি নানা রঙের, নানা ভাষার—কিন্তু সেই বৈচিত্র্যের মধ্যেই তিনি খুঁজে পান এক গভীর মানবিক ঐক্য। জোহরান মামদানির মেয়র হওয়ার মধ্য দিয়ে মুসলিম ও অভিবাসীদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে বলেই মনে করেন বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকরা। এদিকে মীরা নায়ার দীর্ঘ সময় ধরে সিনেমার মাধ্যমে এসব বিষয় নিয়েই কথা বলে গেছেন।